তন্ময় বসু
আজ একশো বছর পূর্ণ করলেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর। উনি চলে গিয়েছেন ভাবতে আমার অসুবিধে হয়। যতদিন রাগসঙ্গীত থাকবে, ততদিন থেকে যাবে রবিশঙ্কর নামটি। আমি ওঁর চোখ দিয়ে সারা পৃথিবী দেখেছি।
স্বপ্নের মতো অডিটোরিয়ামে ওঁর সঙ্গে বাজিয়েছি, নানা দেশে ঘুরেছি। ওঁর কাছে বাজনার  শৈলী নিয়ে আলোচনা শুনেছি। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১২ সাল আমি ওঁর সঙ্গে বাজিয়েছি। আমার দারুণ সময়। বিরাট সৌভাগ্য যে ওঁর আশীর্বাদ ও ভালবাসা পেয়েছি। ভারতীয় মার্গসঙ্গীতকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে ওঁর অবদান কতখানি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সঙ্গীত রসিকেরা সকলেই জানেন। ভারতীয় সঙ্গীত বিশ্বের দরবারে পৌঁছেছে ওঁর জন্যই। পণ্ডিতজি গান বাজনা নিয়ে আলোচনা করতে খুব ভালবাসতেন। অসংখ্য বই পড়তেন। বিশেষ করে ফরাসি বই। পৃথিবীর যেখানে যখন যেতেন বার্নস অ্যান্ড নোবেলের স্টোর থেকে ইংরেজি বই কিনতেন। সঙ্গে থাকলে আমরাও কিনতাম। কলকাতা থেকে কতবার কত পুজো সংখ্যা কিনে নিয়ে গিয়েছি। প্রচুর বাংলা বই পড়তেন। 
পণ্ডিতজির সান দিয়াগোর বাড়িতে একটা শো টাইম ‌ছিল। লাঞ্চের পর সিনেমা দেখা হত। রাতে ডিনারের পরও সারা পৃথিবীর দারুণ দারুণ সব ছবি দেখা হত। একজন মানুষের এত বিষয়ে জানবার ইচ্ছে, শখ— এটা বিশাল ব্যাপার। কে কোথায় ভাল গাইছেন, বাজাচ্ছেন, লিখছেন— খবর রাখতেন। একটা ঘটনা মনে পড়ছে। আমাকে উনি বললেন, ‘‌ থ্রি ইডিয়টস’‌ দেখেছো?‌ আমি বললাম, ‘‌হ্যাঁ।’‌ উনি বললেন, মিউজিক ডিরেক্টর একজন বাঙালি। আমি বললাম, শান্তনু মৈত্র। আমিই শান্তনুকে ফোনের লাইনটা ধরিয়ে দিয়েছিলাম পণ্ডিতজির সঙ্গে কথা বলবার জন্য। ফোনে শান্তনুর প্রভূত প্রশংসা করলেন। শান্তনু আমাকে আজও বলে, ‘‌তুমি আমার স্বপ্নপূরণ করেছো।’‌  প্রশংসা করতে দ্বিধা করতেন না। হৈমন্তী শুক্লাকেও ফোন করে একবার গানের প্রশংসা করেছিলেন।  সবরকম গান বাজনা শুনতেন। নিজেকে আপডেটেড রাখতেন। সব সময় একটা কথা বলতেন .‌.‌.‌ ‘‌শো মাস্ট গো অন’‌।
হলিউড বোল লস এঞ্জেলসের রক মিউজিকের বিখ্যাত এরিনা। সেখানে একবার রবিশঙ্করের অর্কেস্ট্রা হবে।  আমায় বললেন, ‘‌কলকাতা থেকে ভাল শিল্পীদের নিয়ে এসো।’‌ আমি গোকুলচন্দ্র দাসকে নিয়ে গিয়েছিলাম ঢাক বাজানোর জন্য। নিয়ে গিয়েছিলাম তেজেন্দ্রনারায়ণ মজুমদারকে। শুভমিতাও গিয়েছিল। চার হাজার শ্রোতা সেই অনুষ্ঠান শুনে উঠে দাঁড়িয়ে সংবর্ধনা দিয়েছিলেন। ওঁর মতো বিনয়ী মানুষ খুব কম দেখেছি। কেউ এক গ্লাস জল দিলেও ধন্যবাদ জানাতেন। এমন মানুষ বহু বহু বছর বাদে পৃথিবীতে আসেন।
মনে প্রাণে ছিলেন পুরোপুরি বাঙালি। শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সবই পড়তেন। রবীন্দ্রনাথের গানের উদ্ধৃতি দিয়ে মাঝে মাঝে বলতেন, ‘‌তবু মনে রেখো‌.‌.‌.‌!’‌‌ আমি বলতাম, আপনাকে সবাই মনে রাখবে। উনি বলতেন, ‘‌না, পাবলিক মেমরি খুব শর্ট।’‌
 কেউ ওঁকে ভোলেনি বলেই আজ শতবর্ষের সকালে রবিশঙ্করকে নিয়ে এই কথাগুলো বলছি। ওঁর শতবর্ষ যেন ওঁকে মনে রেখে পার হয়ে যায় নতুন নতুন প্রজন্ম। ‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top