বিনোদনের প্রতিবেদন: এই প্রথম দুজনে একসঙ্গে এক ছবিতে। দুই কিংবদন্তী। ভারতীয় সিনেমায় এই দুই অভিনেতাই এখন প্রবাদ প্রতিম। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং নাসিরুদ্দিন শাহ।
এই ঐতিহাসিক সম্মিলনী সম্ভব করলেন পরিচালক শৈবাল মিত্র। ছবির নাম ‘‌দেবতার গ্রাস’‌। নাম শুনে রবীন্দ্রনাথের কবিতার কথা মনে পড়ে যেতে পারে। কিন্তু এই ছবিটি তৈরি হচ্ছে বিখ্যাত বিদেশি নাটক ‘‌ইনহেরিট দ্য উইন্ড’‌ অবলম্বনে। প্রেক্ষাপট অবশ্যই পাল্টেছে বাংলা ছবির প্রয়োজনে। এবং সময়ের প্রয়োজনে। কিন্তু নাটকের মূল-‌বার্তা অপরিবর্তিত। ধর্ম, সমাজ, রাজনীতি এখানে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ধর্মের গোঁড়ামি কীভাবে ভেঙে দিতে চায় সমাজ ও সংসারের ভালবাসার ভিত্তিকে, সেটাই ছিল নাটকের মূল বার্তা। এই ছবিতেও শৈবাল মিত্র সেই বার্তাই পৌঁছে দিতে চান দর্শকদের। তাই, ছবির ‘‌দেবতার গ্রাস’‌ নামটাও খুব প্রাসঙ্গিক এবং সুদূরপ্রসারী হয়ে উঠেছে। পরিচালক জানালেন, বহুদিন থেকেই বিষয়টা মাথায় ঘুরছে। মনে হয়েছে, আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে খুব জরুরি এই ছবির নির্মাণ।
মুখোমুখি সৌমিত্র, নাসিরুদ্দিন
প্রথম দিন শুটিংয়ে এসে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলে উঠলেন, তোমার সঙ্গে এক ছবিতে অভিনয়ের আমার অনেকদিনের ইচ্ছে এবার পুরণ হল। সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে নাসিরুদ্দিন শাহ বলে উঠলেন, দাদা, এটা তো আমার বহু বছরের আকাঙ্খা।
দুই কিংবদন্তী জড়িয়ে ধরলেন পরস্পরকে। সাক্ষী থাকলেন সেট-‌এ উপস্থিত অন্যান্য অভিনেতা-‌অভিনেত্রী।
কলকাতার দক্ষিণপ্রান্তের এই স্টুডিওয় কোর্টরুমের সেট। দেখে মনে হয়, সত্যিই আদালত চলছে।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে অভিনয় করার যে আকাঙ্খার কথা বললেন নাসিরুদ্দিন, সেটা তিনি আগেও বলেছেন। সেদিন ছিল শুটিংয়ের প্রথম দিন। পরের দিন নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটা কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও ‘‌আপলোড’‌ করেন নাসিরুদ্দিন। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ‘‌মুখোমুখি’‌ দুটি ঘর। একটা ঘরের নেমপ্লেট-‌এ লেখা নাসিরুদ্দিন শাহ, অন্যঘরের নেমপ্নেট-‌এ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ক্যামেরা একটা নাম থেকে এন্য একটা নামে গিয়ে স্থির হয়ে গেল। এই ভিডিওতেই নাসিরুদ্দিন প্রমাণ দিলেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর কাছে কতখানি। দুজনে পাশাপাশি ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছেন শুটিংয়ের অবসরে, এটাও যে কম কথা নয়, সেটাই বুঝিয়ে দিলেন নাসিরুদ্দিন।
মুখোমুখি হলেন দুজনে। যে ভালবাসার প্রকাশ ঘটল দুজনের আলিঙ্গনে, ক্যামেরার সামনে অবশ্য সেটা দেখা গেল না। তার কারণ, এখানে, কোর্টরুমে দু’‌জনে দু’‌জনের প্রতিপক্ষ। একজন বাদী পক্ষের অ্যাডভোকেট, অন্যজন বিবাদী পক্ষের। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এখানে রেভারেন্ড বসন্তকুমার। নাসিরুদ্দিন হয়েছেন অ্যান্টন ডি সুজা। দুই অ্যাডভোকেট জেরা করছেন সাক্ষীদের, কখনও তর্ক করছেন পরস্পরের সঙ্গেও। তাঁদের অভিনয়, তাঁদের স্বাতন্ত্র‌্য, তাঁদের প্রতিটা মুহূর্তের অভিব্যক্তি শুধু ক্যামেরা নয়, নিখুঁতভাবে লক্ষ্য করে যাচ্ছেন কোর্টরুমে উপস্থিত এই ছবির অন্য শিল্পীরা। তাদের সকলেরই বক্তব্য, একটা মুহূর্তও ‘‌মিস’‌ করা যাবে না। সত্যিই তো, সৌমিত্র-‌নাসিরুদ্দিনকে একসঙ্গে অভিনয় করতে দেখাটা তো লাইফ-‌টাইম অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতাটা যে যেমনভাবে পারছেন, সংগ্রহ করে নিচ্ছেন।
হিল্লোলগঞ্জের কুশীলবরা
ঘটনার  মূল কেন্দ্র হিল্লোলগঞ্জ। মূল কুশীলবরা তাই সেখানকার। কঠিন এক মামলায় একদিকে যেমন অ্যাডভোকেট বসন্তকুমার হয়ে আছেন সৌমিত্র, তেমনি এসেছেন ‘‌ডি সুজা’‌ নাসিরুদ্দিন। এই নামকরা অ্যাডভোকেট বাইরে থেকে এসেছেন। তাই এই ছবিতে তাঁর সংলাপ মূলত হিন্দি ও ইংরেজিতে। বসন্তকুমারের স্ত্রী বিজয়ার চরিত্র করছেন অনসূয়া মজুমদার। দিল্লি থেকে আসা সাংবাদিক হরনাথের ভূমিকায় কৌশিক সেন। জাস্টিস চৌধুরির ভূমিকায় জগন্নাথ গুহ। স্থানীয় উকিল মাধবের চরিত্রে বিপ্লব দাশগুপ্ত। হিল্লোলগঞ্জের স্কুলের দুই শিক্ষক কুণাল আর বিভাসের চরিত্রে শ্রমণ চট্টোপাধ্যায় আর শুভ্রজিৎ দত্ত। এই স্কুলেরই শিক্ষিকা রেশমীর চরিত্রে অমৃতা চট্টোপাধ্যায়। রেশমীর বাবা হেরম্বর ভূমিকায় পার্থপ্রতিম মজুমদার।
কেন সৌমিত্র, নাসিরুদ্দিন?‌
এই দুজনকে ছাড়া ‘‌দেবতার গ্রাস’‌ করতাম না। করা সম্ভবও ছিল না। স্পষ্ট ভাষায় বললেন পরিচালক শৈবাল মিত্র।
‘‌শজারুর কাঁটা’‌র পরে বিনোদবিহারীকে মূল ভাবনায় রেখে শৈবাল মিত্র তৈরি করেছিলেন ‘‌চিত্রকর’‌। মূল ভূমিকায় ছিলেন ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়। চটজলদি ছবি এবং ফর্মুলা ছবিতে বিশ্বাসী নন শৈবাল। তাই, আজকের সময়ের প্রেক্ষিতে ‘‌দেবতার গ্রাস’‌ ছবি তৈরি যেন তাঁর কাছে অবধারিত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এবং দুই দুঁদে অ্যাডভোকেটের চরিত্রে নাসিরুদ্দিন এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কেই মাথায় রেখেছিলেন তিনি চিত্রনাট্য লেখার সময় থেকেই।
এবং প্রায় এক কথায় এই ছবিতে অভিনয় করতে রাজি হয়ে গেছেন দুই কিংবদন্তী। শৈবাল বললেন, নাসিরজির বহুদিনের ইচ্ছে ছিল সৌমিত্রদার সঙ্গে অভিনয়ের। ছবির বিষয়বস্তু এবং চিত্রনাট্য পছন্দ হওয়ায় নাসিরজি খুশি মনেই রাজি হয়ে যান। একই অভিজ্ঞতা সৌমিত্রদার ক্ষেত্রেও। শুধু, শৈবাল বললেন, আজও সিনেমা ও নাটক নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত এই দুই মহীরুহ-‌র ‘‌ডেট’‌ একসঙ্গে মেলানোটাই ছিল চিন্তার। শেষ পর্যন্ত ‘‌ডেট’‌ সমস্যা মিটেছে। এবং পুরোদমে শুরু হয়েছে শুটিং।
স্টুডিও-‌য় অসাধারণ কোর্টরুম তৈরি করেছেন শিল্পনির্দেশক গৌতম বসু। ক্যামেরায় আছেন অশোক দাশগুপ্ত। আপাতত কোর্টরুমের শুটিং চলবে টানা কয়েকদিন। তারপর আউটডোর। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং নাসিরুদ্দিন শাহ, দুজনেই এত প্রফেশনাল এবং এত আন্তরিক যে সমস্ত ইউনিট স্বস্তিতে। জানালেন শৈবাল মিত্র।
অভিনয়ের পাঠশালা
এই দুই মহীরুহ অভিনেতার সঙ্গে যারা অভিনয় করছেন, তাঁদের অনেকেই সিনেমার, থিয়েটারের‌ কৃতী শিল্পী। তবুও, এই দুজনকে একসঙ্গে এক ফ্লোরে কাজের মধ্যে পেয়ে প্রত্যেকেই আরও উদ্দীপ্ত। অনেকেরই অনেক প্রশ্ন নাসিরুদ্দিনের কাছে। লাঞ্চ ব্রেকে বা শুটিংয়ের পরে সেই সব প্রশ্নের আন্তরিক উত্তর দিচ্ছেন তিনি। অনসূয়া মজুমদার বললেন, এই দুজন যখন অভিনয় করছেন, তখন মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করার নেই। এ এক বিশাল অভিজ্ঞতা। এই প্রজন্মের অভিনেত্রী অমৃতা চট্টোপাধ্যায় বললেন, ‘‌এটা তো অভিনয়ের মাস্টার ক্লাস। এমন সুযোগ এবং সৌভাগ্য হয়ত একবারই আসে জীবনে। চোখের সামনে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং নাসিরুদ্দিনের অভিনয় শুধু দেখছিই না, তাঁদের সঙ্গে অভিনয় করছি, এটা প্রায় অবিশ্বাস্য একটা ঘটনা।’‌ আর এক নবীন অভিনেতা শুভ্রজিৎ দত্ত বললেন, ‘‌অতুলনীয় দুই শিক্ষক। আমরা যেন অভিনয়ের পাঠশালায় বসে আছি।’‌ এভাবেই প্রবীণ ও নবীন প্রজন্মের মেল বন্ধনে, সৌমিত্র-‌নাসিরুদ্দিনের নিত্য উপস্থিতিতে নিজের লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে ‘‌দেবতার গ্রাস’‌।‌‌‌‌

ছবি:‌ নির্মলেন্দু চট্টোপাধ্যায়।
 

জনপ্রিয়

Back To Top