অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: • বাংলা মঞ্চে এখন আপনি ‘‌মেঘে ঢাকা তারা’‌র নীতা থেকে ‘‌মীরজাফর’‌-‌এর লুৎফুন্নেসা। অভিনয় করার ইচ্ছে কি আগে থেকেই ছিল, না কি, বিয়ের পর ব্রাত্য বসুর সঙ্গ-‌গুণে সেই ইচ্ছে তৈরি হল?‌
•• সত্যি কথা বলতে কি, অভিনয় করব, কখনও ভাবিনি। আমি বরাবরই একটু লাজুক প্রকৃতির। ফলে, মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিনয় করতে পারব না, এটাই ভেবেছি। তবে, অভিনয় না করলেও, আমি কোনও একটা আর্টের সঙ্গে যুক্ত থাকব, এটা ভাবতাম। আঁকতে ভালবাসতাম। সেগুলো নিয়েই থাকব ভেবেছি। (‌হাসতে হাসতে)‌ কিন্তু, ওই যে বললেন, ব্রাত্যর সঙ্গ-‌গুণ, আমার অভিনয়ে আসার সেটাই প্রধানতম কারণ।
• ব্রাত্যই কি মঞ্চে অভিনয় করার ভয়টা কাটিয়ে দিলেন?‌
•• আসলে, যখন ব্রাত্যর সঙ্গে আমার বিয়ে হল, তখনও ব্রাত্য থিয়েটার নিয়ে ব্যস্ত, সিনেমাও তৈরি করছে। সেটা ২০০১ সাল। ব্রাত্য এত ব্যস্ত তখন যে আমার সঙ্গে সময় কাটানোর মতো সময়ও ওর নেই। তখন আমি থিয়েটার গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হলাম নেপথ্য-‌কর্মী হিসেবে। প্রতিটা শো-‌এ ব্রাত্যর সঙ্গে থাকতাম। কিছুটা সময় তো ব্রাত্যর সঙ্গে থাকা যাবে। (‌হাসতে হাসতে)‌ এটাই ছিল আমার মূল উদ্দেশ্য। তারপর আস্তে আস্তে থিয়েটারের মেকিংটা ভাল লাগতে শুরু করল। একটা নাটকের তৈরি হয়ে ওঠার প্রসেসটা দেখতে ভাল লাগত। আমি হয়ত কোনও অভিনেত্রীকে শাড়ি পরতে সাহায্য করছি, ব্যাক স্টেজের অন্য কাজও করছি। কোনও কাজ না থাকলে চুপচাপ বসে রিহার্সাল দেখছি, কিংবা শো দেখছি। ততদিনে থিয়েটারের সঙ্গে একটা একাত্মতা তৈরি হয়ে গেছে।
• তখন কি ব্রাত্য নিজেই অভিনয় করার প্রস্তাব দিলেন?‌
•• প্রথম ফাল্গুনীদা (‌ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায়)‌ ব্রাত্যকে বলেন, পৌলোমীকে ট্রাই করো। তারপর, ব্রাত্য চেষ্টা শুরু করল। আমাকে বলল, একটা চরিত্রে অভিনয় করতে হবে। কিন্তু আমি বলেছিলাম আমি ব্যাক-‌স্টেজের কাজই করব। অভিনয় আমি করব না। ব্রাত্য জোরাজুরি করলে ঝগড়াঝাঁটি হল, কথা বন্ধ হয়ে গেল দিনের পর দিন। এখন ভাবলে খুব অবাক লাগে। এখন অভিনয় ছাড়া আমি নিজেকে ভাবতে পারি না। এক অর্থে, অভিনয়ই এখন আমার জীবন।
• ব্রাত্যর সঙ্গে কোন নাটকে অভিনয় শুরু?‌
•• ব্রাত্যর সঙ্গে নয়। আমি প্রথম অভিনয় করি ফাল্গুনীদার নাটকে। ২০০৭ সাল নাগাদ।
• কী নাটক?‌
•• ‘‌ইহাই সত্য’‌। সারা নাটকে আমার হয়ত দেড় মিনিটের পার্ট। কিন্তু আমি বেশ উৎসাহ নিয়ে নানান কল-‌শো করতে লাগলাম। কিন্তু ফাল্গুনীদাকে একটাই শর্ত দিলাম, আকাদেমিতে আমি শো করব না।
• সে কী?‌ কেন?‌
•• ভয় এবং সঙ্কোচ। আমি কলকাতায় আকাদেমিতে সবার সামনে পার্ট করতে পারব না। ফাল্গুনীদা মেনেও নিয়েছিলেন। কিন্তু একটা বিপদ ঘটল। ফাল্গুনীদা দমদমে একটা শো নিলেন। মঞ্চে পার্ট করার সময় দেখি, সামনের সারিতে ব্রাত্য বসে। (‌হাসতে হাসতে)‌ সত্যি বলছি, আমি পার্ট ভুলে গিয়েছিলাম।
• ব্রাত্যর নির্দেশনায় প্রথম অভিনয় কি কালিন্দি ব্রাত্যজনের প্রথম প্রযোজনা ‘‌রুদ্ধসঙ্গীত’‌-‌এ?‌
•• তার আগে ‘‌বাবলি’‌তে আমি আর ব্রাত্য অভিনয় করেছি। সেটা বিদেশে। পরপর কয়েকটা শো হয়েছিল। কিন্তু কলকাতায় ব্রাত্যর ডিরেকশনে প্রথম কাজ ‘‌রুদ্ধসঙ্গীত’‌। শীলা করেছিলাম। তবে, তখন আর ভয় ছিল না। কারণ, আমি তখন থিয়েটারের একজন হয়ে গিয়েছিলাম। আর, ব্রাত্য ‘‌রুদ্ধসঙ্গীত’‌-‌এর ৮০টা রিহার্সাল করিয়েছিল। ভয়-‌টয় পাওয়ার চান্স ছিল না।
• সেই আকাদেমিতেই অভিনয় করতে হল?‌
•• (‌হাসতে হাসতে)‌ হ্যাঁ, আকাদেমিতে ব্রাত্যই নিয়ে এল।
• ব্রাত্য তো খুব কড়া ডিরেক্টর। বকুনি দেয়?‌
•• আসলে, সিরিয়াসনেসের অভাব থাকলে ব্রাত্য সবাইকেই বকে। আমি সেভাবে বকুনি খাইনি। একবার ‘‌বোমা’‌-‌এর একটা শো-‌এর পর এমন জোরে বকেছিল যে আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। কারণটা আজ আর মনে নেই।
• ব্রাত্য ছাড়া আর কার কার পরিচালনায় অভিনয় করেছেন?‌
•• দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ‘‌চিরকুমার সভা’‌, অর্পিতা ঘোষের পরিচালনায় ‘‌দুটো দিন’‌, বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় ‘‌অশালীন’‌, দেবাশিস রায়ের সঙ্গে ‘‌চার অধ্যায়’‌।
• এ পর্যন্ত অভিনীত কোন চরিত্রটা সবচেয়ে কঠিন মনে হয়েছে?‌
•• আসলে, সেভাবে ভাবিনি কখনও। যে চরিত্রটার সঙ্গে থাকি, সেটার সঙ্গে একটা ভালবাসা তৈরি হয়ে যায়। তখন আর কঠিন বলে মনে হয় না কোনও চরিত্রকে।
• ব্রাত্যজনে প্রধান চরিত্র পেতে তো অনেকদিন অপেক্ষা করতে হল?‌ ‘‌মীরজাফর’‌-‌এর লুৎফুন্নেসাই বোধহয় প্রথম প্রধান চরিত্র ব্রাত্য বসুর দলে?‌
•• হ্যঁা, সেটা ঠিকই। দশ বছর লাগল। আসলে, আমি নিজেকে একটা প্রক্রিয়ার অংশ বলে মনে করি। থিয়েটার তো একটা সামগ্রিক ব্যাপার। সেখানে আমি নিজে একটা বিরাট চরিত্র পাব, সেটা নিয়ে আমি ভাবি না। তবে, ‘‌নৈহাটি‌‌ ব্রাত্যজন’‌ আমাকে প্রথম মেইন ক্যারেক্টার করার সুযোগ দিয়েছে— ‘‌মেঘে ঢাকা তারা’‌র নীতা। তারপর এই লুৎফুন্নেসা।
• এই দুটো চরিত্রই তো খুব প্রশংসা পেয়েছে। তাতে কি আত্মবিশ্বাস বেড়েছে?‌
•• নিয়মিত থিয়েটারে যুক্ত থাকলে, আত্মবিশ্বাস তো বাড়েই। তবে হ্যাঁ, এই দুটো চরিত্র আমাকে আরও সাহস জুগিয়েছে। আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছে।
• থিয়েটারের পাশাপাশি দু’‌একটা মাত্র ধারাবাহিক, মাত্র কয়েকটা সিনেমায় অভিনয় করেছেন। এটা কি অনিচ্ছার জন্যে?‌
•• শেষ ধারাবাহিক করেছি ‘‌তারানাথ তান্ত্রিক’‌। সম্প্রতি ‘‌টুসকি’‌, ‘‌কল্কিযুগ’‌, ‘‌যদি বলো হ্যাঁ’‌ সিনেমায় কাজ করেছি। অনিচ্ছা বলব না, আসলে, যখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবার সময়, তখন আমি থিয়েটারে যুক্ত হয়েছি। ফলে, থিয়েটারের সঙ্গে যে বন্ডিংটা তৈরি হয়ে গেছে, সেটাই আমার বেঁচে থাকার রসদ।
• আপনার নাম কি পৌলোমী?‌ পৌলমী চট্টোপাধ্যায়ের নামে কিন্তু ‘‌ল’‌-‌এ ও-‌কার নেই।
•• আমার নামেও ও-‌কার ছিল না। (‌হাসতে হাসতে)‌ ওটা ব্রাত্য করে দিয়েছে। ব্রাত্যর বক্তব্য, পুলোমা ঋষির মেয়ে পৌলোমী, তাই ‘‌ও-‌কার’‌ থাকবে। আমি বলেছিলাম, ইন্দ্রের স্ত্রী যখন, তখন তো ও-‌কার নেই। ব্রাত্য মানেনি। ব্যস, পৌলোমী হয়ে গেছি।
• পৌলোমী চট্টোপাধ্যায়ের নাটক দেখেছেন?‌
•• পৌলমীদি খুব ভাল অভিনেত্রী। থিয়েটারে বেশ কিছু ভাল কাজ করেছেন। তবে, সেই যে টেলিফিল্ম ‘‌মহাসিন্ধুর ওপার থেকে’‌ দেখেছিলাম, সেখানে পৌলমীদির অভিনয় আর নাচ আমার দারুন লেগেছিল।
• ব্রাত্য বসু শুধু একজন অসাধারণ নাটককার বা পরিচালকই নয়, তুখোড় একজন অভিনেতা। মঞ্চে ব্রাত্যর সঙ্গে অভিনয় করার সময় নার্ভাস লাগে?‌
•• না, তা লাগে না। তবে, (‌হাসতে হাসতে)‌ চোখে চোখ রেখে কথা বলার সময়, আমি একটু চোখ সরিয়ে নিয়ে অভিনয় করি। ব্রাত্যর সঙ্গে অনেক ইন্টার অ্যাকশন আছে, এমন চরিত্র আমি এখনও করিনি। একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
• কী নাটক?‌
•• ব্রাত্য একটা নতুন নাটক লিখেছে। ‘‌অন্তিম রাত’‌। সেখানে আমার জন্যে যে চরিত্রটা ভাবা হয়েছে, মঞ্চে তার সঙ্গে ব্রাত্যর একাধিক ইন্টার অ্যাকশনের দৃশ্য থাকবে। আমি এখনও নাটকটা পড়িনি।
• এবার তাহলে পরিচালক, অভিনেতার সঙ্গে সম্মুখ সমর?‌ রিহার্সাল শুরু কবে?‌
•• পুজোর পরে। সামনের বছর মঞ্চে আসবে।
• এই মূহূর্তে অভিনেত্রী পৌলোমীর স্বপ্ন কী?‌
•• এমন চরিত্র করতে চাই, যেটা মানুষের মনে থেকে যাবে। যে চরিত্রের কথা পরবর্তী প্রজন্মকে কেউ বলবে। সেই অ-‌মূল্য চরিত্রের স্বপ্ন দেখি আমি এবং অপেক্ষা করি।
পৌলোমীর স্বপ্ন এবং অপেক্ষা পূর্ণ হোক। আমাদের শুভেচ্ছা।‌

জনপ্রিয়

Back To Top