অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: দুটো সংসার তাঁর। একটা লেক গার্ডেনস-‌এ, যেখানে শাশুড়ি ঠাকরুন, নিজের ‘‌ভাবনা আজ ও কাল’‌, বাংলা সিনেমার পরিচালক, শিল্পী, সহকর্মী ইত্যাদি নিয়ে তাঁর সংসার। অন্য সংসারটি সিঙ্গাপুরে, যেখানে স্বামী, ছেলে মেয়ে এবং নিজের একান্ত পরিসর। লেক গার্ডেনস থেকে টুক করে ব্যারাকপুর ঘুরে আসার মতো সিঙ্গাপুর চলে যান ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, কাজকর্ম থেকে একটু ফাঁক পেলেই। যদিও কলকাতায় দৃশ্যত তেমন ফাঁক-‌ফোকর ঋতুপর্ণা পান কী না, সন্দেহ। শুটিং, ফটো-‌শুট, পরিচালকদের সঙ্গে মিটিং, নানান অনুষ্ঠান, ছবির প্রচার, বিপনন, ফিতে কাটা ইত্যাদি ইত্যাদি। কথা দিলে কথা রাখেন ঋতুপর্ণা, তবে একটু দেরি হতে পারে, এটাই বিধিসম্মত সতর্কীকরণ।
সদ্য মুক্তি পেয়েছে ঋতুপর্ণার ‘‌পার্সেল’‌। ইন্দ্রাশিস আচার্যর এই ছবিতে শুধু তিনি অভিনেত্রীই নন, অন্যতম প্রযোজকও বটে। তাঁর ‘‌ভাবনা আজ ও কাল’‌ শুরু থেকেই এছবির সঙ্গে যুক্ত। ছবির বিপনন, প্রচার সব কিছু নিয়ে বেশ কয়েকটা দিন ব্যস্ত ছিলেন তিনি। পূর্ব নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আমরা যখন তাঁর লেক গার্ডেন্সের বাড়িতে পৌঁছই সোমবার দুপুরের আগেই, ততক্ষণে 
ঋতুপর্ণার একটা ফটো-‌শুটের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। তখন কিছুটা কথা হল। বাকিটা সিঙ্গাপুর থেকে ফোনে। কারণ, পরের দিনই, করোনা-‌ভ্রুকুটিকে অগ্রাহ্য করে ঋতুপর্ণা পৌঁছে গেলেন সিঙ্গাপুরে।
• করোনার দিনগুলো তাহলে সিঙ্গাপুরে কাটবে?‌
•• আমার তো দুটো সেন্টার। একটা লেক গার্ডেন্সে, অন্যটা সিঙ্গাপুর। দুটো জায়গাতেই আমার সংসার। এখন তো শুটিং আর অন্যান্য বাইরের কাজকর্ম বন্ধ। তাই এখানে অনেক সিনেমা দেখব বাড়িতে। অনেকগুলো বই পড়ব বলে ঠিক করে রেখেছি। ছেলে (‌অঙ্কন)‌, মেয়েরও (‌ঋষনা)‌ ছুটি পড়ে যাচ্ছে। ফলে সঞ্জয় (‌ঋতুপর্ণার স্বামী সঞ্জয়‌ চক্রবর্তী)‌, আমি, ছেলে, মেয়ে একসঙ্গে অনেকটা সময় কাটাব। আমি এই মাসের শেষের দিকে কলকাতায় ফিরব।
• নিজের কোনও শুটিং বন্ধ হল করোনার জন্যে?‌
•• দু’‌একটা কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল। এখন তো সমস্ত ডেট অ্যাডজাস্ট করতে হবে। তবে, এখানে কয়েকটা স্ক্রিপ্ট এনেছি। পড়ব। সেগুলোর সিদ্ধান্তও নিতে হবে। একটা নতুন ভাবনার ডান্স-‌ড্রামা করব। তার কিছু কাজও এগিয়ে রাখব। এর মধ্যে আমাদের ছবি ‘‌পার্সেল’‌ রিলিজ করেছে। বেশ ভাল পিক-‌আপ নিয়েছিল ছবিটা। ডায়মন্ড প্লাজা-‌য় হাউসফুল গেছে। নন্দনে ছ’‌শোর ওপর দর্শক। ‘‌পার্সেল’‌-‌এর নতুন শিডিউল তৈরি করতে হবে। এই মাসে তো সব হল-‌ই বন্ধ। এটা তো কিছু করার নেই। আগে তো মানুষের জীবন।
• ‘‌প্রাক্তন’‌-‌এ ছবির শেষে এক ঝলক দেখা গিয়েছিল শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়কে ঋতুপর্ণার স্বামী হিসেবে। ‘‌পার্সেল’‌ তো দম্পতি হিসেবে ঋতুপর্ণা, শাশ্বত-‌র গল্প। ‘‌প্রাক্তন’‌-‌এর এক ঝলকটাকে অনেকটা বাড়িয়ে নেওয়া গেল?‌
•• ‘‌প্রাক্তন’‌-‌এ শাশ্বত ছিল সারপ্রাইজ। ‘‌পার্সেল’‌-‌এ আমরা দুজন যেহেতু ছবির কেন্দ্রে, তাই ইনেকখানি আদান-‌প্রদান হয়েছে অভিনয়ের। শাশ্বত খুবই সেনসিটিভ অভিনেতা। স্বামী, স্ত্রীর ভূমিকায় আমাদের দুজনকে দর্শকদের ভাল লেগেছে।
• তাহলে, নতুন জুটি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকল?‌
•• এখন তো সেভাবে জুটি-‌র কনসেপ্টটা নেই। এখানে আমাদের দুজনের ক্যারেক্টরই খুব সিরিয়াস এবং গভীর। আমাদের নিয়ে আবার যদি কোনও পরিচালক ভাবেন, দুজনেই খুশি হব।
• নতুন কী কী ছবি শুরু হবে?‌
•• কমলদার সঙ্গে (‌কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়)‌ একটা নতুন ছবি করার কথা হয়েছে। ‘‌পার্সেল’‌-‌এর পর ইন্দ্রাশিস (‌আচার্য)‌-‌এর নতুন ছবিতেও কাজ করার কথা। নির্মলদার (‌চক্রবর্তী)‌ ‘‌দত্তা’‌র শুটিং আবার শুরু হবে। আরও কিছু কথাবার্তা চলছে। স্ক্রিপ্ট পড়ছি। মুম্বইতে অনুরাগ কাশ্যপের সঙ্গে ছবি করলাম—‘‌বাঁশুরি’‌। সেটা রিলিজ হবে।
• দু’‌বছর আগেও দেখা গেছে, বছরে সাত-‌আটটা ছবি করছেন ঋতুপর্ণা। সেটা নিয়ে কেউ কেউ বলেছেন, ঋতুপর্ণা বাছবিচার করে ছবি করেন না। এখন কি সেই মনোভাব পাল্টেছে?‌
•• বাছবিচার তখনও করেছি, এখনও করি। অনেক ছবিকে না বলেছি। বহু ছবিই করিনি। কিন্তু একটা ছবি চলা, না-‌চলা সবটা তো আমার ওপর নির্ভর করে না। তাছাড়া, অনেক সময় স্ক্রিপ্ট পড়েও ঠিকঠাক বোঝা সম্ভব নয়, মেকিংটা কেমন হবে। আর, যারা বলেন আমি ছবি করার ক্ষেত্রে বাছবিচার করি না, তাঁরা সঠিক কথা বলেন না।
• সম্প্রতি অঞ্জন চৌধুরির ছেলে সন্দীপ চৌধুরির ‘‌বিদ্রোহিনী’‌তে অভিনয় করলেন। এই ছবির পোস্টারে লেখা হয়েছিল, ‘‌অঞ্জন চৌধুরি ঘরাণার ছবি’‌। আপনি কি পুরনো বাণিজ্যিক ঘরাণার ছবিতে এখনও আগ্রহী?‌
•• আমি তো কমার্শিয়াল ছবি থেকে উঠে আসা মেয়ে। ফলে, বাণিজ্যিক ঘরাণার ছবির প্রতি আমার একটা অন্য ইমোশন কাজ করে। এই সব ছবিতে যে ড্রামা থাকে, ইমোশন থাকে, বহু দর্শক আজও তা পছন্দ করেন। আমি সেইসব দর্শকদের রেসপেক্ট করি। হ্যাঁ, এটা মানি, অনেক সময় মেকিংয়ের দিকে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার। কিন্তু কমার্শিয়াল ছবিকে আমি কখনও অগ্রাহ্য করিনি, করবও না।
• অনেক নতুন পরিচালকের পাশে আপনি দাঁড়ান। সেটার সঙ্গে কি নিজেরও একটা অন্য ধরনের ছবিতে অভিনয় করার ইচ্ছেটাও যুক্ত থাকে?‌
•• শুধু নিজে অভিনয় করব বলেই নতুনদের পাশে দাঁড়াই, এটা তো সত্যি নয়। আমি মনে করি, অনেকের ক্ষমতা আছে, কিন্তু সুযোগ পায় না। আমি চেষ্টা করি তাদের পাশে সাধ্যমতো দাঁড়াতে। যখন শিবুরা (‌শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়)‌ ‘‌ইচ্ছে’‌ তৈরি করল, তখন তো আমি শিবুর পাশে ছিলাম। ‘‌ইচ্ছে’‌তে কি আমি অভিনয় করেছি?‌ পাভেল এসেছিল আমার কাছে আমাকে নিয়ে ছবি করবে বলে। আমি শিবুর কাছে পাঠিয়েছিলাম পাভেলকে, ওর অন্য একটা গল্প নিয়ে। তৈরি হল ‘‌রসগোল্লা’‌। আবার আমি যুক্ত থেকেছি এমন ছবিও আছে। অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরির প্রথম ছবি ‘‌অনুরণন’‌-‌এর পাশে আমি ছিলাম। এই ছবির যে শুটিংটা লন্ডনে হয়েছিল, আমিই তার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। রঞ্জন ঘোষের ‘‌আহা রে’‌-‌র পাশে থেকেছি। ইন্দ্রাশিসের ‘‌পার্সেল’‌-‌এর পাশেও। ওদের তো দক্ষতা আছে। পাশে দাঁড়ালে এরা কিন্তু নিজেদের যোগ্যতা দিয়েই দর্শকদের ভালবাসা আদায় করে নেবে। নিচ্ছেও। এটাই আমার আনন্দ।
• পাভেলের সঙ্গে কি ছবি তৈরির কথা হয়েছে?‌
•• হ্যাঁ, হয়ত এবছরেই পাভেলের সঙ্গে নতুন ছবির কাজ শুরু করব।
• নিজে ছবি পরিচালনা করতে ইচ্ছে করে?‌
•• ইচ্ছে করে। কিন্তু টেকনিক্যালি যতটা দক্ষ হলে ছবি পরিচালনা করা যায়, ততটা আমি এখনও নই। তাছাড়া অভিনয় নিয়ে ব্যস্ততা তো সবসময়েই রয়েছে। কিন্তু অনেক কিছু ভাবি ক্রিয়েটিভ ওয়েতে। গল্প নিয়ে ভাবি। নতুন ভাবনা নিয়ে মনে মনে এগোই। লিখি। এখানে কয়েকদিনে কিছু লিখবও।
• এবার তাহলে সিঙ্গাপুর-‌বাসটা বেশ সৃষ্টিশীল হয়ে উঠছে?‌
•• (‌হাসতে হাসতে)‌ ডান্স প্র‌্যাকটিসও করব। লিখব। নিজেদের মধ্যে চুটিয়ে আড্ডা দেব। আর একটা প্ল্যানও আছে, প্রতিদিনের জন্যে।
• সেই পরিকল্পনাটা কী?‌ গোপন?‌
•• গোপন নয়। কিন্তু একান্তই নিজের। সিঙ্গাপুর রিভারের পাশ দিয়ে রোজ হাঁটব। আর সুর্যাস্তের আলো দেখব। আজ থেকেই শুরু করছি এই নতুন পরিকল্পনা।
নদীর পাড় দিয়ে হেঁটে ঋতুপর্ণা সিঙ্গাপুরের সূর্যাস্তের আলো মাখুন। কলকাতার শুভেচ্ছা। ‌

জনপ্রিয়

Back To Top