সঙ্কর্ষণ বন্দ্যোপাধ্যায়: আশ্বিনের শারদ প্রাতে আজও পুজোর গান না শুনলে মন  ব্যাকুল হয়ে ওঠে। পুজোর গানের ইতিহাস শতবর্ষ পেরিয়ে গেছে। শারদীয়া দুর্গা উৎসব উপলক্ষে প্রথম পুজোর গান প্রকাশিত হয় ১৯১৪ সালে, গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে। প্রথম বছর প্রকাশিত হয়েছিল ১৭টি রেকর্ড। শিল্পী তালিকায় ছিলেন মানদাসুন্দরী, কৃষ্ণভামিনী, কে মল্লিক, অমলা দাসের মতো সেই সময়ের ডাকসাইটে শিল্পীরা। গ্রামোফোন কোম্পানি তখন বিদেশি কোম্পানী। প্রথম স্বদেশী মিউজিক কোম্পানি হিসেবে হিন্দুস্থান রেকর্ডস আত্মপ্রকাশ করল ১৯৩২-‌এ। কোম্পানির প্রথম পুজোর গানের রেকর্ডে শিল্পী তালিকায় ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। আরও ছিলেন অতুল প্রসাদ সেন, রেনুকা দাশগুপ্ত, অনুপম ঘটকের মতো শিল্পীরা। 
পুজোর নতুন রেকর্ড তো সেই কবেই বিদায় নিয়েছে। একে একে এসেছে ক্যাসেট, সিডি। ক্যাসেট যুগ চলে গেলেও, পুজোর নতুন গানের সিডি এখনও প্রকাশিত হয়। তবে তা সংখ্যায় অনেক কম। কয়েক বছর ধরেই চলছে হা-হুতাশ। হাতে-গরম সিডি এখন হাতে-গোনা। তবু এবার পুজোয় কেউ স্রোতের বিপরীতে গিয়ে প্রকাশ করছেন অডিয়ো সিডি, কেউ প্রথমে অনলাইনে গান প্রকাশ করে ভাবছেন কয়েকটি গান মিলে একটা সংকলন হোক। কারও ভরসা নবীন শিল্পীরা, কারও আগ্রহ মহাফেজখানার হিরে-মানিক খুঁজে আনায়। আবার অনেক বিশিষ্ট শিল্পী খুলেছেন নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল। আর সেখানেই শোনা যাচ্ছে তাদের নতুন পুজোর গান।
শুরু করা যাক মহাফেজ খানার হীরে মানিক দিয়েই। সেই সময় পুজোর আধুনিক বাংলা গানের পরিবেশনার ক্ষেত্রে গ্রামোফোন কোম্পানির ভূমিকা মূখ্য হলেও এর পাশাপাশি হিন্দুস্থান রেকর্ড, মেগাফোন কোম্পানি, সেনোলা, ভারত ও পাইওনিয়ারের মত স্বদেশী রেকর্ড কোম্পানীর ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দুস্থান রেকর্ড এবার নিয়ে এল ১০৪ জন কিংবদন্তী শিল্পীর ১৯৩২ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত পুজোয় গাওয়া ১০৫ টি গানের পাঁচটি সিডির আ্যলবাম ‘‌অমর শিল্পী সোনার গান’‌। শিল্পী তালিকায় নেই কেবল মান্না দে, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, ভূপেন হাজারিকা, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়। এই শিল্পীদের হিন্দুস্থান রেকর্ড-‌য়ে কোনও আধুনিক গান নেই। একটা সময় গ্রামোফোন রেকর্ডের অসংখ্য পুরনো দিনের গানের সঙ্কলনে ক্যাসেট, সিডি উপহার দিয়েছিলেন অমল বন্দোপাধ্যায়। তিনিই এখন হিন্দুস্থান রেকর্ড-‌এর পুরনো দিনের গানের সংকলনের দায়িত্বে। অমল বাবু জানালেন, ‘‌গ্রামোফোনের পর সত্যিই হিন্দুস্থান রেকর্ড পুরনো দিনের গানের মহাফেজ খানা। পাঁচটি অনন্য আ্যলবাম ছাড়াও থাকছে রেনুকা দাশগুপ্ত, সুধীরলাল চক্রবর্তী, অনুপম ঘটকের গাওয়া গানের আ্যলবাম ‘‌পাগলা মনটারে তুই বাঁধ’‌, ‘‌শুকনো পাতা ঝরে যায়’‌, ‘‌মাধবী উতলা বায়’‌। আছে রামপ্রসাদী শ্যামা সঙ্গীতের আ্যলবাম ‘‌ইচ্ছাময়ী তারা তুমি’‌। গানে ভবানী দাস, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, পান্নালাল ভট্টাচার্য, অঞ্জলি মুখোপাধ্যায় ও হীরালাল সরখেল। 
রাগা মিউজিকের প্রেমকুমার গুপ্তা আর পেরিনিয়াল রেকর্ডসের প্রদীপ্ত রায়ও ডুব দিয়েছেন অতীতেই। তিন দশক আগে একটি অন্য সংস্থার লেবেলে বেরিয়েছিল আরতি মুখোপাধ্যায়ের রবীন্দ্রসঙ্গীতের অ্যালবাম। সেই ‘‌প্রাণ চায় চক্ষু না চায়’‌ আবার আত্মপ্রকাশ করল ২০১৯-এ।
পেরিনিয়াল রেকর্ডসের প্রদীপ্ত রায় পুজোয়  প্রকাশ করেছেন মোট ১৯টি অ্যালবাম। তাঁর আশা, ‘‌শতবর্ষে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়’‌, ‘‌শতবর্ষে মান্না দে’‌, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ‘‌ওগো মোর গীতিময়’‌ এবং শ্যামল মিত্রের ‘‌ফাগুনের মাধুরী’‌ শ্রোতাদের আনুকুল্য পাবেই। এ ছাড়া সূত্রধর নামে এক সংস্থার সহায়তায় তিনি পুনঃপ্রকাশ করেছেন বেশ কিছু কালজয়ী নাটক। এর মধ্যে রয়েছে শম্ভু মিত্র ও তৃপ্তি মিত্র অভিনীত ‘‌প্রফুল্ল’‌ ও ‘‌বিরাজ বউ’‌, প্রমথেশ বড়ুয়া ও যমুনা বড়ুয়া অভিনীত ‘‌দেবদাস’‌ এবং অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনীত ‘‌দারোগা চরিতকথা’‌।
এবার আসা যাক আশা অডিয়োর কথায়। আশা অডিয়োর মহুয়া লাহিড়ী বললেন, ‘‌এই জগৎটা এত দ্রুত পাল্টে যাাচ্ছে যে আমরা একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছি। তাই বেশির ভাগ পুজোর গান প্রথমে ডিজিট্যাল প্ল্যাটফর্মে রিলিজ করেছি। তবে স্ট্রিমিংয়ের ক্ষেত্রে যে রাজস্ব আসে, তা সিডি বিক্রির থেকে অনেকটাই কম। তাই কয়েকটি সিঙ্গলস নিয়ে অডিয়ো অ্যালবাম করার ভাবনা আছে।’‌
সাবেকি ধাঁচে কুমার শানু ও সহশিল্পী মৌসুমির ‘‌খেয়ালি দিন’‌ সিডি ছাড়াও জয়তী চক্রবর্তীর লোকগানের আ্যলবাম ‘‌বনমালী’‌, দোহারের ‘‌হাসানরাজার গান’‌, রূপঙ্করের ‘‌তোমার জন্য’‌ বা উদীয়মান শিল্পীদের ‘‌জয় দুগ্‌গা বল’-‌‌এর অনলাইন হিটের উপরেই ভরসা রাখছেন মহুয়া। 
ইউ ডি সিরিজের রাজকল্যান রায় জানালেন ‘‌এবার বেশির ভাগ নতুন গান সিঙ্গেল হিসেবে নিজস্ব ডিজিট্যাল প্ল্যাটফর্মে রিলিজ করছি। অল্প কিছু আ্যলবাম সিডি আকারে আসছে। ভাস্বতী দত্তর ‘‌আমার রাধা’‌, তিতাস ব্যান্ডের ‘‌ফোক হোক’‌, নবারুন ঘো‌ষের ‘‌বিচিত্র বাংলা’‌, সহেলির ‘‌কবিতার রামধনু’‌। গোল্ডেন ভয়েজ থেকে প্রকাশিত হয়েছে তিনটি আ্যলবাম, দুটি আনকোরা আধুনিক গানের একটি লোকসংগীতের। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী অগ্নিভ বন্দোপাধ্যায় ‘‌কেউবা কাহিনী হয়ে যায়’‌ আ্যলবামে নিজের সুরে ছটি গান গেয়েছেন। তিনটি নিজের কথায় এবং তিনটি গানের কথা তরুন সিংহের। সুচরিতার সাতটি আধুনিক গানের আ্যলবাম ‘‌জংলা নদীর ধারে’‌র সুর করেছেন রাঘব চট্টোপাধ্যায়, বানীকন্ঠ, গৌতম ঘোষ প্রমুখ। লোক গানের আ্যলবাম ‘‌গঙ্গা বরাক সুরমা’‌ তে গান গেয়েছেন পূর্ণদাস বাউল, সর্বানী এবং গৌতম। শ্রীনিবাস মিউজিকের পূজো আ্যলবামের তালিকায় রাজ্যের প্রাক্তন রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠির পাঠ, সঙ্গে জয়ন্তী বসুর রবীন্দ্রসঙ্গীতের আ্যলবাম ‘‌আমার প্রিয় গান’‌, লোক গানের আ্যলবাম ‘‌রংমহল- ধামসামাদল’‌, ‘‌হাওয়া গাড়ি’‌, পাশাপাশি থাকছে বেশ কিছু রবীন্দ্রসঙ্গীতের আ্যলবাম। বেশ কিছু সিঙ্গেল ও রিলিজ করছে। দেবাদৃত চট্টোপাধ্যায়ের ‘‌ঝিলসায়রের গান’‌, অনিন্দ্য শেলীর ‘‌মন বে‌‌‌দূইন’‌, শমীক পালের ‘‌শহর জুড়ে শ্রাব‌ন’‌,মহুয়া ব্যানার্জির ‘‌ও দয়াল’‌। 
ডিজিট্যাল এবং অডিয়ো সিডির মাঝামাঝি একটা ভারসাম্য রাখায় বিশ্বাসী কৃষ্টি ক্রিয়েশনের শ্বেতা গুপ্তা। সিডি এবং ডিজিট্যাল ফর্ম্যাটে তিনি প্রকাশ করেছেন ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘‌উমা’‌, সিঙ্গলস ভিডিয়ো ফর্ম্যাটে রাজকুমারের ‘‌ঢাক বাজে রে’‌ আর সাবেকি সিডিতে রামানুজ দাশগুপ্তের ‘‌শিব শক্তি’‌।
কসমিক হারমনির সুমন চট্টোপাধ্যায় জানালেন ‘‌এই মন্দার বাজারে নবীন শিল্পীরা উৎসাহ নিয়ে কাজ করছে এটাই আমার কাছে আশার আলো। এবার সিডির সাথে বেশ কিছু সিঙ্গেলও রিলিজ হচ্ছে। ক্যাকটাস এর সিধু এবার গেয়েছেন অয়ন কুমার নাথ এর সুরে অ্যালবাম ‘‌আবছা মন’-‌এ‌। সায়কের লোকগান অ্যালবাম ‘‌মায়া’‌। শাশ্বতীর রবীন্দ্র সংগীত অ্যালবাম ‘‌একলা পথে’‌। প্রতুলের আধুনিক গানের আ্যলবাম ‘‌মন বানজারা’‌ সন্দীপন এর সুরে অদিতির কথায়। কাকলি গেয়েছেন নজরুল গীতি। অ্যালবাম এর নাম ‘‌গানের মালা’‌। এছাড়া প্রায় ১৪ টি সিঙ্গেল রিলিজ হয়েছে। 
ভাবনা রেকর্ডস এর কর্নধার বিশ্ব রায় জানালেন এ বার পুজোয় ভাবনার উল্লেখযোগ্য রিলিজ জয়তী চক্রবর্তীর ‘‌আকুল কবরী’‌ এবং চন্দ্রাবলী রুদ্র দত্তের ‘‌লক্ষ্মীর পাঁচালী’‌। শীঘ্রই তিন খণ্ডে প্রকাশিত হবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘‌গীতাঞ্জলি’‌র ১৫৭টি কবিতা পাঠের সিডি। আজকাল শিল্পীরা নিজস্ব ডিজিট্যাল প্ল্যাটফর্মে থেকেও নিজেদের নতুন পুজোর গান আনছেন। এই তালিকায় নতুন সংযোজন শুভমিতা এবং রাঘব চট্টোপাধ্যায়। প্রতি বছরই নতুন নতুন পুজোর গান তৈরী হয় ঠিকই কিন্তু এমন কিছু গান আছে যা প্রতি বছরই ফিরে ফিরে আসে কালজয়ী গান হয়ে। ‌

জনপ্রিয়

Back To Top