‌সৌগত চক্রবর্তী: • আপনার নতুন ছবি ‘নির্বাণ’‌ নিয়ে কিছু বলুন।
•• এই ছবিতে আমার চরিত্রের নাম ‘‌বিজলীবালা’‌। এই ছবি করতে করতেই মনে হয়েছিল, দেশের প্রত্যেকটা কোনে এই ছবিকে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত। আমি গৌতমদাকে সে কথা জানাই। উনি হিন্দিতে এই ছবি ডাব করার ব্যবস্থা করেন। আর সর্বভারতীয় মানুষরা যাতে বুঝতে পারেন সেই কারণেই নাম রাখা হয় ‘‌নির্বাণ’‌। এটা কিন্তু হিন্দি শব্দ নয়। সংস্কৃত শব্দ।
• আপনাকে অনেকদিন পরে কলকাতার মানুষ পেলেন।
•• আমি কলকাতায় আসি না এমন তো নয়। কিন্তু নিঃশব্দে আসি। কেউ জানতে পারে না কখন আসি, কখন যাই। কখন কোথায় ঘুরে বেড়াই। প্রত্যেকটা রাস্তাঘাট আমার চেনা। সে বাজারই হোক, মাছের বাজার হোক (‌হাসি)‌, তেলেভাজার দোকান হোক, রাধুবাবুর দোকান হোক, ট্যাংরা হোক সব জানি। এখানে খুব তাড়াহুড়োর মধ্যে কেউ চিনতে পারে না। এই একটা সুবিধে (‌হাসি)‌। এই তো বারাসাতের মোড়ে ইয়া বড় বড় বেগুনি হয় (‌হাতের মাপ দিয়ে দেখালেন)‌, টালিগঞ্জ থেকে একটু এগিয়ে গেলেই একটা দারুন মাছের বাজার আছে জানেন?‌ এছাড়াও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের ঘুগনি, দেশপ্রিয় পার্কের ফুচকা। এই তো ‘‌নির্বাণ’-‌এর শুটিংয়ের সময় প্রতিদিন তেলেভাজা আর মুড়ি খেতাম। আগে তো মশলা নিয়ে শুটিং করতে যেতাম। প্রোডিউসার কে বলে হাঁড়ি-‌কড়া জোগাড় করতাম। সেখানে কলাকুশলীদের রান্না করে খাওয়াতাম।‌
• পরিচালক গৌতম হালদারের সঙ্গে যোগাযোগ হল কীভাবে?‌ 
•• এর আগে লাস্ট যে ছবিটা করেছিলাম সেটা ছিল ঋতুপর্ণ ঘোষের। ‘‌শুভ মহরৎ’‌। তারপর আমি ভেবেছিলাম আর করব না। গাছপালা, গবাদি পশু, আমার খামার বাড়ি আর দেশঘোরা তাই নিয়ে ছিলাম। তার মাঝখানে আমার পাশে এই যে লোকটিকে দেখছেন (‌পরিচালক গৌতম হালদার কে দেখিয়ে)‌ তিনি এসে পড়লেন (‌হাসি)‌। ওঁর কোনও ছবি আমি দেখিনি। যেদিন প্রপোজালটা এল সেদিন আমি হাসপাতালে। আমার মেয়ে ‘‌বস্কি’‌, আপনারা তাঁকে চেনেন মেঘনা নামে। ওর ছেলে হয়েছে। পরে গৌতমদাকে ডেকে নিলাম আমার ফার্ম হাউসে। একপাল গরু-‌ছাগলের পাশে বসে ওঁর গল্পটা শুনলাম (‌হাসি)‌। হঠাৎ করেই মনে হল যে না, এই ছবিটা তো করতেই হবে। শুধু চরিত্রের জন্য যে এই ছবিটা করেছি, তা নয় কিন্তু। ছবির সাবজেক্টটা দেখে করেছি। আর কোনও দিক দেখিনি। কী ভাল অভিনয় করেছেন প্রত্যেকে।
• সাম্প্রতিক বাংলা ছবির পরিচালকদের কাজ দেখেন?‌
•• আমি এখন অনেক কিছুই জানি না। এই যেমন আমার পাশে যিনি বসে আছেন (‌রাজ চক্রবর্তী)‌ তিনি যে একজন বিখ্যাত পরিচালক, জানতাম না। এখানে এসে জানলাম। আমার বাড়িতে বাংলা চ্যানেল আসে। এই দুর্গাপুজোর সময় সেখানে একটা ছবি দেখলাম। কিছুটা শুরু হয়ে গিয়েছিল, আমি তার পর থেকে দেখেছি। ‘‌ভূতের ভবিষ্যৎ’‌। খুব ভাল লেগেছে। ছবিটা বেশ মজার।
• আপনার অভিনয় জীবনে বহু পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা যদি বলেন।
•• আমার তো অভিনয় করার কোনও প্ল্যান ছিল না। হতে চেয়েছিলাম বিজ্ঞানী, হয়ে গেলাম অভিনেত্রী। আমি যেসব পরিচালকের সঙ্গে কাজ শুরু করেছিলাম তাঁরা ছিলেন গুরু স্থানীয়। প্রত্যেকে আমার শিক্ষক। আমি কিচ্ছু জানতাম না। ওঁরা আমাকে বলে দিতেন কী করতে হবে। ঠিক করেছিলাম এসেই যখন পড়েছি এই কাজটার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করব না। সবার কাছ থেকেই কিছু না কিছু শিখেছি।
• পানভেলে আপনার ফার্মহাউস আছে। সেখানে গাছপালার মধ্যে থাকেন। কেমন লাগে?‌
•• আমি আজ থেকে নই। যখন ছোট ছিলাম তখনও জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে বসে থাকতাম। গাছে চড়তাম, চূর্ণী নদীতে সাঁতার দিতাম।
• এই যে বললেন স্টুডিওয় আপনি সবার জন্য রান্না করতেন.‌.‌
•• রান্নাও তো একটা সায়েন্স। নানা রকম মশলা মিশিয়ে এক একটা রান্নার কেমিস্ট্রি খুঁজে নিতে হয়। আমার বাড়িতে সবসময় বাঙালি রান্নাই হয়।
• মেয়ে মেঘনা গুলজারের ছবিতে কাজ করার ইচ্ছে আছে?‌
•• কেন মেয়ের বোঝা হয়ে থাকব বলুন তো?‌ আমি ওর মা বলে?‌ ও যা হতে চেয়েছিল তাই হতে দিয়েছি। আমি ওকে ফিল্ম অ্যাকট্রেস বানাই নি। এটা কোনও প্রথা নয়। যে ধরনের ছবি ও বানাচ্ছে, একটু সিরিয়াস ধরনের, সেখানে আমার যদি কোনও রোল না থাকে?‌ ও যদি কোনও দিন বলেও মা, এই চরিত্রটায় অভিনয় করবে?‌  তাহলেও নিজের ক্যারেক্টরটা দেখব, তারপর গল্পটা দেখব, তারপর রাজি হওয়ার প্রশ্ন।
• আপনার সমসাময়িক অনেকেই তো এখনও অভিনয় করছেন। আপনি ছেড়ে দিলেন কেন?‌
•• একজন মানুষ, যিনি চাকরি করেন, তিনি কি অবসর নেন না?‌ কাজেই একজন অভিনেত্রী কী দোষ করল?‌ আরে জীবনটা অনেক বড়। অনেক কিছুই করার আছে জীবনে। আমি এখন আমার জীবন কাটাচ্ছি প্রকৃতির সঙ্গে। একপাল গবাদি পশু আর গাছপালার মধ্যে। তা ছাড়া একটা সময় থামতেই হয়। প্রায় ৪৫বছর কাজ করেছি। এখন থামতে জানার মানুষ কম। এই যে থামলাম, তার জন্য আমার কোনও রিগ্রেট নেই।
• আপনার প্রিয় পরিচালক কে?‌
•• তপন সিংহ। ওঁর ছবি তৈরির প্যাটার্ন আমার খুব প্রিয়। প্রত্যেকটা ছবি করতে গিয়েই তিনি মানুষের কাছে পৌঁছে যেতেন। হাটে, বাজারে মানুষের সঙ্গে মিশে উনি কাজ করতেন। আমারও এটা খুব প্রিয়।
• কলকাতাকে মিস করেন?‌
•• পাড়া-‌প্রতিবেশী নিয়েই তো আমাদের জীবন। একমাত্র উত্তর কলকাতা ছাড়া আর কোথাও পাড়া নেই। বিশাল বিশাল ফ্ল্যাট আর তার বাইরে বিরাট একটা নামের লিস্ট। সেই নামগুলোই প্রতিবেশী। একটা বিপদে পড়ুন, কেউ এগিয়ে আসবেন না। এখানে দিদি আছে, কাকা আছে, মামা আছে, কিন্তু মুম্বইতে সবাই ‘‌জি’‌। আমি তো খুব ধন্দে ছিলাম মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে কী বলে ডাকব—মমতাজি?‌ একটা প্রটোকলের ব্যাপার আছে তো!‌ শেষ পর্যন্ত ডেকেই ফেললাম ‘‌মমতাদি’ বলে।‌

ছবি: সুপ্রিয় নাগ  ‌

জনপ্রিয়

Back To Top