প্রভাস রায়, শিলিগুড়ি, ৬ সেপ্টেম্বর—একমাত্র সন্তানকে নিয়ে টানাপোড়েনের জেরেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন টলিউড অভিনেত্রী পায়েল চক্রবর্তী।‌ পায়েলের বাবা প্রবীর গুহ–‌‌র দাবি তেমনই। মেয়ের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পরই নৈহাটি থেকে শিলিগুড়িতে এসেছেন প্রবীরবাবু। তিনি বলেন, ‘‌৯ বছরের ছেলে স্পন্দন (‌চিরাগ)‌ পায়েলের স্বামীর কাছে থাকে। তাকে নিয়ে ৩ বছর ধরে আইনি লড়াই চালিয়ে আসছিল পায়েল। এর কারণেই কিছুদিন ধরে মানসিক অবসাদে ভুগছিল। এতেই সে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে।’‌ 
 বুধবার শিলিগুড়ির এয়ারভিউ মোড় সংলগ্ন এক হোটেল থেকে উদ্ধার হয় পায়েল চক্রবর্তীর মৃতদেহ। তিনি যে টলিউডের একজন অভিনেত্রী, এই পরিচয় হোটেল কর্তৃপক্ষের জানা ছিল না। পায়েল নিজেও এই পরিচয় দেননি। তিনি জানিয়েছিলেন, তিনি একাই এসেছেন। বুধবার গ্যাংটক যাবেন। হোটেল কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারেননি পায়েল এমন কাণ্ড করে ফেলতে পারেন। কিন্তু আত্মহত্যা করতে পায়েল শিলিগুড়ির হোটেলকেই কেন বেছে নিলেন?‌ জানা গেছে, ১ আগস্ট নিজের জন্মদিনে পুরীতে গিয়েছিলেন পায়েল। ৩ আগস্ট ছেলের জন্মদিনে সেখানে পুজোও দেন। এমনিতে স্বাভাবিকই ছিলেন তিনি। কেরিয়ারও ভালই চলছিল। এমন অবস্থায় হঠাৎ কেন এত গভীর অবসাদ নেমে এল, সেই প্রশ্নই ভাবাচ্ছে পুলিসকে। জল্পনা আরও গভীর হয়েছে এখনও পায়েলের মোবাইল ফোনটি উদ্ধার না হওয়ায়। 
বুধবার রাতের দিকে জানা যায়, পায়েল একজন অভিনেত্রী। তখন শোরগোল পড়ে যায়। ৪ বছর ধরে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত পায়েল। বেশ কিছু বাংলা সিরিয়াল, টেলিফিল্মের পাশাপাশি সম্প্রতি ৩টি ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। এরমধ্যে সহ–‌অভিনেত্রী হিসেবে কাজ করেছেন দেব অভিনীত ককপিট ছবিতে। জানা গেছে, আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর মুক্তি পাচ্ছে তাঁর আরেক ছবি ‘‌কেলো’‌। এছাড়াও ‘‌চতুর্থ রিপু’‌ নামে আরও একটি ছবি মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। 
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ২০০৬ সালে টালিগঞ্জের বাসিন্দা ব্যাঙ্ককর্মী সুমিত চক্রবর্তীর সঙ্গে বিয়ে হয় পায়েলের। প্রথমদিকে সম্পর্ক স্বাভাবিক থাকলেও, পায়েল অভিনয় জগতে নাম লেখানোর পর থেকেই স্বামী–‌‌স্ত্রী‌র মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। যা ডিভোর্সের পর্যায়ে চলে যায়। ৩ বছর ধরে মামলা চললেও, মূলত ছেলের অধিকারের প্রশ্নে মামলাটির নিষ্পত্তি ঘটেনি। পায়েলের বাবা প্রবীর গুহ বলেন, ‘‌দিনের পর দিন মামলা চলায় এবং ছেলেকে নিজের কাছে রাখতে না পারায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল পায়েল।’‌ জানা গিয়েছে, নৈহাটির ফেরিঘাটে বাবার বাড়ি থাকলেও, নিউ গড়িয়ায় একটি ফ্ল্যাটে একাই থাকতেন এই অভিনেত্রী। ৬ দিনের জন্য রাঁচিতে শুটিংয়ে যেতে হবে বলে সোমবার বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। বিষয়টি জানতেন পায়েলের মা কুন্তলা গুহ। রবিবার বাবার সঙ্গে শেষ কথা হয় পায়েলের। কিন্তু মঙ্গলবার থেকেই তাঁর মোবাইল বন্ধ থাকায় এবং হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠিয়ে কোনও উত্তর না মেলায় নিউ গড়িয়ার ফ্ল্যাটে যান প্রবীরবাবু। মেয়ের ঘরে তালা ঝুলতে দেখে আশপাশের বাড়িতে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন রঁাচিতে শ্যুটিংয়ের কথা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন পায়েল। কিন্তু মেয়ের সঙ্গে তাঁরা আর যোগাযোগ করতে পারেননি। বুধবার রাতে পুলিসের মাধ্যমে পায়েলের মৃত্যুসংবাদ পান। 
শিলিগুড়ি পুলিস সূত্রে জানা গেছে, চার্চ রোডের যে হোটেলটিতে এই অভিনেত্রী মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৭টা নাগাদ উঠেছিলেন, সেখানে তিনি জানিয়েছিলেন বিবাহিত হলেও গ্যাংটকে ঘুরতে যাওয়ার জন্য একাই এসেছেন। তবে তাঁর মৃত্যুর পর প্যান কার্ড, আধার কার্ড, ভোটার কার্ড–‌সহ যাবতীয় নথি পুলিস উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও মোবাইল ফোনটি পাওয়া যায়নি। পুলিস কর্তাদের কথায়, মোবাইলটি পাওয়া গেলে তিনি শেষ কার সঙ্গে কথা বলেছেন তা যেমন জানা যাবে, তেমনই অস্বাভাবিক এই মৃত্যুর কারণও অনেকটা স্পষ্ট হবে। এদিন উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে ময়নাতদন্তের পর তাঁর মৃতদেহ নিয়ে কলকাতার উদ্দেশে রওনা দেন পায়েলের পরিবারের লোকেরা। পরিবারের তরফে পুলিসে কোনও অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। 

জনপ্রিয়

Back To Top