অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: ‌• ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত তো আপনার বেশ কিছু ছবিতে সঙ্গীতের কাজ করেছেন.‌.‌.‌
•• হ্যাঁ, অনেক ছবিতে।
• সেই ইন্দ্রদীপ যখন প্রথম ছবি পরিচালনা করতে এসে আপনাকে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করতে ডাকলেন, তখন আপনার প্রথম প্রতিক্রিয়া কী ছিল?‌
•• প্রথমেই ভাল লেগেছিল যে ও একটা অন্য কিছু করতে চাইছে। মানুষ যে কোনও একটা প্রফেশনে বসে থাকতে থাকতে ঘেঁতিয়ে যায়। তারপরে তার একটা মনোটনি তৈরি হয়, এক ঘেয়েমি তৈরি হয়, এটা অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই। যে কোনও প্রফেশনেই এটা হয়। তখন তার এদিক ওদিক অন্য কিছু ভাবনা নিয়ে কাজ করা দরকার। সে যদি নিদেনপক্ষে একটা দোকানও করে, তাতেও তার মনটা সে রি-‌লোকেট করতে পারবে। সেটা ইন্দ্রদীপ করছে দেখে আমার খুব ভাল লেগেছিল। কিন্তু অ্যাজ এ ফিল্মমেকার, অনেস্টলি স্পিকিং, আমি ওকে খুব সিরিয়াসলি নিইনি। ক্রাফ্ট না জেনেবুঝে একজন ছবি করতে চলে এল, এটা কীভাবে সিরিয়াসলি নেব?‌ কিন্তু এটাও মাথায় রাখতে হবে, ও তো ছবিরই লোক। দীর্ঘদিন ধরে ছবির আবহ করতে করতে ছবির মেজাজ এবং ছবির সম্পাদনা, কোন জায়গায় ছবির ‘‌কাট’‌ হচ্ছে, কোথা থেকে মিউজিক ঢুকবে, বেরোবে, এগুলোর সঙ্গে থাকতে থাকতে ইন্দ্রদীপ পরোক্ষভাবে একটা টেকনিক্যাল লোক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আমার চিন্তাটা ছিল, টেকনোলজির বাইরেও, ছবির চিত্রকথনটা কীরকম হবে?‌ ও কি দেখতে পায় ছবি?‌ এটা আমি জানি না।
• আস্থাটা কীভাবে এল?‌ কাজ করতে গিয়ে?‌ না, চিত্রনাট্য পড়ে?‌
•• একদমই তাই। যখন দেখলাম, ও এরকম একটা বিষয় বেছে নিয়েছে, তখন আমি বিস্মিতই হলাম।
• বিষয়টা এক কথায় কী, যেটা কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়কে বিস্মিত করল?‌
•• একাকীত্ব। বিষয়টা এক কথায় হল—একাকীত্ব। এইটা বিষয় হিসেবে ধরতে গেলে কিন্তু দম লাগে। A‌-‌এর সঙ্গে B-এর প্রেম হয়েছিল, সেখানে C ঢুকে পড়েছিল, তারপর D ‌এসে তাকে খুন করে, এই গল্প অনেক সহজ (‌হাসতে হাসতে)। কিন্তু শুধু A‌ একা, আর কেউ-‌ই নেই। সারা ছবিতে এ-‌ছাড়া আর কিছুই নেই প্রায়।
• কেদারা তার মানে একাকীত্বেরই প্রতীক?‌
•• সাংঘাতিক। পরে যখন স্ক্রিপ্টটা পড়লাম, তখন বুঝতে পারলাম, এর মধ্যে ইন্দ্রদীপ লুকিয়ে রয়েছে। ও হরবোলা নয়। ও মিউজিকের মধ্যে দিয়ে ওর যাবতীয় চাপা শব্দ প্রকাশ করে। মনের সব না-‌বলা কথা সঙ্গীতের মধ্যে দিয়ে মুক্তি পায় ইন্দ্রদীপের ক্ষেত্রে। কিন্তু ওর একাকীত্ব নির্মম একাকীত্ব। ও আমাদের মুখে বলে ভাল আছি, দিব্যি আছি, আমি সেটা বিশ্বাস করি না। কারণ আমি নিজে একা থাকতে পারি না।
• তাহলে, বন্ধু হিসেবে ইন্দ্রদীপকে এভাবে একাই বা থাকতে দিচ্ছেন কেন?‌ কোনও উদ্যোগ নিয়েছেন?‌ ইন্দ্রদীপ কি বিয়েতেও অনাগ্রহী?‌
•• বিবাহটা আজকের দিনে আবশ্যিক কিছু নয়। বিয়ে না করেও ও কারও সঙ্গে থাকতে পারে। কোনও বন্ধু বা সঙ্গিনী। সেটা আমরা খুব আদরের সঙ্গে গ্রহণ করব। এত ব্যস্ততাও তো ভাল নয় যে তুমি একটা ঘর গোছানোর সময় পাচ্ছো না। আমি ওর নিজের দাদা হলে রোজ এটা নিয়ে ঘ্যান-‌ঘ্যান করতাম। কিন্তু যেহেতু একটা প্রফেশনাল জায়গা রয়েছে, তাই একটা সময়ের পর আর বলি না। আগে তো অনেক বলেছি। আমি চাই, ওর একাকীত্ব কমুক। তবে, আজ যদি স্ত্রীর বদলে ওর জীবনে সিনেমা আসে, আপত্তি নেই।
• কেদারা-‌র শুটিং করতে করতে এবং শেষ হবার পর কী মনে হল?‌
•• অদ্ভুত সুন্দর ভিস্যুয়াল, অদ্ভুত সুন্দর একটা ভাবনা ইন্দ্রদীপের এই ছবি। এটা একটা চিত্রকল্পের ছবি। এটা পারল কি পারল না, সেটা বড় কথা নয়, ও যে ভাবল, এটাই পারা। সেটা শুভঙ্কর ভড়ের ক্যামেরা, আমার, রুদ্রর এবং অন্যান্যদের অভিনয়, সব মিলেমিশে চমৎকার একটা চেহারা নিয়েছে। যখন ছবিটা জাতীয় পুরস্কার পায়, স্পেশাল জুরি মেনশন তো এমনি এমনি দেয় না, তখন মানতেই হবে, কোথাও একটা রেখাপাত করেছে ছবিটা, একটা ভাল সিনেমার দাগ কেটেছে। ও কিন্তু ফিল্মের পথটা বেছে নেয়নি, সিনেমার পথটা বেছে নিয়েছে?‌
• মানে?‌ ফিল্ম আর সিনেমায় তফাৎটা কোথায়?‌
•• আমি এটা আলাদা করে নিলাম। ইন্দ্রদীপ তো বহুরকমের ছবিতে মিউজিকের কাজ করেছে। বিনোদন মূলক ছবি যেটা, যেটা খুব ফিল্মি, সেটা ও বেছে নেয়নি। যেটা সিনেমা, তার একটা আন্তর্জাতিক আবেদন থাকে। এটা নেহাৎ একটা গণ্ডী টানবার জন্যে দুটো শব্দকে আমি আলাদা করলাম। ইন্দ্রদীপের সিনেমা তৈরির ভাবনাটা বোঝানোর জন্যেই বললাম।
• অভিনয় করার সময় কখনও কি নিজের পরিচালক সত্ত্বা কাজ করেছে?‌
•• না, না। যেটুকু একজন অভিনেতা দেয়, সেইটুকুই বলেছি। ওইটুকু তালিম আমার আছে। অভিনেতার যেটুকু দায়িত্ব সেটা আমি পালন করেছি। ও আমাকে অপূর্ব সম্মান ও স্বাধীনতা দিয়েছে। পরিচালক হিসেবে ইন্দ্রদীপ কিন্তু ভীষণ খুঁতখুঁতে।
• ছবিতে আপনি প্রধান চরিত্র। তিনি তো হরবোলা?‌
•• হ্যাঁ, তার প্রফেশনটাই হরবোলা। বেসিক্যালি এটা রূপক বলেই আমার মনে হয়েছে। হারিয়ে গেছে এই প্রফেশনটা। এটা অনেকটা সিনেমাওয়ালা-‌র প্রজেক্টর চলে যাওয়ার মতো। সে একাই আঁকড়ে রয়েছে প্রফেশনটাকে।
• হরবোলার ডাক-‌গুলো কি আপনি নিজে করেছেন?‌
•• হ্যাঁ। সব নিজে করেছি। প্রথমে একজন হরবোলাকে এনে শব্দগুলো করিয়েছিল ইন্দ্রদীপ। কিন্তু আমি বলেছিলাম, আমি অভিনেতা, আমাকে ট্রাই করতে দিতে হবে। শেষপর্যন্ত আমার হরবোলাগিরিই থেকেছে। গরু, ছাগল থেকে ট্রেন—যাবতীয় আওয়াজ আমি নিজে করেছি। শুধু তাই নয়, এই চরিত্রটা একা থাকে তো, সে অন্যান্যদের গলায় কথা বলে। ঠাকুমা, পিসিমা, স্ত্রী—সমস্ত মহিলার গলা আমি করেছি ছবিতে।
• তাহলে, কৌশিকের একই কণ্ঠে বহু স্বর?‌
•• (‌হাসতে হাসতে)‌ কেদারায় অন্তত।
বহুস্বরী অভিনেতা কৌশিককে এবার আবিষ্কার করবেন দর্শক। আমাদের বহু শুভেচ্ছা।‌‌

ছবি:‌ সুপ্রিয় নাগ

জনপ্রিয়

Back To Top