লীনা গঙ্গোপাধ্যায়: শেষ অঙ্ক
আমরা যে সন্তুদার অভিনয় কতটা পছন্দ করতাম তা আমাদের প্রযোজনা সংস্থার ধারাবহিকগুলো দেখলেই বোঝা যায়। যখন যে ধারাবাহিক হয়েছে উনি থেকেছেন। এমনকী আমাদের ‘‌সাঁঝবাতি’‌ ছবিতে দেবের বাবার ভূমিকায়ও অভিনয় করেছেন। 
সন্তুদার শেষ ধারাবাহিক ছিল ‘‌মোহর’‌। সেই ‘‌‌মোহর’‌ এখনও চলছে। দেড় মাস ধরে ‘‌মোহর’‌–‌এ উনি নেই। জানুয়ারি মাসে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সেই থেকে বন্ধ হয়ে গেল কাজ। আমরা ওঁর সুবিধেমতো সময় অ্যাডজাস্ট করতে চেয়েছিলাম। তাও হল না। শরীর আর পারমিট করল না। সন্তুদা বললেন, ‌‘‌আমাকে এবার ছুটি দাও।’‌
সন্তুদা আমাদের টিমের কাছে ছিলেন একটা অভ্যেস, একটা সংস্কার। আমরা জানতাম উনি থাকলে ধারাবাহিক ভাল চলবে। 
একটা সময় এল যখন উনি চারটি সিরিয়ালে কাজ করছেন। উনি বলতেন, ‘‌চারটি সিরিয়ালে কাজ। লোকে কী বলবে?’‌‌ আমরা বলতাম, ‘‌নতুন সিরিয়াল শুরু হবে, আর আপনি থাকবেন না?’‌‌ — শুনে উনি হা হা করে হাসতেন। বলতেন, ‌‘‌আমি চারটে সিরিয়ালের সময় ম্যানেজ করতে পারব?‌‌’ ‌আমরা বলতাম সেটা তো আমাদের দায়িত্ব, সময় ঠিক ম্যানেজ হয়ে যাবে।
অভিনয়ের ব্যাপারে ছিলেন নিখুঁত। কোনও ধারাবাহিক নতুন শুরু হলে নিজের চরিত্রটা খুঁটিয়ে জেনে নিতেন। আর অভিনয়ে নিজের সেরাটা দিতেন। নিজের অনুশীলন চালিয়ে যেতেন। রীতিমতো হোমওয়ার্ক করে কাজে নামতেন। 
অসুস্থ ছিলেন গত দেড় মাস। ভেবেছিলাম দেখতে যাব। যে রোববার দেখতে যাওয়ার কথা ছিল, সে রোববার বোলপুরে শুটিং ছিল। দেখতে যেতে পারিনি। ভেবেছিলাম পরের রোববার যাব। তা আর হল না। শেষ দেখা হল না। 
সিনেমা নয়, সিরিয়ালই
সন্তুদা বহু সিনেমায় অভিনয় করেছেন। ‘‌সংসার সীমান্তে’‌, ‘‌রাজা’‌, ‘‌হারমোনিয়াম’‌, ‘‌চাঁদের কাছাকাছি’‌, ‌‘‌শেষরক্ষা‌’‌, ‌‘‌গণদেবতা‌’‌ এবং এরকম আরও অনেক। বেশ কিছু ওঁর অভিনয়ের ছবি আমার মনে আছে। তবু আমার মনে হয়, সিনেমায় যে মূল্যায়নটা ওঁর প্রাপ্য ছিল, সেটা হয়নি। হয়তো সেই সময় অনেক তারকা ছিল ওঁর পাশে। সেই কারণেই কিছুটা নিষ্প্রভ হয়ে গিয়েছিলেন।
ওঁর মতো ‘‌ফাইনেস্ট’‌ অভিনেতা আমার মতে খুব বিরল। আমরা নিজেরা এ কথা বলাবলি করতাম। দু’‌একদিন ওঁকে সঠিক মূল্যায়ন না হওয়ার কথা বলেওছি। সন্তুদা বলতেন, ‘‌আর ও সব কথা ভাবি না।‌’‌ ওই সব কথার মধ্যে কোথাও একটা অভিমান, উদাসীনতা লুকিয়ে থাকত। যেটা উনি প্রকাশ করতে চাইতেন না। 
তাই বলা যায় সিনেমা নয়, সিরিয়ালই সন্তু মুখোপাধ্যায়কে বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। ওঁর অভিনীত ‘‌ইষ্টিকুটুম’‌–‌এর জেঠু প্রত্যেক ঘরের জেঠু হয়ে উঠেছিল।
‘‌কেয়াপাতার নৌকা’‌তে ধনকত্তার (‌‌ধনকত্তা)‌‌‌ চরিত্র করতেন। ধনকত্তা খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। প্রত্যেক সিরিয়ালে জেঠু বা বাবার চরিত্র ওঁর বাঁধাধরা ছিল। ‘‌কুসুমদোলা’য়‌ যে চরিত্রটা করতেন, তাতে কিছু অদ্ভুত শেড  ছিল। অনুসূয়া মজুমদার ছিল ওঁর পাশে। ‘‌অন্দরমহল’‌এও দাপটে পার্ট করেছিলেন। ‘‌জলনূপুর’‌–‌এ একজন মানসিক ভারসাম্যহীন কন্যার অসহায় বাবার চরিত্রে এক কথায়  অসাধারণ অভিনয় ছিল ওঁর। আমাদের প্রত্যেকটা সিরিয়ালে ওঁর চরিত্র একটার চেয়ে আরেকটা আলাদা।
সন্তুদার চলে যাওয়ায় আমাদের প্রোডাকশন হাউসের যে কী ক্ষতি হল, তা বলার নয়। ক্ষতি হল বাংলার তামাম সিরিয়াল দর্শকেরও। 
নানা রঙের দিনগুলি 
আমার সঙ্গে একটা সম্ভ্রমজনক দূরত্ব ছিল সন্তুদার। আবার পারস্পরিক শ্রদ্ধাও ছিল। কোনও সমস্যার শেষ পর্যন্ত সমাধান না হলে উনি কিন্তু আমারই খোঁজ করতেন। একবার ঠিক করলেন মেয়ে–‌নাতনিকে নিয়ে এক মাসের জন্য বিদেশ বেড়াতে যাবেন। ছুটি চাই। আমাকে এসে বললেন। আমি তো দিশেহারা। এ.‌.‌.‌ক.‌.‌.‌মাস!‌ শুটিং হবে কী করে? শেষমেশ সন্তুদাকে বিরতি দেওয়া হল। উনি বেড়াতে গেলেন। 
আরেকটা ইন্টারেস্টিং ঘটনা মনে পড়ছে। উনি একবার বললেন, ‌‘‌লীনা, তোমার বাড়ি যাব। আমার কিছু বলার আছে। তোমাকেই প্রথম বলব।‌’‌ আমি বললাম বেশ। একটা রবিবার দেখে সন্তুদা এলেন। সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে হাজির। অনেক রান্নাবান্না করেছিলাম। খেতে খুব ভালবাসতেন তো!‌ সব পদই খেলেন, তবে একটু একটু। বার বার বললেন, ‌‘‌এত রান্না কেউ করে!‌‌’‌
আসল কথা সেদিন উনি একটা চিত্রনাট্য শোনাতে এসেছিলেন। ইচ্ছে ছিল সিনেমা করার। .‌.‌.‌সে.‌.‌.‌যে কী অনবদ্য চিত্রনাট্য। শুনে মনে হচ্ছিল কোনও আজকের দিনের ২৫–‌৩০ বছরের ইয়ং ছেলে চিত্রনাট্য লিখেছে। শোনাবার পর টুকটাক সাজেশনও চাইলেন।  আমি বললাম, দাদা আমরা অপেক্ষা করে থাকব ছবিটা দেখার জন্য। উনি বললেন, ওঁর মেয়ে স্বস্তিকা পুরো ব্যাপারটাই জানে। প্রোডিউসারদের সঙ্গে কথাও হয়েছে। 
কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রোডিউসার পাওয়া গেল না। এবং সিনেমা বানানোর স্বপ্নও জলাঞ্জলি গেল।  উদাসভাবে সন্তুদা বললেন, ‘‌ওটা আর হবে না।’‌ নেগেটিভ কথা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। তখন আমরা ‘‌মাটি’‌ ছবিটাও করিনি। ছবি করার কোনও প্রস্তুতিও ছিল না। তাই সন্তুদার ছবিটা যে আমরাই করতে পারি, সে কথা মাথায় আসেনি। 
ইচ্ছে আছে স্বস্তিকা আর অজপা ওঁর দুই মেয়েকে বলব যদি চিত্রনাট্যটা এখনও ওদের কাছে থাকে তো ছবিটা করতে পারি। তা হলে হয়তো সন্তুদার একটা আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করতে পারব।
ব্যক্তি সন্তু মুখোপাধ্যায়
আরেকটা মজার গল্প মনে পড়ছে। আমার ছেলের বিয়েতে বউদিকে নিয়ে এসেছিলেন উনি। সন্তুদা এমনিতে খুব আড্ডবাজ, আমুদে মানুষ। কিন্তু সেদিন বউদি থাকায় ওঁরা সব সময় দু’‌জন একসঙ্গেই ঘোরাফেরা করছিলেন। বউদি যেখানে যাচ্ছেন, সন্তুদাও সেখানে। আমারও তো সেদিন খুব ব্যস্ততা। তারই ফাঁকে বললাম, আরে দাদা আজ আপনি বউদিকে নিয়ে এসেছেন, আর কারও দিকে তাকাচ্ছেন না‌ পর্যন্ত!‌
খুব মজা করে হা হা করে হাসতে হাসতে বললেন, ‌‘‌তবে.‌.‌.‌বুঝলে না এই দিকটা 
ঠিক না রাখলে হবে?‌ এ হচ্ছে আমার হোমফ্রন্ট?‌‌’‌
বউদি চলে যাওয়ার পর খানিকটা ভেঙেই পড়েছিলেন সন্তুদা। তো একদিন আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার কি কোনও ডিপ্রেশন হচ্ছে?‌ উনি বলেছিলেন, ‘‌ডিপ্রেশন হয় না, একা লাগে। মেয়ে আর নাতনিও মুম্বই চলে গেল.‌.‌.‌‌।‌’‌ সেই সময় থেকেই দেখছি ওঁর কাজের সাঙ্ঘাতিক খিদেটা চলে গিয়েছিল। যেন কাজ করলেও হয়, না করলেও হয়। 
তখন থেকেই একটা শারীরিক ক্ষয় শুরু হয়েছিল বলে আমার মনে হয়। সন্তুদার মুখে ‘‌কিছু ভাল লাগে না’‌ কথাটা শুনিনি এর আগে। এই প্রথম শুনলাম। ঘটনাটা মাস ছয়েক আগের।
নানা সময়ে একসঙ্গে আউটডোরে গিয়েছি। দেখেছি সব কিছুর পর রাত্রিবেলা উনি পানীয় নিয়ে বসতেন। শৌখিন মানুষ ছিলেন। খুব সুন্দর দেখতে সিল্কের (‌Silk)‌ লুঙ্গি পরতেন। ম্যাচিং স্লিপিং স্যুট পরতেন। তবে আমি যেহেতু পানরসরহিত, তাই আমার সামনে একটু অস্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। কিন্তু গল্প করতেন নানা ধরনের। ইউনিটের অল্পবয়সিদের সঙ্গে খুব সুন্দর সম্পর্ক ছিল। তবে আজকালকার দিনের ছেলেমেয়েদের কাজের প্রতি অসসতা, সময়জ্ঞানের অভাব উনি নিতে পারতেন না। বলতেন, ‌‘‌এদের দেখলে আমার কাজের মোটিভেশন চলে যায়।’‌ অনেক সময় অল্পবয়সি আর্টিস্ট দেরিতে ঢুকলে অসন্তুষ্ট হতেন। একজন সিনিয়র মানুষ হিসেবে শুটিংয়ের জন্য বসে থাকাটা ওর পক্ষে গ্রহণযোগ্য ছিল না। 
আমার কথা
একটা সময় সন্তুদার হিরোসুলভ চেহারা ছিল। তাও হিরো হননি সেভাবে। তপন সিংহ, তরুণ মজুমদার ছাড়া সমসময় বা উত্তরকালের সেরা পরিচালকেরা ওঁকে ব্যবহার করেননি। তা নিয়ে সন্তুদার নীরব  আক্ষেপ আর চাপা অভিমান ছিল। তবু সিরিয়ালের কাজ আর ব্যস্ততা নিয়েই খুশি ছিলেন। সেই খুশি বা আনন্দটা যে ওঁকে দিতে  পেরেছি, সেজন্য আমাদের অবশ্যই একটা পরিতৃপ্তি রয়ে গেল।
আগেই বলেছি ওঁর সঙ্গে একটা সম্ভ্রমজনক দূরত্ব ছিল। আবার পারস্পরিক শ্রদ্ধাও ছিল। শুটিংয়ের পর রাতের দিকে যখন আমাদের প্রোডাকশন ইউনিটের মিটিং হত, একেক দিন উনি ফোন করতেন। বলতেন, ‘‌কী লিখেছো গো!‌ আজকের সিনটা দারুণ লিখেছো। কাজ করে খুব ভাল লাগল‌!‌‌’‌
‌সস্তুদার কাছ থেকে এরকম ফোন পেলে মনটা আনন্দে ভরে যেত।
আজ সন্তুদা নেই। কিন্তু ওঁর আড্ডা, গল্প, হাসি, কথা ওঁর কাছ থেকে পাওয়া প্রশংসা আমাদের জীবনের পাথেয় হয়ে রইল। এইটুকুই অনেক। মানুষ চলে যাওয়ার পর, সব স্মৃতি সুখের মনে হয়।
স্মৃতি সত্যিই সু‌খের। ‌

জনপ্রিয়

Back To Top