সম্রাট মুখোপাধ্যায়: এপার–‌ওপার। দু‌টো দেশ। একই গান গাইছে পর্দায়। একই সুরে। ভাষাটা একটু বদলে নিয়ে। আর কয়েকটা শব্দ অদল–‌বদল ক‌রে।
কারণ একটা গল্প। দু‌টি শিশুকে ঘিরে তৈরি হওয়া একটি গল্প। যা তোলপাড় তুলেছে সীমান্তের এপার–‌ওপার, ভারত–‌পাকিস্তান দু’‌পারের দর্শকদের মনেই।
আর সেই আবেগকে জুড়ে দিয়েছে একটি মুখ। এক শিশু অভিনেতার একটি নিষ্পাপ মুখ। যার নাম রতনকুমার। এটা অবশ্য তার পর্দা–‌নাম। বাস্তবে জন্মসূত্রে তার নাম সইদ নাজির আলি রিজভি। ১৯৪১ সালের ১৯ মার্চ অবিভক্ত ভারতের রাজপুতানার আজমিড়ে যার জন্ম। ১১ বছর বয়সে সিনেমার পর্দায় আসতে গিয়ে যার নাম বদলে রাখা হয় রতনকুমার।
আজকের দিনের বিখ্যাত পরিচালক বিক্রম ভাটের ঠাকুর্দা বিজয় ভাট ১৯৫২ সালে বানিয়েছিলেন হিন্দি ছবি ‘‌বৈজুবাওরা’‌। সম্রাট আকবরের সময়কালের দুই মস্ত গায়ক মিঞা তানসেন আর বৈজুবাওরার সাঙ্গীতিক লড়াইয়ের কাহিনি। নামভূমিকায় ভারতভূষণ। নৌশাদ–‌এর সুরে মহঃ রফির হৃদয় তোলপাড় করা গান। নায়িকা মীনাকুমারী। এত কিছুর মধ্যেও ছোট বৈজুর চরিত্রে রতনকুমার তার মুখখানা গেঁথে দিতে পেরেছিল দর্শকমনে, অভিনয়ের নিজস্বতার গুণে। সংলাপ বলার ভারী মিষ্টি সুরেলা একটা ধরন ছিল তার। এ ‌ছবি চলল ১০০ সপ্তাহ!‌
এমন ‘‌ভিনি–‌ভিসি–‌ভিডি’‌তেই গল্প শেষ নয়। এরপরের দু’‌বছরে এমন ‘‌হ্যাটট্রিক’‌ সাফল্য দেখাল রতন, যা চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতো।
আর সেই নামে পরপর এল ‘‌দো বিঘা জমিন’‌ (‌‌বিমল রায়)‌‌, ‘‌বুট পালিশ’‌ (‌‌পরিচালনা:‌ প্রকাশ অরোরা, প্রযোজনা:‌ রাজ কাপুর)‌‌, ‘‌জাগৃতি’‌ (‌‌সত্যেন বসু)‌‌। পাঁচের দশকের শুরু।  আরব সাগরের তীরেও এসে লেগেছিল ইতালীয় ‘‌নিউ রিয়ালিজম’‌-‌এর ঢেউ। ওপরের তিনটে ছবিতেই ছিল সেই সমাজ বাস্তবতার ছোঁয়া।
‘‌দো বিঘা জমিন’‌–‌এ জমিহারা রিকশাওয়ালা শম্ভু মাহাতোর বাচ্চা ছেলের চরিত্রটি করেছিল রতন। কানাহাইয়া মাহাতো। যে ধীরে ধীরে অবস্থার চাপে হয়ে উঠছে কলকাতার পথে এক ঠিকানাহারা শিশুশ্রমিক। কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘‌পাম ডি ওর’‌ পেয়েছিল এই ছবি। রতন অভিনীত চরিত্র হয়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক সিনেমা–‌ভুবনের স্বীকৃত অংশ।
• নবতরঙ্গ
ঢেউ যেমন ঢেউ আনে, ‘‌দো বিঘা জমিন’‌ আনল ‘‌বুট পালিশ’‌। রাজ কাপুর তখন ‘‌নিউ রিয়ালিজম’‌–‌এ মেতেছেন। সঙ্গে মেশাচ্ছেন নিজস্ব ঘরানার সাঙ্গীতিক মেজাজ। প্রযোজনা করলেন ‘‌বুট পালিশ’‌। একপাল পথ শিশুর কাহিনি। ‘‌দো বিঘা জমিন’‌–‌এ কানাহাইয়া হারিয়েছিল গ্রামের বাড়ি। আশ্রয় পেয়েছিল পথে। আর এই ছবিতে ভুল পথে হারিয়ে ফেলল ছোট বোন বেলুকে। ভাই–‌বোনের চরিত্রে রতনকুমার আর বেবি নাজের মর্মস্পর্শী অভিনয় ভোলার নয়।
আর একইরকমই আরেক হারিয়ে ফেলার গল্প হল ‘‌জাগৃতি’‌। যাতে ওই ১৯৫৪–‌তেই অভিনয় করলেন রতন। এবার হস্টেলের দুই বন্ধুর গল্প। অজয় বড়লোকের ছেলে। দুষ্টু। হস্টেলে এসেছে পড়তে। দুষ্টুমির কামাই নেই। আর তারই রুমমেট শক্তি। খোঁড়া এক ছেলে। মা অন্যের বাড়ি বাসন মাজে। গরিব, কিন্তু মেধাবী। শক্তি বদলে দিল অজয়কে। আক্ষরিক অর্থেই জীবন দিয়েই। শক্তির চরিত্রে রতনকুমার। 
আর তারপর দু’‌বছর পরে ১৯৫৬–‌তেই হারিয়ে ফেলার এক অন্য বাস্তব গল্পে ঢুকে পড়ল রতনকুমার ওরফে সইদ নাজির আলি। নিজের পরিচিত ভূখণ্ড হারানোর গল্পে। দেশ বদলে ফেলার গল্পে। সপরিবারে ভারত ছেড়ে পাকিস্তানে চলে গেল রতনকুমার। ‘‌পারফরমেন্স’‌ ও সাফল্য বিচার করলে সম্ভবত হিন্দি সিনেমার সফলতম শিশুশিল্পী।
• তরঙ্গভঙ্গ‌
গেলেন বটে পাকিস্তানে। কিন্তু ‘‌জাগৃতি’‌ ছাড়ল না তাকে। হয়তো এখানেই সিনেমা আর সুরের জিত। তারা অবলীলায় সীমান্ত টপকে যায়। ‘‌জাগৃতি’‌‌ রিমেক হল পাকিস্তানের ‘‌বেদরি’‌ নামে। ১৯৫৬–‌য়। আর তাতে একই চরিত্র করলেন রতন। তবে এবার আর রতনকুমার নামে নয়। স্বনামে।
‘‌জাগৃতি’‌ বক্স অফিসে সুপারহিট হওয়ার কারণ ছিল একটি গান। ‘‌আও বাচ্চো তুমে দিখাঁয়ে ঝাঁকি হিন্দুস্তান কি’‌, যে গানটি আজও ছ’‌দশক পরেও স্বাধীনতা দিবসে বা সাধারণতন্ত্র দিবসে সারা দেশে বাজে মাইকে–‌মাইকে। সিনেমা–‌সঙ্গীতের তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা পেরিয়ে এই গান এখন এদেশে চিরন্তন দেশাত্মবোধক এক গান।
মজার কথা ‘‌বেদরি’‌–‌তেও এই গানটি হুবহু একই সুরে একই সিকোয়েন্সে ব্যবহৃত হল। তা হয় গেল ‘‌আও বাচ্তো সায়ের করায়ে তুমকো পাকিস্তান কি’‌‌। একই ঘটনা ঘটল আরেক বিখ্যাত গানের বেলায়ও। গান্ধীজিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি গানের কথা ছিল ‘‌দেদি হামে আজাদি বিনা খড়্গ বিনা ঢাল/‌সবরমতীকে সন্ত তুনে কর দিয়া কামাল’‌। ‘‌বেদরি’‌তে তা হল ‘‌দেদি হামে আজাদি কি দুনিয়া হুয়ি হ্যায়রান/‌অ্যায় কায়দ–‌এ–‌আজম তেরা এহসান হ্যায় এহসান’‌। গান্ধী হয়ে গেল জিন্নাহ।
ছবি প্রথম সপ্তাহে সুপারহিট হল। গানে–‌গল্পে–‌অভিনয়ে। হইচই শুরু হল রতনকুমার থুড়ি রিজভিকে নিয়েও। কিন্তু জানাজানি হয়ে গেল এই ছবি এক ভারতীয় ছবির ‘‌রিমেক’। ভারতীয় ছবি তখন নিষিদ্ধ পাকিস্তানে। অভিযোগ গেল পাক সেন্সর বোর্ডের কাছে। ছবি নিষিদ্ধ হল। ওই গান দুটিও নিষিদ্ধ হল পাকিস্তানে।
• উপসংহার
চার্লি চ্যাপলিনের ‘‌দ্য কিড’‌–‌এর বিস্ময়কর শিশুশিল্পী জ্যাকি কুগান হারিয়ে গিয়েছিল পর্দা থেকে। ত্রুঁফোর ‘‌ফে হান্ড্রেড ব্লোজ’‌–‌এর কিশোর অভিনেতা জাঁ পিয়ের লাউড অভিনয়ে পরবর্তীতে আর সে তৃপ্তি পাননি। একই নিয়তি নিয়ে যেন এসেছিলেন রিজভিও। বড় হয়ে পাকিস্তানে কিছু ছবি করলেন। তার মধ্যে নিজের দাদার প্রযোজিত ‘‌নাগিন’‌ও ছিল। সে ছবির নায়ক হলেন। ছবি হিটও হল। কিন্তু তারপর আর সাফল্য এল না। এক সময় হতাশ রিজভি অভিনয় ছেড়ে ঢুকে পড়লেন পারিবারিক কার্পেটের ব্যবসায়।
পরের ঘটনা আরও মর্মান্তিক। লাহোরে এক পথ–‌দুর্ঘটনায় মারা যায় তাঁর চার বছরের কন্যা। এর পরেই তিনি দেশ ছেড়ে চলে যান আমেরিকায়। সেখানে ২০১৬ সালে মারা যান তিনি। সিনেমা থেকে সরে গেছেন বহুদিন, তবু জাগৃতির গান দুটো বাজলেই ভেসে আসে তাঁর মুখ। স্মৃতিতে। ‌ ‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top