স্বরা ভাস্কর? নাকি ‘স্বর’ ভাস্কর? বলিউডের স্বর। বলিউডের কণ্ঠ। সটান খোলা চিঠি লিখে বসেছিলেন সঞ্জয় লীলা বনশালীকে। লিখেছিলেন, ‘পদ্মাবত’ দেখে তাঁর নিজেকে ‘যোনি’র মতো মনে হয়েছে! 
কয়েক হাজার শব্দের সেই খোলা চিঠির ছত্রে ছত্রে ঠিকরে বেরিয়েছিল ক্রোধ, অভিমান এবং গোটা নারীজাতির অপমানের জবাব। নারীবাদী? হতে পারেন। স্বরার পেশাগত জীবনে তো ‘আনারকলি কি আরা’র মতো ছবিও রয়েছে। যে ছবি নারীশক্তির উত্থানের কথা বলে। রয়েছে ‘নীল বাটে সন্নাটা’র মতো ছবি। যে ছবি বলে নারীর এক আশ্চর্য উড়ানের কথা। 
সেই স্বরার কোথাও একটা গিয়ে মনে হয়েছে, বনশালীর ছবিতে জহরব্রতের (‌বাংলার সতীদাহ প্রথার মতো)‌ গুণকীর্তন করা হয়েছে। গোটা খোলা চিঠিতে স্বরা লিখেছেন, পরিচালক সঞ্জয় লীলা বনশালীকে নিজের মতামত জানিয়েছেন তিনি। লিখেছেন, ‘পদ্মাবত দেখে মনে হল, যোনিটাই যেন আমার সব’।
দিল্লিতে তেলেগু–বিহারি পরিবারে জন্ম। জন্মতারিখ ৯ এপ্রিল, ১৯৮৮। বাবা ভারতীয় নৌসেনার অফিসার। নাম চিত্রাপু উদয় ভাস্কর। মা ইরা ভাস্কর। দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেমা স্টাডিজের অধ্যাপক। অর্থাৎ, পারিবারিক পটভূমিকাটি যুতসই। ফৌজি বাবা এবং অধ্যাপক মায়ের তত্ত্বাবধানে সম্ভবত ছোটবেলা থেকেই স্বরার মধ্যে একটা প্রতিবাদী সত্তা জন্ম নিয়েছিল।   
সর্দার প্যাটেল বিদ্যালয় থেকে লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে মিরান্ডা হাউজে। বিষয়: ইংরেজি সাহিত্য। যেখানে তাঁর সহপাঠী ছিলেন অধুনা অভিনেত্রী মিনিশা লাম্বা। পরে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই সমাজবিদ্যা নিয়ে স্নাতকোত্তর স্তরের পঠনপাঠন। 
সিনেমায় আসার আগে দিল্লিতে নাটক করতেন স্বরা। এন কে শর্মার ‘অ্যাক্ট ওয়ান’ নাট্যগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আত্মপ্রকাশ ২০০৯ সালে ‘মাধোলাল কিপ ওয়াকিং’ ছবিতে। কায়রো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ছবিটা দেখানো হয়েছিল বটে। কিন্তু ওইপর্যন্তই। বক্স অফিসে সুবিধে করতে পারেনি স্বরার প্রথম ছবি। 
এর পরের তথ্যেই মোচড়! বনশালীর ছবি ‘গুজারিশ’এ ঋত্বিক রোশন–ঐশ্বর্য রাইয়ের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন স্বরা। অসুস্থের ইচ্ছামৃত্যু নিয়ে তৈরি সে ছবিও বাণিজ্যিকভাবে অসফল। ফলে স্বরার কাজ অনেকটা অদেখাই রয়ে গিয়েছিল। তখন আর কে জানত যে, বনশালীকে খোলা চিঠি লেখার সময় সেই ছবিতে অভিনয়ের কথাও টেনে আনবেন স্বরা। ‘গুজারিশ’এর পরের ছবি ‘দ্য আনটাইটেল্‌ড কার্তিক কৃষ্ণণ প্রজেক্ট’ও দাগ কাটতে পারেনি। 
শেষমেশ সাফল্য এল ২০১১ সালে। ‘তনু ওয়েড্‌স মনু’ ছবিতে কঙ্গনা রানাওয়াতের বন্ধুর ভূমিকায় নজর কাড়লেন স্বরা। এরপর ‘লিসন.‌.‌.‌অময়া’, ‘রাঞ্ঝনা’–তেও তারিফ কুড়োলেন। ক্রমে ক্রমে এল ‘প্রেম রতন ধন পায়ো’, ‘নীল বাটে সন্নাটা’, ‘আনারকলি অফ আরা’। 
অভিনয়ের কেরিয়ার বেশিদিনের নয়। কিন্তু অভিনেত্রী হিসেবে ইতিমধ্যেই নিজের একটা আলাদা পরিচয় তৈরি করে ফেলেছেন। আর সংকল্প— ‘ইন্ডিপেনডেন্ট সিনেমা’য় অভিনয় করা। বড় ব্যানার ছেড়ে নতুন কিছু করার পরীক্ষায় নামা। 
সম্ভবত সেই কারণেই শাহরুখ খানের সঙ্গে অভিনয় করার প্রস্তাব পেয়েও ছেড়ে দিয়েছেন। প্রস্তাব এসেছিল ‘জিরো’ ছবিতে শাহরুখের মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করার। ‌নাকচ করে দিয়েছেন স্বরা। চিত্রনাট্য পছন্দ হয়নি তাঁর।
সিনেমার পাশাপাশি শ্যাম বেনেগালের টেলিভিশন মিনি সিরিজ ‘সংবিধান’এ (২০০৪ সালে রাজ্যসভা টিভিতে সম্প্রচারিত হয়েছিল) উপস্থাপকের ভূমিকাও সামলেছেন স্বরা। পাক টিভি–র কমেডি শো ‘মজাক রাত’এ অতিথি শিল্পী হিসেবে গিয়েছেন। অভিনয় করেছেন ওয়েব মিনি সিরিজের প্রধান চরিত্রেও।    
কিন্তু পেশাগত জীবনে যা–ই করুন, বরাবরই সমাজ এবং রাজনীতি সচেতন থেকেছেন স্বরা। নইলে কি আর টুইটারে পরিচালক রাজকুমার হিরানি বা মনিকা লিউনস্কির পাশাপাশি তিনি একনিষ্ঠভাবে প্রকাশ রাজ, কানহাইয়া কুমার, জিগনেশ মেবানীদেরও ফলো করেন! 
একদা ‘পদ্মাবতী’ নিয়ে করণিসেনার তাণ্ডবের বিরুদ্ধে (অর্থাৎ বনশালীর পক্ষে) সোচ্চার ছিলেন স্বরা। এটা নেহাতই কাকতালীয় যে, সেই ‘পদ্মাবতী’ একটি আ–কার খুইয়ে ‘পদ্মাবত’ হওয়ার পর বনশালীর বিরুদ্ধে চলে গেলেন তিনি।
খোলা চিঠিতে স্বরা লিখেছেন, পরিচালক বনশালী ‘মানুষ’ এবং ‘মেয়েমানুষ’এ বিভেদ–করা সমাজেরই প্রতিনিধিত্ব করে বসেছেন। প্রতিনিধিত্ব করে ফেলেছেন মেয়েদের যোনি-সর্বস্ব প্রাণী হিসেবে দেখা সমাজের। লিখেছেন, ছবির শেষটা কোথাও যেন সেই প্রাচীন অন্ধকার যুগেই ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছে দর্শককে। যেখানে বিধবা এবং ধর্ষিতাদের বেঁচে থাকার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠত। স্বরা লিখেছেন, ‘আমি জানি জহর বা সতী আমাদের ইতিহাসের অঙ্গ। এসব সত্যি সত্যিই হতো। এগুলোর মধ্যে থাকা ভয়, কান্না, হাহাকার বড় পর্দায় দৃষ্টিনন্দনও হয়।  তার উপর আপনার মতো এত বিচক্ষণ একজন সুসম্পূর্ণ পরিচালক। আপনার ছবির শেষটা দেখে খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। আপনার মনে রাখা উচিত ছিল পাওয়ার অফ সিনেমা কী! দর্শককে ওই দৃশ্য আবেগতাড়িত করলেও আমার মনে হয়, কোনও সমালোচনা ছাড়া এমন দৃশ্য দেখানো সেই ঘটনায় মহত্ব আরোপ ছাড়া আর কিছু নয়। জহর বা সতীর সমর্থন ছাড়া এটা আর কী হতে পারে।’
কেন এত ক্রোধ? 
গতবছর এই প্রশ্নটি করা হয়েছিল তাঁকে। তখনও মুক্তি পায়নি ‘পদ্মাবত’। স্বরা বলেছিলেন, ‘‌সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য কখনও কখনও মেয়েদের রাগ দেখানো উচিত। আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা অনেক ঘটনাই ঠিক নয়। সজোরে লজ্জা ভুলে সে সব ঘটনার প্রতিবাদ করতে হবে।’ 
স্বরা ভাস্কর প্রতিবাদ করেছেন। প্রতিবাদে ভাস্বর হয়েছেন।

জনপ্রিয়

Back To Top