বিখ্যাত বাবার পুত্র। হেমন্ত জেঠু, উত্তম কাকু, পঞ্চম আঙ্কল। স্নেহ–সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা। গানের প্রাথমিক শর্ত ভাঙলে বিরক্ত হন। জানতে পারলেন সুতপা ভৌমিক

বাবার গান গেয়ে সফর শুরু করেছিলেন। নিজস্ব সত্তা হারিয়ে ফেলার ভয় হয়নি কখনও?‌ 
সৈকত মিত্র:‌ বাবার গান দিয়ে আমার সফর শুরু হয়নি। শুরুটা ড্রামাটিক। ১৯৮৩ সালে তখন ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। খেলাধুলোও করি। একদিন খেলতে যাব, বাবা বললেন, ‘‌আমার সঙ্গে আজ একটু যাস‌’‌ (‌‌তার আগে কখনও বাবার সঙ্গে অনুষ্ঠানে যাইনি)‌‌।’ রবীন্দ্র সরোবরে অনুষ্ঠান। মিউজিক্যাল কলেজ তৈরি হবে। তার জন্য চ্যারিটি শো। শিল্পীরা শ্রদ্ধা জানাবেন শচীন দেববর্মনের গাওয়া গান গেয়ে। বাবার জন্য দুটো গান বরাদ্দ। ‘‌নিশিথে যাইও ফুলবনে’‌ এবং ‘‌রঙ্গিলা, রঙ্গিলা, রঙ্গিলা রে’‌। বাবার শরীরটা খারাপ ছিল। অনুষ্ঠানে আমাকেই গান শুরু করতে বললেন। শুরু করলাম। দুটো গানের পর যখন বেরিয়ে আসছি, তখন বাবার সিনিয়র ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, হেমন্ত জেঠু (‌‌মুখোপাধ্যায়), সুপ্রভা সরকাররা বললেন, ‘‌তোমার ছেলে যে গান করে, তা তো জানতাম না?‌’‌ শুনে বাবা বললেন, ‘‌আমিও জানতাম না’‌। এই হল আমার পেশাদার গানের শুরু। বাবার কাছে তালিম‌ কোনওদিনই নিইনি। দুটো গান শিখেছিলাম। একটা ‘শ্যামা’র গান। প্র‌্যাকটিসে ভুল হচ্ছিল। বাবা শিখিয়েছিলেন কীভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে হয়। আর বাবার সুরে ফিল্ম ‘‌কেনারাম বেচারাম’‌–এর গান। সেটা বাবা তুলিয়েছিলেন। 
 তবে শ্যামল মিত্রের পুত্র গান শিখলেন কার কাছে?‌
সৈকত:‌ প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে ক্লাসিক্যাল শিখেছি। ঊমা দে–র কাছেও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম নিয়েছি। খুব অল্পদিন হলেও সন্ধ্যাপিসি (‌‌মুখোপাধ্যায়)‌‌ আমায় গান শিখিয়েছেন। 
 গায়ক হওয়ার ভাবনাটা মাথায় আসার সময় কি বাবাকে সেকথা আলাদা করে বলেছিলেন?‌ নাকি নিজেই বুঝেছিলেন?‌ 
সৈকত:‌‌ একটা সময় ধ্যান–জ্ঞান ছিল ক্রিকেট। ক্লাস টেনে পড়ার সময় ফার্স্ট ডিভিশনে ক্রিকেট খেলি। প্রথমে কালীঘাট। পরে মিলন সমিতি ক্লাবে যোগ দিই। শেষ ম্যাচে ক্যাপ্টেন শান্তি ঘোষালের সঙ্গে ছোট্ট বিষয়ে মতবিরোধে ঠিক করে ফেলি, আর ক্রিকেট খেলব না। বাবা নিজের জগতে ব্যস্ত থাকতেন। ফলে ক্রিকেট যে আর খেলব না, এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বাবার সঙ্গে আলোচনার সুযোগ পাইনি। 
 সলিল চৌধুরি, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ভূপেন হাজারিকা, অজয় দাসের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন?‌ সেই অভিজ্ঞতার জন্য কি বর্তমান সুরকারদের সঙ্গে কাজ করতে অসুবিধে হয়?‌
সৈকত:‌‌ আমার সমসাময়িকদের অনেকেরই সলিল চৌধুরি, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ভূপেন হাজারিকা, অজয় দাসের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা নেই। ‌আমার সৌভাগ্য যে এঁেদর সান্নিধ্য ও স্নেহ পেয়েছি। মনে আছে, একবার অজয় দাস বাবার কাছে এলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‌দাদা বম্বে যাচ্ছি। ভাবছি আমার একটা ফিল্মের গান কিশোরদাকে (কিশোরকুমার) দিয়ে গাওয়াব’‌। বাবা ততক্ষণাৎ ওঁকে বললেন, ‘‌চোখ বুজে যাও। এরকম ভার্সেটাইল গায়ক ভারতবর্ষে কোনওদিন জন্মায়নি। জন্মাবেও না।’‌ এই জিনিসগুলো শুনে, জেনে বড় হয়েছি। সেই বিষয়গুলো এখনকার সময়ের সঙ্গে মেলানোটা কঠিন। এখন লোকজন পাবলিসিটি আর মিডিয়ার ফানুসে উড়ে নিজেদের এমন ভাবতে শুরু করে, যে নিজেদের সম্পর্কে সঠিক মূল্যায়নে পৌঁছতে পারে না। 
 গানের প্রাথমিক শর্তের জায়গাটা আর ফিরবে?‌
সৈকত:‌‌ বিশ্বাস করি ফিরবে। সেই শর্তটাকে সামনে রেখেই তো আসছে ‘‌হলুদবনি’‌। সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গল্পের ওপর ভিত্তি করে ছবি। সেই ছবিতে সুরেলা গান করার চেষ্টা করেছি। 
 রিয়েলিটি শো–এর বিচারক হতে ইচ্ছে করে না আপনার?‌ নাকি আপনাকে ডাকেন না চ্যানেল কর্তৃপক্ষ?‌
সৈকত:‌‌ আট–দশ বছর আগে ‘‌গানে মোর ইন্দ্রধনু’‌ বলে একটা অনুষ্ঠান হত। দুটো সিজন বিচারক ছিলাম। প্রথম প্রথম ভাল লাগত। কিন্তু দ্বিতীয় বছরে গন্ডগোল লাগল। চ্যানেলের প্রিফিক্স–করা জায়গা অনুযায়ী চলতে হবে। মানে কে কোন রাউন্ডে যাবে, কে শো থেকে আউট হবে, তা বিচারকদের ওপর নির্ভর করবে না। নির্ভর করবে চ্যানেলের ওপর। এটা আমি মানতে পারিনি। এখন ব্যাপারটা আরও বাড়াবাড়ির জায়গায় গেছে। কে কত পেমেন্ট করছে, তার ওপরও নির্ভর করে। আগে রিয়েলিটি শো–তে ‘‌রিয়েলিটি’‌ অল্পস্বল্প থাকলেও এখন পুরোটাই ইভেন্ট। এতেই আমার আপত্তি। সেটা জানে বলে হয়ত আর আমায় ডাকে না। 
 অনেক রাত পর্যন্ত অনুষ্ঠানের পর ভোরবেলায় উঠে রেওয়াজ করতে ইচ্ছে করে?‌
সৈকত:‌‌ অনেক রাত পর্যন্ত প্রোগ্রামের পর সকাল সকাল ওঠাটা সত্যিই পারি না। মানবকাকু (‌‌মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়)‌‌ বলেছিলেন, ‘‌সারাক্ষণ তানপুরা নিয়ে রেওয়াজটাই গান গাওয়া নয়। ঘুরতে, ফিরতে, গাড়ি চালাতে চালাতেও গলা সাধা যায়।’‌ ওটাই করি। 
 গায়ক শ্যামল মিত্রকে দুনিয়া যতটা পেয়েছে, তার থেকে বাবা হিসেবে কি সৈকত মিত্র অনেক কম পেয়েছেন?‌
সৈকত:‌‌ আমি যখন স্কুলে যেতাম, বাবা ঘুমিয়ে থাকতেন। আর আমি যখন ঘুমিয়ে পড়তাম, বাবা বাড়ি ফিরতেন। এভাবেই কেটেছে অনেকটা সময়। তার মধ্যেও অনেক স্নেহ পেয়েছি। একবার বাবার গাড়ি দুর্ঘটনা হয়। তখন বাবাকে ভীষণভাবে কাছে পেয়েছি। তখন বাড়ির সামনে রকে বসে বাবার মুখে গল্প শুনতাম। 
 বাবার কাছে বকুনি খেয়েছেন কখনও?‌ মনে পড়ে?
সৈকত:‌‌ (‌‌হেসে)‌ বলা কঠিন। একটা ঘটনা মনে পড়ছে অবশ্য। আমি একবার ছাদ পেরিয়ে পাশের ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। বিপজ্জনকভাবে। নিচ থেকে না ওপর থেকে বাবা দেখেছিলেন, সেটা এখন মনে নেই। কিন্তু দেখামাত্রই এমন এক হুঙ্কার দিয়েছিলেন যে, সেই হুঙ্কার শুনে নীচে পড়ে যেতে পারতাম। আবার বেঁচেও যেতে পারতাম। দ্বিতীয়টাই হয়েছিল।

জনপ্রিয়

Back To Top