সৌগত চক্রবর্তী: ‌‌‌• ‘‌গোয়েন্দা জুনিয়র’-‌এর গল্পটা ঠিক কীরকম?‌
ঋতব্রত:‌ ‘‌গোয়েন্দা জুনিয়র’‌ নামটা শুনেই বুঝতে পারছেন গল্পটা পেশাদার গোয়েন্দার নয়। এটা একজন টিন এজ ছেলের গল্প। চরিত্রের নাম বিক্রম। এখন সে পড়াশোনা করছে স্কুলে। ভীষণ শার্প মাথা, পড়াশোনায় ভাল। কিন্তু তার বড় হয়ে ওঠার পেছনে কিছু সমস্যা রয়েছে। কলকাতায় একটা ঘটনা ঘটে আর তদন্তে আসেন কলকাতা পুলিশের একজন গোয়েন্দা। এই চরিত্রটা আমার বাবা (‌শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়)‌ করেছেন। সেই ঘটনার তদন্তে বিক্রমও জড়িয়ে পড়ে। সেই রহস্যের সমাধানটাই মূল গল্প। কিন্তু তার সঙ্গে বিক্রমের বড় হওয়া, তার স্কুল, তার পরিবার, বন্ধু-‌বান্ধব সবটাই উঠে এসেছে। 
• শান্তিদা, আপনি তো সিনিয়র গোয়েন্দা আর আপনার ছেলে জুনিয়র গোয়েন্দা। এই গল্পে শেষ পর্যন্ত কে জিতবে?‌ জুনিয়র না সিনিয়র?‌
শান্তিলাল:‌ (‌হেসে)‌ সেটা জানতে গেলে তো সিনেমাটা দেখতে হবে। তবে সিনিয়র গোয়েন্দা আর জুনিয়র গোয়েন্দার মধ্যে কোনও কম্পিটিশন নেই। দুজনেই একসঙ্গে রহস্যভেদে নামে। সেখানে এই সিনিয়র গোয়েন্দার বুদ্ধি দেখে খুবই আশাবাদী হন। ছেলেটি ভবিষ্যতে প্রপার গাইডেন্স পেলে খুব ভাল কাজ করতে পারবে। সেই জায়গা থেকে তিনি তাঁর এক্সপেরিয়েন্স দিয়ে এই ছেলেটিকে গাইড করতে থাকেন। আমার কাছে এই ছবিটা একটি নবীন ছেলের গোয়েন্দা হয়ে ওঠার গল্প।
• আপনি আর ঋতব্রত একসঙ্গে অনেক ছবিতে কাজ করেছেন। এই গল্পে কি আপনারা রিল লাইফে বাবা-‌ছেলে?‌
শান্তিলাল:‌ না, এখানে আমরা বাবা-‌ছেলে নই। এর আগে মৈনাকের ছবি ‘‌জেনারেশন আমি’‌তে আমরা ছিলাম বাবা-‌ছেলে। এখানে আমার কলিগের ভাইপো হল ঋতব্রত।
• বাবার সঙ্গেই অভিনয় করেছিলে ‘‌পর্ণমোচী’‌ ছবিতে। যথেষ্ট প্রাপ্তমনস্ক বিষয় ছিল এই ছবির। সেখানে বাবা সঙ্গে অভিনয় করতে কোনও অস্বস্তি হয়নি তোমার?‌
ঋতব্রত:‌ না হয়নি। প্রথমত সেন্সর বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ীই ছবিটি তৈরি হয়েছিল। সেন্সর বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ীই এটা একটা অ্যাডাল্ট ছবি। আসলে ‘‌পর্ণমোচী’‌র বিষয়বস্তুটাই ছিল বিশেষ করে ইয়াং ছেলেমেয়েদের জন্য। এই ছবিটা যতটা প্রাপ্তবয়স্কের দেখা উচিত ততটাই ইয়াং জেনারেশনের দেখা উচিত। দুটো ট্র‌্যাক ছিল এই গল্পে। একটা আমার ঘটনাটা আর একটা বাবার ঘটনা। দুটো দুটো বয়সের দুটো সমস্যার গল্প। কিন্তু আমার মাথায় কখনও ‘‌পর্ণমোচী’‌র এই প্রাপ্তবয়স্কর ভাবনাটা ছিল না। আমার মাথায় ছিল শুধু এই ছবির বিষয়টা এই সময়ে খুবই জরুরি। আসলে এই প্রাপ্তবয়স্ক বিষয় সম্পর্কে এই ভাবনাটা পরে আমার মাথায় ঢোকানো হয়েছে। কারণ আমাকে বারবার প্রশ্ন করা হয়েছিল এরকম একটা ‘‌বোল্ড’‌ ছবি করে তোমার কেমন লাগছে। আসলে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই এই কাজটা করা। এবং ভবিষ্যতেও কোনও ছবি করতে গিয়ে আমি ভাবব সেই ছবিটা আজকের জাযগায় দাঁড়িয়ে কি কোনও বার্তা দিতে পারছে?‌ এই ‘‌গোযেন্দা জুনিয়র’‌ গল্পে যেমন একজন শিক্ষক ও ছাত্রের একটা সুন্দর সম্পর্কের কথা রয়েছে। আর এটা তো টিচার্স ডে‌-‌এরই মাস, সেপ্টেম্বর। এই ছবিটা মুক্তি পাবে ২০ সেপ্টেম্বর। আমার সব ছবিতেই মানুষকে সচেতন করার এই ব্যাপারটা রয়েছে।
• শান্তিদা, আপনার কি একজন অভিভাবক হিসেবে মনে হয় ছেলে ঠিকঠাক কাজ গুলো বেছে নিচ্ছে?‌ 
শান্তিলাল:‌ ও এখনও পড়াশোনা করছে। তার মধ্যেই নিজের বিচারবুদ্ধি মতো এই কাজগুলো বেছে নিচ্ছে। আমি মনে করি এই জিনিষটা ওর ওপরেই ছেড়ে দেওয়া উচিত। ‘‌জেনারেশন আমি’‌র মতো নিজের ভাবনাটা ছেলের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার পক্ষপাতী আমি নই। আমি শুধু ওকে বলতে চাই যে কাজটা ও করছে সেটা করার পক্ষে কী কী যুক্তি আছে, না করার ক্ষেত্রেই বা কী কী যুক্তি আছে। সেই কারণগুলো যেন ওর কাছে স্পষ্ট থাকে। আমি হয়তো শুধু বলতে পারি এই এই কারণগুলোর জন্যে এই কাজটা করা উচিত নয়। তবে সিদ্ধান্তটা সম্পূর্ণই ওর।
• আপনাদের নিজেদের থিয়েটার দল আছে। সাম্প্রতিক নাটক ‘‌অপবিত্র’‌। এছাড়াও ঋতব্রত তুমি নিজেও তোমার বন্ধুদের নিয়ে থিয়েটার করছ। সেখানে পরবর্তী কাজ কী আছে?‌
ঋতব্রত:‌ একদম ছোট থেকেই তো আমাদের নাট্য আনন-‌এ কাজ করছি। তাছাড়া যাদবপুর ইউনিভার্সিটির ড্রামা ক্লাবে নাটক করছি। যাঁরা এই ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন চন্দন সেন, ইন্দ্রাশিস লাহিড়ি, কৌশিক গাঙ্গুলি, সুমন মুখোপাধ্যায়। এঁদের সবাইকেই পার্সোনালি চিনি। যাদবপুর ইউনিভার্সিটি ড্রামা ক্লাব যখন নাট্য আননের একটা অনুষ্ঠানে নাটক করতে আসে তখন চন্দন সেন আমাকে দেখে বলেন ‘‌লেগ্যাসি’‌। আসলে ছোট থেকেই আমি দেখে এসেছি, অভিনয়, নাচ, গান, পড়াশোনার একটা পরিবেশ। তাই ছোট থেকেই পরিচালনার প্রতি আমার একটা আকর্ষণ রয়েছে। তবে পরের নাটকটার এখন লেখালেখি চলছে। সেটাও আমরা বন্ধুবান্দবরা মিলেই করব। চেষ্টা করছি আমাদের বয়সী ছেলেমেয়েদের যতটা পারি নিয়ে আসার।
• কবে নাগাদ সেই নাটক মঞ্চে আসবে?‌
ঋতব্রত:‌ কবে নাগাদ বলতে নাটকটা আমি এখন শুধু ইন্টারভ্যাল পর্যন্ত লিখে উঠতে পেরেছি। এইবার দেখা যাক।
• আর নাট্য আনন-‌এর পরবর্তী কাজ?‌
ঋতব্রত:‌ পরবর্তী কাজ এখনই বলছি না। নাম-‌ধাম গুলো একটু গোপন থাক। সেটা না হয়ে পরেই বলব। তবে নতুন নাটক আসছে।
•  তোমার বাবার কাজ তুমি অবশ্যই দেখেছ। সেই কাজের ভিত্তিতে তুমি কি তোমার বাবাকে কিছু সাজেশন দিতে চাও?‌
ঋতব্রত:‌ যখনই বাবা কোনও কাজ করেছে আমি, মা একসঙ্গে সেই কাজ দেখেছি। বাবা হয়ত কখনও কখনও জিজ্ঞেস করেছে, কেমন লাগল?‌ সেটা আমার বা বাবার যে কোনও কাজের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। আমাদের সব কাজই পরিবারের সবাই মিলে দেখি। কারও কোনও কাজ ভাল লাগলে আমরা টাকা অফার করি। এটা অবশ্য আমার মা ও ঠাকুমা মিলে শুরু করেছিল। বাবার ‘‌যুগনায়ক’ দেখে একান্ন টাকা দিয়েছিলাম।‌ 
শান্তিলাল:‌ সেটা শুরু হয়েছিল যখন আমরা ‘‌যুগনায়ক’ নাটকটা করি। আমার স্ত্রীর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল, চন্দন‌ সেন তোমাকে বিবেকানন্দ বানিয়ে এই ব্লান্ডারটা করল!‌ তারপর প্রথম দিন নাটকটা দেখে এসে ছেলে আমায় একান্ন টাকা দিয়েছিল। ওর মা দেখে বলল আমিও দেব। বললাম, ছেলে কোনও রোজগার করে না তাও একান্ন টাকা দিয়েছে। তুমি কত দেবে?‌ সেদিন ওর মা আমাকে ৫০০ টাকা দিয়েছিল।
ঋতব্রত:‌ সেই ট্র‌্যাডিশনটা আমরা এখনও বয়ে নিয়ে চলেছি।
• শান্তিদা, সিনিয়র অভিনেতা ও অভভাবক হিসেবে আপনি ঋতব্রতকে কী সাজেশন দেবেন?‌
শান্তিলাল:‌ একটাই সাজেশন, গ্যাস খেও না। আমি যখন প্রথম ধারাবাহিকে অভিনয় করতে যাই সন্তুদা (‌সন্তু মুখার্জি)‌ আমাকে বলেছিলেন, জানিস তো ইন্ডাস্ট্রির কাজটা এমন যে তুই যদি সফল হোস তাহলে তোকে সবাই রাজা, রাজা, রাজা বলে ডাকবে। কিন্তু তুই আসলে রাজা নয়। কিন্তু তুই যদি তখন নিজেকে রাজা বলে মনে করিস তাহলে যখন তোর কাজ আর মানুষের ভাল লাগবে না, তোকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেবে। তখন তোর পতনটা বড্ড অসহ্য হয়ে উঠবে। কাজেই কখনো নিজেকে রাজা ভাববি না। সন্তুদার এই কথাটাই আমি আজকের ভাষায় আমার ছেলেকে বলতে চাই।

ছবি:‌ বিপ্লব মৈত্র

জনপ্রিয়

Back To Top