সম্রাট মুখোপাধ্যায়: লোকাল ট্রেনে যাতায়াত একসময় বদলে দিয়েছিল তরুণ অভিনেতা তাপস পালের ভাগ্য। সে সময় তাপস বিএসসি পড়ছেন বায়ো‌সায়েন্স নিয়ে। হুগলি মহসিন কলেজের ছাত্র ছিলেন।‌ সালটা ১৯৭৯। ট্রেনেই আলাপ পরিচালক শ্রীনিবাস চক্রবর্তীর সঙ্গে। নাটকে অভিনয় করেন শুনে শ্রীনিবাসবাবুই অফার দেন সিনেমায় অভিনয় করার। এরপর শুরু হয় টালিগঞ্জে যাতায়াত। যোগাযোগ হয় তরুণ মজুমদারের সঙ্গে। তরুণবাবু তখন ‘‌দাদার কীর্তি’‌ করবেন। মুখ্য চরিত্রে তাঁর দরকার নতুন এক মুখ। বেছে নেন নবাগত তাপস পালকে। তাপসের মুখের সারল্য আর ‘‌মিষ্টি’‌ হাসিই ছিল এই চরিত্রে তাঁকে বেছে নেওয়ার নেপথ্যে মূল কারণ। পরবর্তীতে বহু বার বলেছেন তরুণবাবু। এবং ওই প্রথম ছবিতেই ‘‌এলাম–‌দেখলাম–‌জয় করলাম’‌টা ঘটে গেল!‌ ‘‌দাদার কীর্তি’‌ মুক্তি পায় ১৯৮০–‌র নভেম্বরে। বাংলা ছবির মহানায়কের বিদায়–‌বছরে। বোঝা গেল এই নায়কও থাকতে এসেছেন।
পরের বছরই ‘‌সাহেব’‌। বিজয় বসুর পরিচালনায়। সুপারহিট। দুটো ছবিতেই তাপসের ‘‌ভাল ছেলে’‌র চরিত্র। দুটি ছবিতেই তাঁর চরিত্র দু’‌রকমের বেদনায় মোড়া। একেবারে ঘরোয়া। সাফল্য আর বিশেষ ইমেজ জুটে গেল। 
বাংলা সিনেমার দর্শকের কাছে এমন ‘‌গৃহস্থ’ ইমেজের কদর বরাবরই। তাপস পালের পৌনে তিন দশক আগে উত্তমকুমার নামক ‘‌ফেনোমেনা’‌টির উত্থানেও এই ‘‌ঘরের ছেলে’‌ ইমেজটির অবদান ছিল প্রভূত। তাপসের ক্ষেত্রেও তাই ঘটল। বস্তুত তাঁর অধিকাংশ সাফল্য এসেছে এই ‘‌ঘরের ছেলে’‌ হয়ে। তাঁর সমসময়ের নায়ক চিরঞ্জিত এই কথাটা মনে করিয়ে দিয়ে বলছিলেন, ‘‌ওইসব চরিত্রে তাপস ছিল বিকল্পহীন। ওর মতো করে কাউকে আর ভাবাই যেত না।’‌
তাপস চন্দননগরের ছেলে। জন্ম ওই শহরেই। বাবা গজেন্দ্রচন্দ্র পাল। মা মীরা পাল। তাপসের জন্ম ১৯৫৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর। পড়াশোনার পাশাপাশি অভিনয়ের ইচ্ছাটা ছিল বরাবরই। সে শখ মিটত ছোট ছোট গ্রুপে নাটক করে। অভিনয়টা কেরিয়ার হিসেবে নেবেন প্রথম থেকে ভাবেননি যদিও। কেরিয়ারের শুরুতেই জোড়া হিট তাপসকে টেনে যায় বোম্বে (‌মুম্বই)‌। তখন নবাগত মাধুরী দীক্ষিতের বিপরীতে করেন ‘‌অবোধ’ (‌১৯৮৪)‌। এ ছবির পরিচালক ছিলেন অবশ্য বাঙালি। হীরেন নাগ। মাধুরীর ছিল সেটা প্রথম ছবি। এখানেও পারিবারিক গল্প। তবে ‘‌দাদার কীর্তি’‌র উল্টোপথে হেঁটেই এখানে অপরিণত, নায়ক পরিণত। এ ছবি অবশ্য বক্স অফিসে সাফল্য পায়নি। আর ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পেয়েও তাই আর তাপসেরও মুম্বইয়ে কেরিয়ার গড়া হয়নি। 
১৯৮৪–‌তে পরপর দুটো হিট ‘‌দীপার প্রেম’‌ এবং ‘‌পারাবত প্রিয়া’‌। পেয়ে গেলেন তাঁর সময়ের দুই প্রধান নায়িকা মুনমুন সেন ও দেবশ্রী রায়কে। পরের তিন বছরে ‘‌ভালোবাসা ভালোবাসা’‌ (‌১৯৮৫)‌, ‘‌অনুরাগের ছোঁয়া’‌ (‌১৯৮৬)‌, ‘‌গুরুদক্ষিণা‌’‌ (‌১৯৮৭)‌, ‌এর পাশাপাশি আরও বেশ কিছু ছোট–‌মাঝারি হিট তো আছেই। যেমন,‌ অজান্তে, ‘‌বৈদূর্য্যরহস্য’‌ (‌তপন সিংহের সঙ্গে কাজ করলেন)‌, ‘‌অমরবন্ধন’‌ (‌শতাব্দী রায়কে জুটি হিসেবে পেলেন‌)‌, ‘‌পাপপুণ্য’‌,‘‌লালমহল’‌। মাত্র বছর ছ–‌সাতেকের ভেতরে তাঁর এতখানি উত্থান এবং এতগুলো হিট বহু সিনেমা–‌সাংবাদিক তখন এর সঙ্গে তুলনা টানছেন রাজেশ খান্নার সেরা সময়ের। রাজেশের মতোই তাপসের ছবিরও গান তখন বলে বলে ‘‌গোল্ড ডিস্ক’‌ পাচ্ছে। এটা কিন্তু ঘটনাই, উত্তমকুমারের মৃত্যুর ধাক্কায় টালমাটাল টলিউড যে দুটি ভিতের ওপর নিজেকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছিল আটের দশকের মধ্যপর্বে, তার একটি অঞ্জন চৌধুরির চিত্রনাট্য হলে, অন্যটি তাপস পালের নায়ক ইমেজ।
তাপস পালকে পর্দায় ‘‌ভাল ছেলে’‌র ইমেজ দিয়েছিলেন তরুণ মজুমদার। সেই তরুণবাবুই আবার সেই ইমেজ ভাঙেন ১৯৮৬–‌তে ‘‌পথভোলা’য়‌। এক পলাতক অপরাধীর চরিত্র। তরুণবাবুর পরের দুটি ছবি ‘‌পরমশমণি’‌ আর ‘‌আগমন’‌–এ অবশ্য আবার ‘‌ভাল ছেলে’‌। তরুণবাবুর সঙ্গে করেন ‘‌আপন আমার আপন’ও‌। নায়িকাদের মধ্যে মহুয়া রায়চৌধুরির সঙ্গে জুটি ভেঙে যায় মহুয়ার অকালপ্রয়াণে। কিন্তু দেবশ্রী রায় বা শতাব্দী রায়ের সঙ্গে সমান সফল তাঁর জুটি পরবর্তীতে।
এরপর বাংলা সিনেমায় একাধিক নায়কের যুগেও সমান সফল তিনি। ‘‌প্রতীক’‌, ‘‌‌তুফান’‌, ‘‌তোমার রক্তে আমার সোহাগ’‌–‌এর মতো ছবিতে। মাঝে মাঝে পারিবারিক গল্পসমৃদ্ধ ‘‌নীলিমায় নীল’‌ বা ‘‌কড়ি দিয়ে কিনলাম’‌–‌এর মতো ছবিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন। তাঁর কেরিয়ারের পরের পর্বে একটা বড় বাঁকের মতো বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের দুই ছবি ‘‌উত্তরা’‌ আর ‘‌মন্দ মেয়ের উপাখ্যান’‌। দুটিতেই মাটির গন্ধ‌মাখা চরিত্র। এক কুস্তিগির আর এক ড্রাইভারের চরিত্র। আর ছিল ২০১২–‌তে ‘‌৮টা ৮–‌এর বনগাঁ লোকাল’‌। ক্ষ্যাপাটে প্রতিবাদী চরিত্র। ২০১৩–‌তে শেষ ছবি ‘‌খিলাড়ি’।‌ দক্ষিণী এক ফর্মুলা ছবির রিমেক। তবে পারিবারিক গল্পই।
রাজনীতি আর আনুষঙ্গিক নানা বিতর্কের ‘‌গ্রহণ’‌ শেষপর্যন্ত গ্রাস করেছিল হয়তো তাঁর কেরিয়ার, কিন্তু তিনি দু’‌বারের বিধায়ক (‌আলিপুর কেন্দ্রে)‌ এবং দু’‌বারের সাংসদ (‌কৃষ্ণনগর)‌‌। সেখানেও তিনি অপরাজিত। ২০০১ থেকে ২০১৯ টানা তাঁর আইনসভার সদস্য থাকা। জনতার কাছে তাঁর জনপ্রিয়তার আরেক প্রমাণ মাঝে বছর ছয়েক যাত্রার মঞ্চেও তাঁর বিপুল সাফল্য। প্যান্ডেল ভেঙে পড়ত তখন। পাশের বাড়ির ছেলে থেকে হয়ে উঠেছিলেন ‘‌মাঠের নায়ক’‌।‌

জনপ্রিয়

Back To Top