তিস্তা রায় বর্মণ:‌ ‘‌কী হইতে কী হইয়া গেল, ইহার বন্দুক উহার হাতে চলিয়া আসিল’‌ গোয়েন্দা গল্প সিরিজের লেখক বিখ্যাত স্বপন কুমারের নায়ক দীপক চ্যাটার্জির এক অতিমানবিক ক্ষমতা ছিল। যার ব্যাখ্যা স্বয়ং লেখকের কাছেও ছিল না। ভিলেনের সঙ্গে কীভাবে যে বন্দুক নায়কের হাতে চলে আসত তার বর্ণনাগুলো পাঠকের থেকে চেপেই যেতেন লেখক!‌ কখনও বা নায়ক দেওয়াল বেয়ে ওঠার সময় তাঁর এক হাতে থাকত টর্চ, অন্যটিতে বন্দুক আর শেষ হাতটিতে দড়ি। তিন হাতের কারণটা আমরা পাঠকরা আজও বের করে চলেছি। কিন্তু সে মানুষ, প্রচণ্ড বাঙালি। সেই লেখক কিন্তু আমাদের মধ্যে আজও চর্চিত। অনেকদিন পর সেই আমেজটা পেলাম পরিচালক সায়ন্তন ঘোষালের ‘‌সাগরদ্বীপে যকের ধন’‌ ছবিটাতে।
২০১৭ সালে হেমেন্দ্রকুমার রায়ের লেখা ‘‌যখের ধন’‌ গল্পটিকে সিনেমায় রূপ দিয়েছিলেন এই পরিচালক। ছবির নাম ‘যকের ধন’‌। ‌সেই থেকে ছবির দুনিয়ায় বিমল–কুমারের জুটি বেশ হিট। আর তাই পরের ভেঞ্চার ‘‌সাগরদ্বীপে যকের ধন’। বিমল–কুমারের জুটি নিয়েই সৌগত বসুর লেখা নতুন গল্প। একটি বাচ্চা মেয়ের জীবন বাঁচাতে রেড মার্কারির প্রয়োজন, যা রয়েছে দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার এক সমুদ্রের গর্ভে। তারই খোঁজে বিমল–কুমার ও ডাক্তার রুবি চ্যাটার্জির অ্যাডভেঞ্চার শুরু। সঙ্গে আছেন আল–মাহারি রূপী রজতাভ দত্ত, বাঁকাশ্যাম ধর রূপী কাঞ্চন মল্লিক ও ছোট্ট বাচ্চাটি। পরে যোগদান করবেন অভিনেতা কৌশিক সেন ও শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়। সমগ্র অ্যাডভেঞ্চারটি একটা ট্রেজার হান্টের খেলার মতো লাগল। বিমল মোটামুটি দীপক চ্যাটার্জি হয়ে উঠেছে। নামকরা বক্সারকে ঘুঁসি মেরে ফেলে দিচ্ছেন, টপাটপ সব সল্ভ করে ফেলছেন। আর গল্প?‌ একটা করে সূত্র ঝুপ করে চলে আসছে হাতে, সবাই মিলে ফটাফট সমাধান করে চলে যাচ্ছে পরেরটায়। আবার কোনও একটা সূত্র, আবার সমাধান.‌.‌. মাঝে দু’‌চামচ প্রেম, চার চামচ মারামারি, পাঁচ চামচ হাস্যরস।

সবই ধরাতে হবে তাও আবার দু’‌ঘণ্টায়। এটা করতে গিয়ে কম পড়ে গেছে আসল জিনিসটাই, গল্প। গল্পের বুননটাই তৈরি করা যায় নি। সৌগত বসুকে এটা মাথায় রাখতে হত, এত বড় একটা যাত্রা, তার আগে রহস্যের খানিক সমাধান, ছবি সময়ে শেষ করতে গেলে কিছু বাদ দিতে হত। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় সত্যজিৎ রায়ের কথা। ‘‌জয় বাবা ফেলুনাথ’ বলুন বা ‘‌সোনার কেল্লা’, কীভাবে এত সঠিক পরিমাণে সবকিছুকে এই কয়েক ঘণ্টায় ফেলতেন কে জানে!‌ কাজটা কঠিন। এর মধ্যে চরিত্রায়ণের উপরও দিতেন জোর। 
অভিনয় সবারই ভাল। কিন্তু তার মধ্যে আলাদা করে চোখে পড়েছে বাচ্চাটির ও রজতাভ দত্তের অভিনয়। রজতাভ দত্তের এনট্রি এবং তারপর তাঁর সাজ দেখে হলে আপনার সিটি দিয়ে উঠতে ইচ্ছে করবেই। কাঞ্চন মল্লিকের অভিনয়টা একটু বেশি মনে হলেও আপনার মজাই লাগবে। 
সংলাপ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্মার্ট। বিমল ও হিরন্ময়ের বুদ্ধির লড়াই সংলাপে খুব ভাল ধরা পড়েছে। কাঞ্চন মল্লিকের কিছু বাড়তি সংলাপ দর্শককে ইনভল্ভ হতে সাহায্য করবে। ধাঁধাগুলো ভাল লেখা, যা পড়ে আপনার ইচ্ছে করবে বুদ্ধি খাটাতে।
নেপথ্য সঙ্গীতে পণ্ডিত বিক্রম ঘোষ সফল। তবে মাঝে গানটি ছবির সঙ্গে বেমানান লেগেছে। পরিচালনা প্রশংসার যোগ্য। গল্পের সমস্যা যতটা পেরেছেন সায়ন্তন ঘোষাল পরিচালনা ও এডিটের মাধ্যমে পূরণ করার চেষ্টা করেছেন। যেখানে বিমল–কুমার ও রুবী ধাঁধা সমাধান করছে, পরপর ক্লোজ শট যাচ্ছে আর ভয়েস ওভারে চলছে সমাধান, বেশ সূক্ষতার পরিচয় পাওয়া গেছে পরিচালকের। এর সঙ্গে ভিএফএক্সের পরিকল্পনাও সঠিক মাপে পড়েছে কড়াইতে। বলা ভাল, আপনার বাড়িতে অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় ছেলে মেয়ে তাঁদের নিয়ে যান এই ছবি দেখাতে। সরল মনে রোমাঞ্চ বেশি পরিমাণে বাস করে। যুক্তির কথা ভুলে গিয়ে ছবিটি আনন্দ করে দেখবে তারা।     ‌‌           
   ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top