দ্বৈপায়ন দেব: রহস্য–‌থ্রিলার। পরিচালক মৈনাক ভৌমিকের নতুন ভূমি। খুব যে একটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সে ভূমি খুঁজেছেন মৈনাক, এমনটা নয়। তবে ভাঙচুরের একটা চেষ্টা আছে।
সে ভাঙচুর তার এত দিনের চেনা পথে ফর্মের ভাঙচুর নয়। বরং গল্পের কিছু বাঁক। রহস্য–‌গল্প বলার জন্য যে বাঁকগুলো বা চমকগুলো জরুরি। তবে এ চিত্রনাট্যের শুরুতে বা শেষে চমকের পরিমাণ, সত্যি কথা বলতে, একটু কম। ‘‌ক্লাইম্যাক্স’‌–‌এ যখন নায়ক ও প্রতি–‌নায়ক মুখোমুখি, তখন সংলাপ সাজানোর সময় মৈনাকের আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। কারণ দু–‌একটি সংলাপ যেন উন্মোচিত করে দিচ্ছে, শেষে কী হতে যাচ্ছে। এগুলো হয়তো এ ছবির বাণিজ্যের পক্ষে প্রতিকূল হবে।
এছবিতে এসেছে ‘‌পঞ্চভূত’‌-‌এর প্রাচীন ব্যাখা। সেই ‘‌ক্ষিতি–‌অপ‌–‌তেজ–‌মরূৎ–‌ব্যোম’‌ অর্থাৎ মাটি–‌জল–‌অগ্নি–‌বায়ু–‌আকাশ, প্রকৃতির এই পঞ্চ যাত্রা। না, এরা কোনও মন্ত্র–‌সূত্রে আসেনি, চিত্রনাট্যে এসেছে ক্রাইম–‌এর ‘‌ভূমি’‌ হিসেবে। একজন ‘‌সিরিয়াল কিলার’‌ একের পর এক খুন করছে, আর তার সেই খুন কখনও ঘটছে জলে ডুবিয়ে, কখনও আগুনে পুড়িয়ে, কখনও মাটিতে পুঁতে দিয়ে ইত্যাদি পথে। এই ‘‌পঞ্চভূত’‌–‌এর ‘‌মোটিফ’‌কে ডিকোড করাটাই এ ছবির রহস্য উন্মোচনের কেন্দ্রবিন্দু।
এ ছবি ‘‌হু ডান ইট’‌ নয়। ফলে ছবির শুরুতেই আমরা দেখে ফেলি এক সুদর্শন যুবককে (‌আবির চট্টোপাধ্যায়)‌, যে খুনগুলো করছে। তার মেঘের আড়াল থেকে তীর ছোঁড়াটা দর্শক দেখতে পায় ঠিকই, প্রকৃত ও সম্পূর্ণ পরিচয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয় দ্বিতীয়ার্ধ পর্যন্ত। যদিও দ্বিতীয়ার্ধের গোড়াতেই এই উন্মোচন–‌পর্ব ঘটে যাওয়ায়, রহস্যের গতি স্তিমিত হয়ে পড়েছে। এ ছবিতে এই যুবক ভিলেন নয়, বরং ‘‌অ্যান্টি ‌হিরো’‌ বা প্রতিনায়ক। এই তফাতটাকে প্রতিষ্ঠা করতে চিত্রনাট্যে ‘‌ফ্ল্যাশব্যাক’‌–‌এর উপস্থিতি বড্ড জরুরি ছিল। কিন্তু তা না আসায় চরিত্রটি পারিবারিক চালচিত্র পায়নি এবং দর্শকদের সহানুভূতি থেকেও বঞ্চিত থেকেছে। চিত্রনাট্যের এ সব খামতি সত্ত্বেও আবির চট্টোপাধ্যায় তাঁর অভিনয় দিয়ে চরিত্রটাকে তীক্ষ্ণ রাখার চেষ্টা করেছেন। এমন চরিত্রে নিঃসন্দেহে তিনি এই প্রথম।
আবার এ ছবির প্রতি নায়কের সঙ্গে নায়কের তফাত অল্পই। দু’‌জনেই পরিবারের প্রতি ভালবাসায় লড়ছে। দু‌জনেই কমবেশি অসুস্থ। দু‌জনেই ‌দু‌জনকে হারানোর লক্ষ্যে লড়ছে। এরা দু‌জনে যেন একে অপরের ‘‌অল্টার ইগো’‌। আবির ও যিশুর (‌সেনগুপ্ত)‌ শারীরিক সাযুজ্য এ ক্ষেত্রে ‘‌গ্রাফিক্যালি’‌ খুব ভাল কাজে এসেছে। দু‌জনেই অভিনয়ের টক্করে ভালই লড়েছেন। মদ্যপ অবস্থায় গোয়েন্দা অফিসার যিশুর দ্বিধা–‌যন্ত্রণার চিত্রায়ন নাটকীয়। তবে তার দাম্পত্য–‌অশান্তির পর্বটা (‌স্ত্রীর চরিত্রে প্রিয়াঙ্কা সরকার)‌ বড় অতিরিক্ত রকমের ‘‌সেন্টিমেন্টাল’‌ লেগেছে। বরং শাশুড়ির চরিত্রে মিঠু চক্রবর্তী কিছু দৃশ্যে কোমলতা এনেছেন। পুলিশকর্তা হিসেবে সুদীপ মুখোপাধ্যায় যথাযথ। তবে শেষে একটা প্রশ্ন। ছোট্ট জিজ্ঞাসা। এ ছবির নাম ‘‌বর্ণপরিচয়’‌ কেন?‌ ‘‌পঞ্চভূত’‌–‌এর সঙ্গে ‘‌বর্ণপরিচয়’‌–‌এর কী সম্পর্ক?‌ ‘‌ক্ষিতি’‌, ‘‌অপ’‌, ‘‌তেজ’‌ তো শব্দ, বর্ণ নয়।‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top