সম্রাট মুখোপাধ্যায়: ভূমিকম্পের পটভূমি
১৯৬৮। উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায় বনাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়!‌
১৯৬৯। উত্তমকুমার বনাম সত্যজিৎ রায়!‌!‌
ছয়ের দশকের শেষ দুটো বছর বড়ই বিতর্কময় ছিল মহানায়কের পক্ষে।
বিশেষতঃ ১৯৬৮ বছরটা যে কেরিয়ারের দিক থেকে একেবারেই ভালো কাটেনি উত্তমকুমারের তার প্রমাণ পরিসংখ্যানই দেবে। মাত্র চারটে ছবি রিলিজ। অগ্রদূতের ‘‌কখনো মেঘ’‌ ব্যবসার দিক থেকে ‘‌অ্যাভারেজ’‌। উত্তম–সুচিত্রা জুটি নিয়ে যে ম্যাজিকটা অগ্রদূত দেখাতেন বোঝা গেছে সেটা এ সময় সুচিত্রা–বিহনে অন্তর্হিত। মঙ্গল চক্রবর্তীর ‘‌তিন অধ্যায়’‌–এরও সেই অবস্থা। অজিত লাহিড়ীর ‘‌গড় নাসিমপুর’‌ ফ্লপ। একমাত্র স্বান্তনা পিনাকী মুখোপাধ্যায়ের ‘‌চৌরঙ্গী’‌। তবে সে ছবিও বক্স অফিসে ব্লক বাস্টার নয়।
আসলে এই ১৯৬৮ সালটা একেবারেই ভালো ছিল না সামগ্রিকভাবে বাংলা সিনেমার পক্ষেই। গোটা বছরে মাত্র ১৯টি ছবি মুক্তি পেয়েছিল!‌ আর এর কারণ ছিল সিনেমার সঙ্গে যুক্ত নানা ধরনের কলাকুশলীদের ও কর্মীদের ধর্মঘট। যার ফলে শুটিং বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। হলে ছবি দেখানোও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ঠিক ৫০ বছর আগের বছরটিতে এক অদ্ভূত অনিশ্চয়তার গর্ভে ঢুকে গিয়েছিল গোটা টালিগঞ্জ।
প্রথম ধর্মঘটটা হয় সিনেমা হলের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের তরফে। খুবই কম মাইনে নিয়ে বিগত কয়েক বছর যাবৎই এই সব হল কর্মচারীরা বিক্ষুব্ধ ছিলেন। বিক্ষিপ্তভাবে যে সব অসন্তোষ কর্মসূচী চলছিল, সেগুলো সংগঠিত চেহারা নেয় এই বছরে। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল ‘‌বেঙ্গল  মোশন পিকচার্স এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন’‌ বা বি এম পি ই ইউ।
আবার উপযুক্ত পারিশ্রমিক পাচ্ছে না বলে ক্ষোভ ছিল সিনেমার নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত কলাকুশলীদেরও। এরাও কিছু নির্দিষ্ট দাবিতে ধর্মঘটের ডাক দিলেন। এর নেতৃত্বে ছিল ‘‌সিনে টেকনিশিয়ানস ওয়াকার্স ইউনিয়ন’‌। এর বছর দশেক আগেও একবার ন্যূনতম মজুরির দাবিতে ধর্মঘট করেছিলেন টেকনিশিয়ানরা। সে সময় অভিনেতৃ সঙ্ঘ, অভিনেতা–অভিনেত্রীদের সংগঠন সমর্থন জানিয়েছিল ঐ লড়াইকে। ঐ সংগঠনের মাথা তখন ছবি বিশ্বাস, বিকাশ রায়। তাঁরা সশরীরে হাজির হয়ে সভা করে সমর্থন জানিয়েছিলেন। তাতে সামিল ছিলেন উত্তম কুমারও। মিছিলেও হেঁটেছিলেন।
১৯৬৮–তে যখন ধর্মঘট শুরু হল, শুরুতে ‘‌অভিনেতৃ সঙ্ঘ’ যথারীতি ‌এই কার্যক্রমে সমর্থন জানিয়েছিল। এই সময়ে ছবিবাবু প্রয়াত হয়েছেন। ‘অভিনেতৃ সঙ্ঘ’‌–এর সভাপতি উত্তমকুমার। সম্পদক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। সমস্যাটা বাঁধল কিছুদিন পর থেকে। ধর্মঘট তখন ১০০ দিনের দিকে গড়াচ্ছে। রাজ্যে তখন যুক্তফ্রন্ট সরকার। ফলে কর্মচারি ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলি কিছুটা এককাট্টা। ইতিমধ্যে বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে উঠল প্রযোজক–মহল।
এই গোলমালের মধ্যেই তৈরি হল ‘‌পশ্চিমবঙ্গ চলচ্চিত্র সংরক্ষণ সমিতি’‌, আসলে এটি বড় প্রযোজকদের ছত্রছায়ায় তৈরি সংগঠন, যার নেতৃত্বে ছিলেন অসিত চৌধুরী, দীপচাঁদ কাঙ্কারিয়ার মতো উত্তমকুমারের ঘনিষ্ঠ প্রযোজকেরা। এই সমিতির সঙ্গে এই ধর্মঘটের কোনো সরাসরি যোগ ছিল না। কিন্তু কর্মী–কর্মচারীদের সন্দেহ ছিলই এটি হচ্ছে আসলে প্রযোজকদের স্বার্থ দেখবার এক ‘‌কভার–আপ–ফোরাম’‌। এই সমিতির মূল দাবি ছিল শহরের তথা রাজ্যের হলগুলোতে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বাংলা ছবি দেখাতে হবে। সে সময় শহর এবং শহরতলীর মাত্র ১৪টি হলে শুধুমাত্র বাংলা ছবি দেখানো হত। ৬০টির মতো হলে বাংলা–হিন্দি দুই–ই দেখানো হত। আর বাকি হলে ছিল হিন্দি ছবির দাপট। এই নিয়ে প্রযোজক–পরিচালকদের ক্ষোভ ছিল ‘‌একজিবিটার্স’‌ বা হল–মালিকদের বিরুদ্ধে। ফলে গোড়ার দিকে হল কর্মীদের এই আন্দোলনে সমর্থন ছিল সমিতি তথা অভিনেতৃ সঙ্ঘের।
কিন্তু হাওয়া বদলে গেল দ্রুত!‌
ছবিঘরে গৃহদাহ
এই ধর্মঘটকে আন্তরিকভাবেই সমর্থন জানিয়েছিলেন উত্তমকুমার। প্রসঙ্গত:‌ উত্তমকুমার নিজেও ছিলেন এমনই এক সিনেমা–কর্মী পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় পাঁচের দশকের শেষদিক পর্যন্ত ছিলেন মেট্রো সিনেমার অপারেটার। উত্তমের প্রথম সিনেমা দেখা বাবার সঙ্গে প্রজেকশান রুম থেকেই।
অভিনেতৃ সঙ্ঘের কার্যকরী সমিতির বৈঠকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, অনুপকুমাররা প্রস্তাব দেন ধর্মঘটীদের সমর্থনে সঙ্ঘের তহবিল থেকে দশ হাজার টাকা দেওয়া হোক। এতেই আপত্তি ওঠে বিকাশ রায়, জহর গাঙ্গুলিদের তরফে। ক্যালকাটা মুভিটোন স্টুডিও–য় সভা চলছিল। এই বাদানুবাদের মধ্যে বলতে উঠলেন সভাপতি উত্তমকুমার।
তিনি বলতে উঠে পরিস্থিতির জটিলতার জন্য দায়ী করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তিনি এও অভিযোগ করেন যে এঁরা তাঁকে ভুল বুঝিয়েছে। এই শুরু হয় বিরোধ। এ নিয়ে পরে ভোটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যান উত্তমকুমার ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। আর সাধারণ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে জিতে গিয়ে অভিনেতৃ সঙ্ঘের সভাপতি হন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।  ১০,০০০ টাকা এরপর দেওয়াও হয় ধর্মঘটি ইউনিয়নকে।
কিন্তু এর কিছুদিনের মধ্যেই পুরনো সংগঠন ছেড়ে বেরিয়ে যান উত্তমকুমার। তৈরি করেন নতুন এক সংগঠন। ‘‌শিল্পী সংসদ’‌। ১৯৬৮ সালের ছয়ই সেপ্টেম্বর। তাঁর তৎকালীন ময়রা স্ট্রিটের বাড়ির বৈঠকখানায়। নামটি ঠিক করেন বিকাশ রায়। যে বিকাশ রায় ছিলেন একসময় ‘‌অভিনেতৃ সঙ্ঘ’‌–এরও জন্মের মূলে। উত্তম–বিকাশের সঙ্গে থাকলেন জহর রায়ও। বিচ্ছেদ ঘটল ভানু–জহর জুটির। কারণ সৌমিত্রবাবুর পরেই ‘‌অভিনেতৃ সঙ্ঘ ’‌–এ সবচেয়ে জোরালো সংগঠক ছিলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। এবং অনুপ কুমারও। সুচিত্রা–উত্তম জুটি অবশ্য ভাঙল না। সুচিত্রা সেন সমর্থন জানালেন ‘‌শিল্পী সংসদ’‌এর প্রতি। আর একটি মজার নাম অনিল চট্টোপাধ্যায়!‌ একটা সাধারণ ধারণা ছিল বামপন্থীরা সবাই ‘‌অভিনেতৃ সঙ্ঘ’‌–এ রয়ে গেলেন। আর কংগ্রেসপন্থীরা গেলেন ‘‌শিল্পী সংসদ’‌–এ। কিন্তু সংসদের কার্যনির্বাহক সমিতিতে  অনিল চট্টোপাধ্যায় বা নির্মল ঘোষ কিংবা যাত্রার শাম্তিগোপালের নাম আজকে এ’‌কথাই মনে করায় যে এই বিভাজনটা বোধহয় অতটা সরল ছিল না। আদর্শগত অবস্থানের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের খতিয়ানগুলোও কোথাও কোথাও মিলে গিয়েছিল।
আরও একটা তথ্য এখানে জরুরি, এই শিল্পী সংসদই কিন্তু প্রবল বামপন্থী হিসাবে চিহ্নিত, জেল পর্যন্ত খেটে আসা উৎপল দত্তকে সংবর্ধনা দিয়েছিল, ‘‌ভরত’‌ পুরস্কার পাওয়ার পরে।
সৌমিত্রবাবুর সাক্ষ্যে জানতে পারা যায় ‘‌অভিনেতৃ সঙ্ঘ’‌ ভাঙার জন্য পরে একান্তে তাঁর এবং ভানুবাবুর কাছে নাকি আক্ষেপ করেছিলেন বিকাশ রায়। বিকাশ রায় তাঁর আত্মকথায় লিখিতভাবে এই ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলেন যে এই দুই সংগঠন আবার জুড়ে যাক।
কিন্তু এ সব তো কিছুটা পরের কথা, ঐ সময়ে কিন্তু নানা মহল থেকে এই  অভিযোগটাই ওঠে, ঘনিষ্ঠ প্রযোজকদের চাপে পড়ে উত্তমবাবু মত বদলেছেন। আবার কেউ বললেন, এন টি ওয়ানের বোর্ড অফ ডিরেক্টরস এ ঢুকে উত্তম প্রযোজকদের প্রতিনিধিই হয়ে গেছেন। উত্তমবাবুরও অভিমান এতটাই তীব্র হয়েছিল যে তিনি তাঁর আত্মজীবনী ‘‌আমার আমি’‌তে এর বেশ কিছু বছর পরেও লেখেন — ‘‌শেষ পর্যন্ত স্থির করলাম আমি অভিনেতৃ সঙ্ঘ থেকে মুক্তি না নিলে উপায় নেই। অর্থনৈতিক ব্যাপারে কোনও সভাপতি জড়িত থাকেন না এটাই সর্বজনবিদিত। অথচ সেই অর্থনৈতিক ব্যাপারে আমার ওপর একটা কলঙ্ক দেবারও চেষ্টা করা হয়েছিল।’‌ সৌমিত্রবাবু তাঁকে কী বলেছিলেন তা তিনি লেখেননি বরং তাঁর অভিমান ছিল অন্যত্র। সতীর্থদের কেউ কেউ তাঁর সম্বন্ধে যে যব আঘাত করার মতো মন্তব্য করছিলেন, সৌমিত্র  বা অনুপকুমার তার প্রতিবাদ করেননি কেন। উত্তমবাবু পদত্যাগ করেন নিজের অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে। আর ঠিক ৫০ বছর আগে তাঁর এই জন্মমাসেই জন্ম নেয় শিল্পী সংসদ। সদস্যসংখ্যা শুরুতেই ১৫০। অফিস হয় ১২৫ ধর্মতলা স্ট্রিটে  অরোরা ফিল্মস–এর দপ্তরে।
উড়ন্ত সবুজ লিফলেট!‌
১৯৬৯–এ উত্তমকুমার ‘‌ভরত’‌ পুরস্কার পেলেন। এই পুরস্কার পাবার পেছনে সত্যজিৎবাবুর ছবি ‘‌নায়ক’‌এর অবদান অনস্বীকার্য। অথচ এই ৬৯-‌এই উত্তমের নাম সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে জড়িয়ে গেল অনভিপ্রেত বিতর্কে। এবং এখানেও সেই প্রযোজককূলের উপস্থিতি ও ভূমিকা।
‘‌চলচ্চিত্র সংরক্ষণ সমিতি’‌র একটা দাবি ছিল সেন্সর–এর তারিখের ভিত্তিতে ছবি মুক্তি  পেতে হবে। পরে সেন্সর হওয়া ছবি যেন আগে হল না পেয়ে যায়। তবে ব্যতিক্রম চলছিলই। ইতিমধ্যে তো উত্তম–সৌমিত্র ভাঙন, সংগঠন দু–টুকরো ইত্যাদি ঘটছিলই। আরও একটা ঘটনা ঘটল, আগে চলচ্চিত্র সংরক্ষণ সমিতিতে থাকলেও এইসব ঘটনার পরে সমিতি থেকে বেরিয়ে এলেন সত্যজিৎ রায়, তপন সিংহ, তরুণ মজুমদার, অজয় কর, রাজেন তরফদারসহ সাতজন নামী পরিচালক। মৃণাল সেন আগেই বেরিয়ে এসেছিলেন। ১৯৬৯–এর ৮ মে মিনার বিজলী ছবিঘরে মুক্তি পেল ‘‌গুপি গাইন বাঘা বাইন’‌। আর এতে চেন আটকে গেল বিকাশ রায়ের ‘‌আরোগ্য নিকেতন’‌ আর উত্তমকুমারের ‘‌মন নিয়ে’–র জন্য। ‘‌আরোগ্য নিকেতন’‌ আবার অরোরা ফিল্মস–এর ছবি, তাদের দাবি ছিল তারা ঐ ছবি ‘‌গুগাবাবা’‌র আগে সেন্সর করিয়েছে। আবার ‘‌গুগাবাবা’‌ প্রযোজক অসীম দত্তদের যুক্তি ছিল এসব রীতি নিয়ম চালু হবার আগে বিজলী কর্তৃপক্ষ–এর সঙ্গে তাঁদের চুক্তি হয়েছে। উত্তমকুমাররা এই মুক্তির বিরোধিতা করলেন। খবর রটে গেল, উত্তমকুমার–বিকাশ রায়রা নাকি শিল্পী সংসদ–এর লোক এনে বন্ধ করে দেবে ‘‌গুগাবাবা’‌র প্রদর্শন। সৌমিত্রবাবু–ভানুবাবু–অনুপকুমার, কালী ব্যানার্জিরা ঐ খবরের ভিত্তিতে বিজলীর সামনে পাহারায় বসলেন।
আরও একটা ঘটনা ঘটল। প্রযোজকদের তরফে গোপনে একটি সবুজ হ্যান্ডবিল নাকি ‘‌সার্কুলেট’‌ করা হয়েছিল। যাতে ছিল একটি ‘‌ব্ল্যাকলিস্ট’‌ আর সৌমিত্র–ভানু–অনুপকে বয়কটের নির্দেশ। তবে সে তো অন্য গল্প।
একটি অ্যান্টি–ক্লাইম্যাক্স
আপাতত:‌ মধুর একটা গল্প। এসবের কিছুদিন পরে বসুশ্রীতে স্বনামখ্যাত মন্টু বসুর অনুষ্ঠানে মঞ্চে দেখা উত্তম ও সৌমিত্র’‌র। অন্য আরও সিনিয়াররা বসে আছেন। সৌমিত্র রীতিমাফিক তাঁদের পা ছুঁয়ে প্রণাম করলেন, শুধু উত্তমকুমারের হাত ধরে শুভেচ্ছা জানালেন।
লাল হয়ে উঠল অভিমানে উত্তমের মুখ। ঐখানেই ধমকে বললেন সৌমিত্রকে, কীরে!‌ বড় ভাই হই। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে পারিস না।’‌ অনেকখানি বরফ গলল ঐখানেই। দু’‌ তরফেই। সৌমিত্রবাবু সঙ্গে সঙ্গে সেদিন বললেন, বড্ড অন্যায় হয়ে গেছে দাদা। মাফ করো, পাও ছুলেন।
বাংলা পারিবারিক ছবির চেয়ে এ দৃশ্য কম কী?‌

জনপ্রিয়

Back To Top