বলিউডের অন্যধারার ছবিতে তিনি প্রতিষ্ঠিত। মুকুটে শেষ পালক ‘আর্টিক্‌ল ফিফটিন’। আয়ুষ্মান খুরানার অন্যরকম যাত্রাপথ নিয়ে লিখলেন দেবারতি দাশগুপ্ত‌।

 

মান না মান, ম্যায় তেরা আয়ুষ্মান‌। নাছোড় বার্তা। সঙ্গে অনুচ্চারিত আত্মবিশ্বাস। যা বলে, মানো বা না মানো, আমাকে ফেলে দিতে পারবে না। ছোট শহর চণ্ডীগড়ের ছেলে তখন বলিউডের ত্রিসীমানায় নেই। কথা বলেন ভাল। আকর্ষণীয় কণ্ঠস্বর। দুর্ধর্ষ হিন্দি জানেন। শ্রোতাদের মন পেতে হিন্দিতেই বেশি জোর দিয়েছিল নামী এফএম স্টেশন। তাদের দৈনন্দিন শোয়ে রেডিওয় আত্মপ্রকাশ আয়ু্ষ্মান খুরানার। শোয়ের শিরোনাম ‘‌মান না মান.‌.‌.‌’‌কে যিনি অজান্তেই জীবনের মন্ত্র করে ফেলেছেন। 
বেতার জগতে বিচরণের আগে ডিএভি কলেজের সদ্যস্নাতক তরুণ ‘‌আগাজ’‌ এবং ‌‘‌মঞ্চতন্ত্র’‌–‌এর মতো চণ্ডীগড়ের নামী দু’‌টি নাট্যদলের নিয়মিত মুখ ছিলেন। বড় শহরের বড় শোয়ের পরিসর একেবারে দেখা হয়নি, তা–‌ও নয়। ২০০২–‌এ মাত্র ১৭ বছর বয়সে ‘‌চ্যানেল ‌ভি পপস্টার‌’‌–‌এ নজর কাড়েন গায়ক আয়ুষ্মান। ২০০৪–‌এ রিয়্যালিটি শো ‘‌রোডিজ’‌ মারফত পরিচিতি বাড়ে। তারপর মঞ্চাভিনেতা, রেডিও জকি, ভিডিও জকির বিবিধ অভিজ্ঞতা পেরিয়ে এখন বলিউডের অন্যধারার ছবির অন্যতম ভরসার নাম আয়ুষ্মান খুরানা। 
জাতি বিদ্বেষ বিষয়ে সাম্প্রতিকতম ছবি ‘‌আর্টিকল ফিফটিন’‌–‌এর ক্ষুরধার, মেধাবী অভিনয়ের সুবাদে যিনি আবার খবরে। এক সহজাত ভাললাগা আছে আয়ুষ্মানের চোখে, মুখে, অভিব্যক্তিতে। লম্বা। তবে সাঙ্ঘাতিক কিছু নয়। সুপুরুষ। সেটাও বাড়াবাড়ি রকম নয়। তাঁকে এই যুগের অমল পালেকর বলেন প্রযোজক–‌পরিচালক, যশরাজ ফিল্মসের কর্ণধার আদিত্য চোপড়া। অমলের মতোই তাঁকে পর্দায় বড় চেনাচেনা লাগে। এমন একজন, যে ভিড়ে মিশে গিয়েও স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পারে। অমলের মতোই তাঁর ছবির খ্যাতি মুখে মুখে ছড়ায়। 
অন্যধারার ছবি, অন্যধারার অভিনেতা কথাগুলো বহু ব্যবহারে জীর্ণ হলেও আয়ুষ্মানের ক্ষেত্রে তরতাজা। তাঁর প্রতিটি ছবির বিষয়বস্তু, চরিত্রায়ন একেবারে আলাদা। ২০১২–‌এ মুক্তি পাওয়া আয়ুষ্মানের প্রথম ছবি সুজিত সরকারের ‘‌ভিকি ডোনার’‌। কেন্দ্রীয় চরিত্র ভিকির রোজগার শুক্রাণু দান করে। এক নামী অভিনেতার কথা ভেবে চিত্রনাট্য লিখেছিলেন সুজিত। বিষয় শুনেই পিঠটান দেন তিনি। আরও কয়েকজনের কাছে গিয়েছিলেন মরিয়া পরিচালক। কেউ রাজি হননি। হঠাৎ টিভি দেখে আয়ুষ্মমানের খোঁজ পান সুজিত। চিত্রনাট্য শুনেই রাজি আয়ুষ্মান। সুজিতের প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। বারবার প্রশ্ন করেছিলেন, ‘‌হঠাৎ ডুব দিয়ে আমায় ডুবিয়ে দেবে না তো?‌’‌ ডোবাননি। নিজেও ডোবেননি আয়ুষ্মান। বরং নিজের আরেকটা দিগন্ত খুলে দিয়েছিলেন। একদিন শুটিংয়ের ফাঁকে গুনগুন করছিলেন। সুজিত বললেন, ‘‌ভাল করে গাও তো দেখি।’‌ খোলাগলায় মাতৃভাষা পাঞ্জাবিতে গান ধরলেন আয়ুষ্মান, ‘‌পানি দা রং’‌। তাঁর ‘‌ভিকি ডোনার’‌ ছবিতে নবাগত অভিনেতাকে দিয়ে ওই গানটিই গাইয়েছিলেন সুজিত। সেরা গায়ক হিসেবে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পেয়ে গেলেন আয়ুষ্মান!‌ 
এই হল বলিউডে আয়ুষ্মানের আবির্ভাবের টুকরো গল্প। এরপর অন্যরকম ছবি করা অলিখিত দস্তুর বানিয়ে ফেলেছেন তিনি। ‘‌শুভ মঙ্গল সাবধান’‌–এ তাঁর অভিনীত চরিত্র পুরুষদের গোপন সমস্যার শিকার। ‘‌দম লগাকে হাইশা’‌ ছবিতে মফস্বলের এক ভিডিও পার্লারের মালিকের চরিত্র, যে তার স্থুলকায়া স্ত্রীকে দু’‌চক্ষে দেখতে পারে না। নায়িকা ভূমি পেড়নেকরকে নিয়েই গল্প। তবু নিজের জাত চিনিয়েছিলেন আয়ুষ্মান। ‌কলেজপড়ুয়া ছেলে যদি হঠাৎ জানতে পারে মা ফের সন্তানসম্ভবা, কী হবে তার মনোভাব?‌ অস্বস্তি, বিস্ময়, লজ্জা, বিরক্তি এবং শেষে আনন্দের অভিব্যক্তিতে আয়ুষ্মানের চরিত্র দেখার মতো ছিল ‘‌বধাই হো’‌ ছবিতে। অথবা টানটান থ্রিলার ‌‘‌অন্ধাধুন’‌–‌এ আপাতভাবে দৃষ্টিশক্তিহীন পিয়ানোবাদকের অসামান্য অভিনয়।‌ ‌‌
সময়োপযোগী হালের ‘‌আর্টিকেল ফিফটিন’‌–‌এ আয়ুষ্মানের চরিত্রের নাম অয়ন রঞ্জন। ২০১৪–‌এর বদায়ুঁ ধর্ষণ মামলার ছায়ায় তৈরি ছবিতে তাঁর চরিত্র বহিরাগত এক ব্রাহ্মণ পুলিশ অফিসারের, যিনি শত প্রতিরোধ সত্ত্বেও সংবিধান প্রদত্ত ১৫ নম্বর ধারার পক্ষে লড়ে যান। যে ধারা বলে— ধর্ম, জাত, সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে কাউকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। 
পরবর্তী ছবি ‘‌ড্রিম গার্ল’‌–‌এ মেয়েলি গলার পুরুষের চরিত্রে মনপ্রাণ ঢেলেছেন আয়ুষ্মান। আরেকটি ছবি ‘‌বালা’‌–‌র বিষয়বস্তু কমবয়সে চুল পড়ে যাওয়া এক তরুণের হীনন্মন্যতার। মাত্র সাত বছরের অভিনয়জীবনে এমন আকর্ষণীয় সিভি ক’‌জনের আছে?‌
আয়ুষ্মান বলেন, ওটাই তাঁর ইউএসপি। ‘‌ভিকি ডোনার’‌–‌ই ঝুঁকি নিতে শিখিয়েছে। ‌প্রতিটি ছবিই প্রথম ছবি হিসেবে দেখেন। সেটাই তাঁর সাফল্যের চাবিকাঠি। ব্যর্থতা এসেছে। ‘‌হাওয়াইজাদে’‌,‘‌নৌটঙ্কি সালা’‌, ‘‌মেরি পেয়ারি বিন্দু’‌–‌র মতো কিছু ছবি দর্শক নেননি। কারণ খুঁজে পেয়েছেন তিনি। বলেছেন, ‘‌দেখেছি, অন্যদের মতামত নিয়ে যখনই বড় ব্যানারে ঝুঁকেছি, ছবিগুলো চলেনি। যে ছবিগুলো মন থেকে সায় দিয়েছে, সেগুলোই দর্শক নিয়েছেন।’‌ 
দর্শককে আনন্দ দেওয়া, সমালোচকদের তুষ্ট করা এবং প্রযোজকদের ভাল ব্যবসা দেওয়া আয়ুষ্মানের অভিনয় হবে, মানতেই পারেননি স্ত্রী, লেখক, কবি তাহিরা কাশ্যপ। আয়ুষ্মান তখন সদ্যবিবাহিত। হঠাৎ ছবিতে অভিনয়ের ঝোঁক চাপায় তাহিরা সটান বলে দিয়েছিলেন, ‘‌মুখ দেখেছো নিজের?‌ তোমাকে রেডিও অবধি মানা যায়। ছবিতে দর্শক নেবে?‌’‌ সেই ‘‌সু–‌পরামর্শ’‌ কানে তোলেননি আয়ুষ্মান। ভাগ্যিস!‌
‘‌ভিকি ডোনার’‌–‌এর সময় কিছু শর্ত চাপিয়েছিলেন তাহিরা। যেমন, বেশি ঘনিষ্ঠ দৃশ্য করা চলবে না। অন্তঃসত্ত্বা তাহিরাকে চণ্ডীগড় ফেলে মুম্বই পাড়ি দেওয়ায় স্বামী–‌স্ত্রীর বিশাল মনোমালিন্যও হয়েছিল। বিয়ে প্রায় ভেঙে যায়–যায়। তাহিরা পরে বলেছেন,‘‌তখন বয়স কম ছিল। ছেলেমানু্যী করে ফেলেছিলাম।’‌ এখন দুই সন্তান বিরাজবীর (‌৫)‌ এবং বারুষ্কা (‌৩)‌–‌কে নিয়ে সুখের সংসার। সুখে সাময়িক ফাটল ধরেছিল আরও একবার। বছর দুই আগে যখন স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন তাহিরা। স্ত্রীর পাশ ছাড়েননি আয়ু্ষ্মান। দু’‌বছর নতুন কোনও ছবিতে হাত দেননি। এখন অস্ত্রোপচার করিয়ে ভাল আছেন তাহিরা। 
পরপর হিট ছবিতে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছেন আয়ুষ্মান। তারকাপুত্রই তারকা হবে, এই চূড়ান্ত অ‌গণতান্ত্রিক ভাবনাকে দুরমুশ করে বলিউডে ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবল’‌ হয়েছেন। আসলে জীবনের কাছে অভিনয় শিক্ষার নাড়া বেঁধেছেন আয়ুষ্মান। তাঁর কথায়, ‘‌জীবনের চেয়ে বড় কর্মশালা আর হয় না।’‌ একদা বড় ছেলে নিশান্তের নাম পাল্টে আয়ুষ্মান রেখেছিলেন তাঁর জ্যোতিষী বাবা। এই নামে জোর আছে বলে। যে জোর থেকেই হয়তো বলা যায়, ‘‌মান না মান‌, ম্যায় তেরা আয়ুষ্মান।’‌

জনপ্রিয়

Back To Top