সম্রাট মুখোপাধ্যায়: উত্তর কলকাতার মিনার প্রেক্ষাগৃহে তখন চলছে ‘‌নকল সোনা’‌ ছবিটি। অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত এ ছবির মূল কেন্দ্রবিন্দু বাংলা ছবির অবহেলিত অভিনেতারা। তাঁরাই এখানে মূল চরিত্রে। আর যাঁরা অন্য ছবিতে তারকা, তাঁরা এ ছবিতে ‘‌এক্সট্রা’‌র চরিত্রে। এমন ছবি বাংলায় আর হয়নি।
এ ছবির একটা দৃশ্য তখন পর্দায় চলছে। সেই দৃশ্যে মহানায়ক উত্তমকুমার শ্রদ্ধা জানাতে নিচু হয়ে প্রণাম করছেন বর্ষীয়ান অভিনেতা সন্তোষ সিংহকে। ছবিতে ‌উত্তমকুমার স্বয়ং উত্তমকুমারেরই চরিত্রে। আর সন্তোষবাবুও সন্তোষ সিংহেরই চরিত্রে। এটাও অভিনব ব্যাপার।
তো, উত্তমবাবু নিচু হয়ে যেই সন্তোষবাবুকে প্রণাম করেছেন, সঙ্গে সঙ্গে হলের অল্পবয়সি দর্শকদের একাংশ হইহই করে উঠল। দু–‌একজন চিৎকার করে উঠল— ‘‌নে, নে বুড়ো ধন্য হয়ে গেলি। গুরু তোর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল’,‌ এতদিন পরেও সেদিনের ঘটনাটা ভুলতে পারেন না শম্ভু সিংহ। সন্তোষবাবুর ছেলে।
তিনি সেদিন মনে মনে হেসেছিলেন হলে বসে। দুঃখে। আর ভেবেছিলেন, এই মূর্খেরা যদি জানত বাস্তবে উত্তমের অভিনয়–‌জীবনে সন্তোষবাবুর ভূমিকা কতখানি, তা হলে কি এই মন্তব্য করতে পারত?‌ তারা কি জানে, যেদিন এই দৃশ্যের শুটিং হয়, পর্দায় ঘটা ঘটনার ঠিক অবিকল ঘটনা ঘটেছিল স্টুডিও চত্বরেও। ক্যামেরার চোখের আড়ালেই। সেখানেও প্রণাম করতে নিচু হয়েছিলেন উত্তম।
উইংসে ক্লাসরুম
সন্তোষ সিংহ। তিনি ছিলেন উত্তমকুমারের মাস্টারমশাই। অভিনয়ের খুঁটিনাটি কৃৎকৌশল তাঁর কাছে শিখেছেন উত্তম। জীবনের দুটি পর্বে। যখন তিনি ‘‌নিউকামার’‌, ‘‌স্ট্রাগলার’‌। আবার যখন তিনি ‘‌নক্ষত্র’‌ হচ্ছেন। উত্তমবাবু লিখিতভাবেই রেখে গেছেন তাঁর কৃতজ্ঞতার কথা।
কেরিয়ারের গোড়ায় উত্তম তখন ‘‌ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’‌। এই সময় এম পি পিকচার্স–‌এর মুরলীধর চট্টোপাধ্যায় উত্তমকে চিঠি পাঠালেন, তাঁর কোম্পানিতে যোগ দেওয়ার জন্য।

উত্তম দেখা করতে গেলেন। জানলেন মাসিক চারশো টাকার চুক্তি। তবে অভিনয়ের পরীক্ষা নেবেন সন্তোষ সিংহ। এম পি পিকচার্সের অভিনয় শিক্ষক। সেই সন্তোষ সিংহ পরীক্ষা নেবেন শুনে উত্তম ওরফে অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায় অবশ্য ভয় পাননি। বরং তাঁর নিজের কথায় ‘‌উৎসাহিত’‌ হয়েছিলেন।
উত্তম লিখছেন, ‘‌যথাসময়ে সন্তোষবাবুর দরবারে ধরা দিলাম শিক্ষানবিশ হিসেবে। তারপর থেকে সন্তোষ সিংহের কাছে তালিম নিতে শুরু করলাম। কিছুদিন পর এম পি প্রোডাকসন্সের কর্তৃপক্ষ সন্তোষবাবুর কাছে জানতে চাইলেন নায়ক হিসেবে আমাকে চলবে কিনা। সন্তোষবাবুর রায়ের জন্য আমি উদ্‌গ্রীব। যথাসময়ে তিনি জানিয়ে দিলেন। তাঁর সুস্থ মতামতে আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।’‌
শোনা যায়, উত্তমকুমারকে ৫৬ রকমের ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন শিখিয়েছিলেন তিনি। তবে সবটাই ‘‌এম পি’‌ পর্বে নয়। উত্তমের সঙ্গে সন্তোষবাবুর দ্বিতীয় মোলাকাত স্টার থিয়েটারে শ্যামলী’‌ করতে গিয়ে। ওই সময় শো–‌এর আগেপরে উত্তমকে অভিনয়ের নানা সূক্ষ্ম কাজ শেখাতেন সন্তোষবাবু। তাকানো, হাঁটা, শ্বাস নেওয়া। এবং সর্বোপরি ‘‌ভার্স’‌ বলা। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও লিখেছেন, ‘‌অধিকাংশ তৎকালীন অভিনেতার থেকে সন্তোষ সিংহ মহাশয়ের নামটা অন্যরকমের সম্ভ্রম উদ্রেক করত। শুধুমাত্র নট না থেকে তিনি তদুপরি যে যশ অর্জন করেছিলেন, তা তাঁর অভিনয় শিক্ষক হিসেবে খ্যাতির কারণে।’‌
আশ্চর্য সহজ পদ্ধতি কঠিন সব বাধা পেরিয়ে যেতে শেখাতেন অভিনেতাদের। স্বয়ং শিশিরকুমার ভাদুড়ীও নাট্য–শিক্ষাদানের প্রয়োজনে নিজের অনুপস্থিতিতে ডেকে পাঠানোর কথা বলতেন সন্তোষ সিংহকে। যে শিশিরবাবুর কাছে তাঁকে সদ্য–‌যৌবনে নিয়ে গিয়েছিলেন বন্ধু ধীরেন দাশ। তবে সন্তোষবাবুর প্রকৃত নাট্যশিক্ষক ছিলেন অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। আর্ট থিয়েটারে।
বিলম্বিত স্বীকৃতি
এত অভিনেতাকে তৈরি করেছেন হাতে করে। এম পি পিকচার্স–‌এর মতো নামকরা ফিল্ম কোম্পানির অভিনয় শিক্ষক ও পরীক্ষক তিনি।

মঞ্চের দাপুটে অভিনেতা। অথচ পর্দায় বরাবরই উপেক্ষিত তাঁর নট–‌জীবন। অথচ যখন যেটুকু অভিনয় করেছেন চোখ ফেরাতে পারেনি কেউ। এবং নানারকম চরিত্র।
একদিকে ‘‌জিঘাংসা’‌র সেই রোমাঞ্চকর চরিত্র, তারই পাশে আবার ‘‌ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য’‌–‌য় পুত্রহারা শোকাহত বৈষ্ণব পণ্ডিত। উত্তমকুমারের সঙ্গে একসঙ্গে ছিলেন ‘‌অভয়ের বিয়ে’‌, ‘‌চন্দ্রনাথ’‌, ‘‌পৃথিবী আমারে চায়’‌, ‘‌শ্যামলী’‌ (‌সিনেমা)‌, ‘‌সাগরিকা’‌–‌তে। তবে সবেতেই ছোট ছোট চরিত্রে। আসলে এক সময় পেশাদার মঞ্চে তিনি ছিলেন অহীন্দ্র চৌধুরির ‘‌ডুপ্লিকেট’‌। তখনকার বোর্ড থিয়েটারে এমনটাই রীতি ছিল। অনেকেই মনে করেন সন্তোষবাবুর ছায়ায় ঢেকে যাওয়ার শুরু এখান থেকেই।
মঞ্চে তিনি রঙমহল, মিনার্ভা, স্টার, বিশ্বরূপা— কলকাতার চার প্রধান মঞ্চেই কাজ করেছেন। চারটি মঞ্চেই তাঁর হিট প্রযোজনা একাধিক। ‘‌কর্ণার্জুন’‌, ‘‌চিরকুমার সভা’‌, ‘‌শ্যামলী’‌, ‘‌আরোগ্য নিকেতন’‌, ‘‌ক্ষুধা’,‌ ‘‌কঙ্কাবতীর ঘাট’‌। ‘‌পি ডব্লু ডি’‌ নাটকে সন্ন্যাসী যুবক সনৎ বা ‘‌মাইকেল মধুসূদন’‌ নাটকে গৌরদাস চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও স্মরণীয় হয়ে আছে, তবু মঞ্চেও প্রথম সারির তারকা হিসেবে উচ্চারিত হয় না তাঁর নাম।
দুবার দল খুলেছেন। সফল হয়নি সেভাবে কোনওটাই। একবার তুলসী চক্রবর্তীদের মতো বন্ধুদের সঙ্গে রূপমহল থিয়েটার। আর একবার চিৎপুরে ‘‌রঙ্গমহল’‌। সেখানে সঙ্গে ছিলেন দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
সম্মানগুলো এল শেষ বয়েসে। পর্দায় অভিনয় ছেড়ে দিয়েছেন তখন। সত্যজিৎ রায় ডেকে নিলেন ‘‌জয় বাবা ফেলুনাথ’‌–‌এর জন্য।

সেই মৃৎশিল্পীর চরিত্রে, যিনি খুন হবেন। অদ্ভুত এক মায়ামেশানো অভিনয় করলেন সন্তোষবাবু। এবার তাঁর বাড়িতে এলেন মৃণাল সেন। ‘‌একদিন প্রতিদিন’‌–‌এ বাবার চরিত্র করতে হবে। প্রাথমিকভাবে রাজি হয়েও পিছিয়ে এলেন তিনি। কারণ শরীর দিচ্ছে না। আর শরীর সঙ্গ না দিলে আর নটের রইল কী?‌ দর্শকদের ঠকাতে রাজি নন।
পেয়েছেন সঙ্গীত–‌নাটক আকাদেমি পুরস্কার। রবীন্দ্রভারতীর নাট্যবিভাগে অধ্যাপনা করেছেন বছর বারো। তবু রূপবাণীর পাশে রেলওয়ে বুকিং অফিসের সামনে বৃদ্ধদের সঙ্গে আড্ডাটি ছাড়েননি।
আসল সোনা
আর্থিক অস্বাচ্ছন্দ্য তো ছিলই এক সময়। তবু একদিন উত্তমকুমার ‘‌শ্যামলী’‌ চলার সময় সঙ্গোপনে তাঁকে ‘‌গুরুদক্ষিণা’‌ হিসেবে একটি টাকা ভরা খাম দিতে গেলেন যখন, কী আছে তাতে শুনে সন্তোষবাবুর চোখটা ছলছল করে উঠল। ঘামটা ফেরত দিয়ে বললেন, ‘‌তোমাকে ভালবেসে শেখাই উত্তম.‌ তুমি সেটাকে অপমান করছ।’‌
এর অনেক বছর পরে সেদিন ‘‌নকল সোনা’‌র শুটিং। উত্তমের গাড়ি ঢুকছে স্টুডিওয়। বহুদিন দুজনের দেখা নেই। চিনতে পারে কিনা পারে, তাই ইচ্ছে করেই একটু ঘুরে বসেছেন সন্তোষবাবু। উত্তম নেমে সটান তাঁর পায়ের ধুলো নিলেন। চমকে উঠে সন্তোষবাবু বললেন, ‘‌এ কী করছো উত্তম, তুমি ব্রাহ্মণ সন্তান!‌’‌
উত্তমকুমার— ‘‌আমায় বাধা দেবেন না দাদা। আপনাকে তো নয়, প্রণাম করছি আপনার গুণকে।’‌
সন্তোষবাবু উত্তমকে জড়িয়ে ধরলেন, বললেন, ‘‌ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি তুমি আরও বড় হও।’‌
সেদিন আর উত্তমের গুরুদক্ষিণায় বাধা দিতে পারেননি সন্তোষবাবু।

 ‘‌অভয়ের বিয়ে’‌ ছবিতে উত্তমকুমারের সঙ্গে হরিদার চরিত্রে ,‘কর্ণার্জুন‌’‌-এ শকুনি চরিত্রে , ‘‌পথের শেষে’‌ ছবিতে গোবিন্দ চরিত্রে, ‌‘জয় বাবা ফেলুনাথ‌’‌ ছবিতে
        

জনপ্রিয়

Back To Top