শুরু বাংলা ব্যান্ডে। উত্থানও সেখানেই। তারপর কিছু মান–অভিমান। কিছু মন কষাকষি। অতঃপর একলা চলা। খামখেয়ালিকে ধরে ফেললেন উদ্দালক ভট্টাচার্য

 পটা, যাঁর ভাল নামটা মনে নেই, এখন কী নিয়ে ব্যস্ত?‌ 
পটা:‌ আমাদের ব্যান্ডের নতুন লাইন আপের ‌ছ’‌জনকে নিয়ে আপাতত জোরদার কাজকর্ম চলছে। নতুন গান তৈরি করছি। রেকর্ডিংয়ের কাজ চলছে, মিক্সিংয়ের কাজ চলছে। একটা সিঙ্গলস রিলিজ করার ইচ্ছা আছে। আগামী ছ’মাসের মধ্যে আশা করি আমাদের নতুন কাজ পৌঁছে যাবে শ্রোতাদের কাছে। 
 কিন্তু ব্যান্ড কই? লোকে তো পটাকেই চেনে শুধু?‌
পটা:‌ না–না, তা কেন হবে। আর আমি নিজে দলগতভাবে কাজ করতেই বেশি পছন্দ করি। মানে, বেশ সবাই মিলে একসঙ্গে বাজিয়ে একটা প্রোডাকশন তৈরি করব। চাইলে একা একা তো কাজ করাই যায়। আমি সেই পথে বিশ্বাস করি না। ফলে দলই আমার সব। কারণ, সবাই মিলে কাজ করলে যে মজা পাওয়া যায়, একা একা কাজ করলে তা পাওয়া যায় না। তাই আমি একা নই। আমার ব্যান্ডই আগে। সবাই মিলেই একসঙ্গে আমাদের পরিচয়। তবে আমাকে যাঁরা একা কাজ করতে ডাকেন, করি তাঁদের সঙ্গে কাজ। কিন্তু পাঁচজন মিলে মিউজিক করাটাই বড় কথা। 
 পটা এবং ক্যাকটাস এখনও প্রায় সমার্থক। সেই ছত্রছায়া ছেড়ে কি আপনি বেরোতে পেরেছেন?‌
পটা:‌ দেখুন, আমি শুরু করেছিলাম কলকাতা বলে একটা ব্যান্ডে। সেটা আমাদের নিজেদের তৈরি করা ব্যান্ড ছিল। ক্যাকটাস থেকে রাজেশ’দা চলে যাওয়ার পর আমাকে আর বাংলাদেশের সৌমিত্র বলে একটা ছেলেকে ওরা ডাকে। আমি জয়েন করি ক্যাকটাস। তখন কলকাতাও ছিল। ক্যাকটাসও। তারপর আস্তে আস্তে সিধুদার সঙ্গে কাজ করতে থাকি। ঠিক হয় আমি আর সিধুদা গান গাইব। একটা সময়ের পর বেরিয়ে আসি। তারপর আবারও জয়েন করি। আবারও বেরিয়ে আসি। সেসব কেন হয়েছিল সবাই জানে। কিন্তু আমাদের মধ্যে তো কোনও তিক্ততা ছিল না, যে ক্যাকটাসের নামের সঙ্গে আমার নাম জড়ালেই আমি রেগে যাব। এখন তো ওসব নিয়ে ভাবিও না। যা হচ্ছে হোক। লোকে যা বলছে বলুক।
 ক্যাকটাস বা সিধুর সঙ্গে এখন আপনার সম্পর্ক কেমন?‌
পটা:‌ ভাল। খারাপ কেন হতে যাবে?‌ সিধুদার সঙ্গে আমার সুন্দর সম্পর্ক আছে। দুজনে আলাদা কাজ করছি ঠিক আছে। কিন্তু সেই বাংলা গানের কাজই তো করতে হচ্ছে। সেখানে তো আমাদের ক্ষেত্রটা এক। আসলে আমাদের লড়াইটার ক্ষেত্রটা বুঝতে হবে। বাংলা গানকে এখন কোণঠাসা করে দেওয়া হয়েছে। দিনের পর দিন রেডিওতে বাংলা গান বাজানো হয় না। বছরে একবার ডেকে অ্যাওয়ার্ড দিলেই তো বাংলা গানের সোনার সময় ফিরে আসবে না। আমাদের মাতৃভাষার গানকে কোণঠাসা করে দেওয়া হয়েছে। আর এই মুহূর্তে আমি, সিধুদা বা অন্য সমস্ত শিল্পীদের একসঙ্গে লড়তে হবে তো। নিজেদের মধ্যে কোনও ঝামেলা রাখলে তাতে আখেরে ক্ষতি হবে বাংলা গানের। এখানে কোনও ইগোর ব্যপার নেই। ওরা ওদের ব্যান্ড নিয়ে আসুক। আমিও আমাদের ব্যান্ড নিয়ে যাব। একসঙ্গে পারফর্ম করব। ওরা আগে পারফর্ম করুক। আমরা পরে করব। অথবা উল্টোটাও হতে পারে। দুই ব্যান্ডের একটা দেওয়ানেওয়া হোক না। কোনও চাপ নেই। 
 লোকে বলে আপনি নাকি খুব নেশা করেন?‌ সেজন্য আপনার সঙ্গে কাজ করাই নাকি মুশকিল। 
পটা: এসব কথা আমি হেসে উড়িয়ে দিই। এখনও পর্যন্ত কেউ বলতে পারবে না যে, রেকর্ডিং বা মিটিংয়ে আমি ৫ মিনিটও দেরি করে পৌঁছেছি। তাই আমার নামে এসব বলে তো লাভ নেই। কিছু লোক আছে। তারা কাছের লোকও হতে পারে। আমার নামে এরকম নানা কুকথা ছড়িয়ে বেড়ায়। কিন্তু শেষপর্যন্ত তো সুরে গান করাটাই আসল কথা। স্টেজে দাঁড়িয়ে আমি কী করছি, সেটা দেখলেই প্রমাণ হয়ে যাবে আমি আমার আর্ট নিয়ে সিরিয়াস না ক্যাজুয়াল। ব্যস! তারপর আমার ব্যক্তিগত জীবনে আমি কী করলাম না করলাম, সেটা নিয়ে এত আলোচনায় যাবই না আমি। 
 ১৯৯০ এর শেষ থেকে একেবারে ২০১০ পর্যন্ত স্কুল–কলেজফেরত ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ব্যান্ড করার একটা হিড়িক লেগেছিল। সেটা এখন নেই। কেন বলুন তো?‌
পটা:‌ এখন গানের ধাঁচাটা পাল্টেছে। গান নিয়ে চর্চা করার ধরন পাল্টেছে। এখন কলকাতায় অনেকগুলো ভাল মিউজিক স্কুল হয়েছে। সেখানে গান শেখা যায়। দু’দিন গিটার শিখেই যদি পাড়ার জলসায় গান শেখার ট্রেন্ড চালু হয়, তাহলে তো তা বেশিদিন টিকবে না। আমরা যখন ব্যান্ড তৈরি করেছিলাম, তখন সপ্তাহে প্রতিদিন, সারাক্ষণ রিহার্সাল করতাম। সেই থেকে একটা মিউজিক্যাল সেন্স তৈরি হয়েছে। তাই এখনও সেটা রয়ে গেছে। এখনও আমরা সপ্তাহে তিনদিন বসার চেষ্টা করি। গান নিয়ে ভাবনাচিন্তা করি। তাই এভাবে ট্রেন্ডের সঙ্গে গা ভাসিয়ে দু’‌দিন গান গাইলে কিছুই টিকবে না। নিয়মিত রিহার্সালে বসতে হবে। গান গাইতে বা বাজাতে ইচ্ছে না করলে গল্প করুক না তারা। কথা বলুক মিউজিক নিয়ে। কিন্তু একটা বন্ডিং তৈরি করা জরুরি। 
 গানের জগৎটা কেমন হলে ভাল হত?‌ এখন যা আছে সেটাই কি আপনার পছন্দ?‌ ‌
পটা:‌ দেখুন, আমি চাইলেই তো আর কাজের পরিবেশটা পাল্টে যাবে না। বরং এর মধ্যে থেকেই কাজটা মন দিয়ে করে যেতে হবে। তবে বাংলা গানের বাজার যদি আরও একটু চাঙ্গা হত, যদি পরিসর আরও বাড়ত, তাহলে বোধহয় ভাল হত। যাকগে, যা আছে, তার মধ্যে থেকেই নতুন কিছু তৈরির কথা আমাদের ভাবতে হবে। আর আমি তো কাউকে শত্রু ভাবি না। আমার সঙ্গে সাঙ্গীতিকভাবে কারও মনোভাব মিললে আমি তার সঙ্গে কাজ করব। আর সবাই মিলে কাজ করলেই একটা আদর্শ পরিবেশ তৈরি হবে বলে আমি মনে করি।

জনপ্রিয়

Back To Top