মমতাশঙ্কর
সবার কাকা যেমন হন, তেমনই আমার কাকা রবিশঙ্করও ছিলেন আমার খুব কাছের, আমার খুব আপন। ছোটবেলায় তো পৃথিবী বিখ্যাত সেতার–শিল্পী পণ্ডিত রবিশঙ্কর বলে তাঁকে বুঝিনি। আসলে, কোনও দিনই বিখ্যাত কেউ বলে টের পাইনি কখনও। বাবা উদয়শঙ্করকে যেমন, কাকা রবিশঙ্করকেও তেমন বাড়িতে নিজের লোক, আপন লোক বলেই জেনে এসেছি।
যখন বড় হয়েছি, দেখেছি দেশে–‌বিদেশে কতটা ব্যস্ততা কাকার। কিন্তু যখনই আমাদের বাড়িতে আসতেন, তখন তিনি একজন মজার মানুষ, স্নেহপ্রবণ মানুষ।
বাবা তো কাকার চেয়ে অনেকটাই বড়। প্রায় ২০ বছরের। কাকাকে বাবা পুত্রসম ভালবাসতেন, স্নেহ করতেন। আর, বাবাকে কাকা অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন, ভালবাসতেন। ছোটবেলাটা কাকার সঙ্গে এত হইচই করেছি, ভাবাই যায় না।
আর, আমার মা অমলাশঙ্করের সঙ্গে কাকার সম্পর্ক ছিল একেবারে বন্ধুত্বের। প্রায় একই বয়সি ছিলেন দুজনে। কাকার জন্ম ১৯২০–‌তে। মায়ের ১৯১৯। এক বছরের ছোট–‌বড়।
মা যখন প্রথম প্যারিসে যান তাঁর বাবা (‌আমার দাদু)‌ অক্ষয়কুমার নন্দীর সঙ্গে, তখন আমার মায়ের বয়স ১৩ বছর। মা তখন অমলা নন্দী। সেই ইউরোপ ভ্রমণের কথা মাত্র ১৪ বছর বয়সে মা লিখেছিলেন তাঁর ‘‌সাত সাগরের পারে’‌ বইতে। সেখানেই আছে, প্যারিসে বিলাতি পোশাক–‌পরা উদয়শঙ্করের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়। তাঁদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ পেলেন ১৩ বছরের অমলা আর তার বাবা। 
ওই বাড়িতে মায়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল ‘‌রবু আর মাসিমাকে পাওয়া’‌। সেই তখন থেকেই রবু অর্থাৎ রবিশঙ্কর ছিলেন মায়ের ভাই এবং খেলার সাথি। এই সম্পর্ক অটুট ছিল চিরকাল।
একবার, বাবা তখন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন একটু। কাকার ক্যালিফোর্নিয়ার সানদিয়েগোর বাড়িতে তখন বাবা আছেন। সেটা ১৯৬৮–‌‌৬৯ সাল হবে। আমরা সবাই ওখানে গিয়ে প্রায় মাসখানেক ছিলাম। একদিন কাকা আমাদের নিয়ে কাছের একটা মার্কেটে গেলেন। কাকা, মা, দাদা (‌আনন্দশঙ্কর)‌ আর আমি। বাজারে পৌঁছনোর পর কাকাকে ঘিরে মানুষের ঢল নেমে গেল। লোকজন দোকান থেকে কাগজের কাপ, কাগজের প্লেট কিনে এনে কাকার অটোগ্রাফ নিতে শুরু করল। কাকার জনপ্রিয়তা বিদেশেও যে কোন পর্যায়ে, সেদিন টের পেয়েছিলাম।
কাকার শেষ জীবনে তাঁকে যেভাবে যত্ন করে রেখেছিলেন সুকন্যা–কাকিমা, তার জন্যে তাঁকেও আন্তরিক ধন্যবাদ দেব। কাকা নেই, এটা মাঝে মাঝে মনেই থাকে না। আজ পূর্ণ হচ্ছে তাঁর জন্মশতবর্ষ। এই লকডাউন–পর্ব কেটে গেলে তাঁকে নিয়ে অনুষ্ঠান করার ভাবনা আছে। আজ তাঁকে আমার প্রণাম।

জনপ্রিয়

Back To Top