পরিবারে গান বা অভিনয়ের লেশমাত্র ছিল না। তবু এ পথে?‌
খরাজ মুখোপাধ্যায়: বাবা গানবাজনা, নাটক অপছন্দ করতেন। রাশভারি মানুষ ছিলেন। ওকালতি করতেন। বিশ্বাসই করতেন না, এসব করে জীবন চালানো যায়। তবে আমার মামার বাড়ির দিকে এসবের হাওয়া ছিল। মা অসাধারণ গাইতেন। মামাও অভিনয় করতেন। মামার কাছেই রেকর্ডে প্রথম মান্না দে, কিশোরকুমার, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান শোনা। দারুণ লাগত। আমরা প্রতিবছর রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করতাম। গান গাইতাম, নাটক করতাম। ওটা বাবা বারণ করতেন না। বাড়িতে একটা ইলেকট্রিক রেডিও ছিল। বাবা চেম্বারে চলে গেলে সেটা চালিয়ে গান শুনতাম। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়ার সময় ইন্টার কলেজ কম্পিটিশনে গানে অংশ নিই। সেই আমার গান গাওয়ার সূত্রপাত। অভিনয়টা বরাবরই টানত। সেই টান থেকেই রমাপ্রসাদ বণিকের কাছে নাটক শেখা শুরু। ওঁর সঙ্গে আট–দশটা নাটকে অভিনয়। নাটক থেকেই পর্দায়।
 মঞ্চের কাজে তো ভাটা পড়েছিল‌। স্বেচ্ছায় না অভিমানে?‌
খরাজ: একেবারেই অভিমানে। আমি দল থেকে, মানে প্রথমে ‘‌চেনামুখ’‌ যা পরবর্তীকালে ‘‌থিয়েটার প্যাশন’‌ সেখান থেকে একটা বড় আঘাত পেয়েছিলাম। আসলে আমার ওপর লোকের হিংসে এসে গিয়েছিল। ওই আবহে থাকতে চাইছিলাম না। নিজেই সরে এসেছিলাম। তারপর বেশ কিছুদিন নাটক করিনি। ‘‌পাতালঘর’‌ ছবির একটা চরিত্রে রমাদার নাম সাজেস্ট করি। দলের আরও কয়েকজনের নামও ‘‌পাতালঘর’‌–এর প্রযোজক–পরিচালকদের বলেছিলাম। তখনই আবার রমাদার সঙ্গে দেখা। বললেন, থিয়েটারে ফিরে যা। ‘‌ভূশণ্ডীর মাঠে’‌ নাটকটা নতুন করে শুরু কর। রমাদাই ‘‌প্রথম পাঠ’‌ নাটকটা লিখলেন এবং আমাকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করালেন। আশ্চর্যের ব্যাপার, রমাদা মারা যাওয়ার ৪/‌৫ বছর আগে সেই নাটকের অভিনয় শুরু হয়। এখনও চলছে। নাটকটা হচ্ছিল ‘অযান্ত্রিক’–এর ব্যানারে। কিন্তু নতুন কাউকে না নেওয়ায় দলটা ক্রমশ দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল। তখন নিজেই একটা নাটক লিখি। কিন্তু সেই নাটক করার মতো পরিকাঠামো তখন ছিল না। বেশ কিছুদিন পর ‘বেহালা ব্রাত্যজন’ ওই নাটকটা মঞ্চস্থ করে। আমারই নির্দেশনা। নাম ‘‌পড়ে পাওয়া ষোল আনা’‌। 
 আপনার যা প্রতিভা তাতে আপনাকে নিয়েই সিনেমা তৈরি হতে পারে। কিন্তু ছোটখাট বা মাঝারি চরিত্র নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হল। বাংলা ইন্ডাস্ট্রি কি আপনাকে ব্যবহার করতে পারল না?‌
খরাজ: কী বলি!‌ এর বিচার করার ক্ষমতা কি আমার আছে?‌
 আপনাকে তো কমেডিয়ান তকমা লাগিয়ে একপাশে করে দেওয়া হয়েছে মোটামুটি। আফসোস হয় না?
খরাজ: তকমা লাগিয়ে দেওয়ার থেকেও ‌বড় কথা, কমেডিকে ভালভাবে দর্শকের সামনে তুলে ধরার মতো শিল্পীর হয়তো অভাব আছে ইন্ডাস্ট্রিতে। তাই পরিচালক ভাবছেন, একে কমেডি চরিত্রটা দিলে দারুণ করবেন। সাধারণ চরিত্র দিয়ে লাভ নেই। 
 এজন্য কখনও কোনও সুপ্ত অভিমান কাজ করে না?‌
খরাজ: না বলব না। কিন্তু করেই বা কী হবে?‌ রবি ঘোষ আমায় বলেছিলেন, জীবনে কখনও আফশোস করিস না। আফশোস করলে এগোতে পারবি না। অর্ধেক গ্লাস জল থাকলে ভাববি গ্লাসের অর্ধেকটা ভর্তি। কখনও ভাববি না অর্ধেক গ্লাস খালি। 
 এখন তো অন্য ধারার ছবির রমরমা। সেখানেও কি অন্যরকম চরিত্রে ডাক পাওয়া কঠিন?‌
খরাজ: আমি তো এই ধারার ছবিতে কাজ করার জন্যই কষ্ট করে অভিনয়টা শিখেছি। মাঝখানে যে ধারাটা বেরিয়েছিল সেটা তো ধারা তেলের মতো ছিল। কোনও অপশন না পেলে মানুষ সেদিকে যায়!‌ ওই ধারার ছবিতে অভিনয় করতে হয়েছিল পেটের কারণে। চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলাম। সংসার হয়েছে। ছেলে হয়েছে। না করলে খাব কী?‌ এতদিনে একটু হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছি। কপালে শিকে ছিঁড়লে আমিও হয়তো সেরকমই একটা ছবি করব।
 এতদিনেও শিকেটা ছিঁড়ছে না কেন?‌
খরাজ: হয়তো এবার ছিঁড়বে। একটা অন্যধারার ছবিতে নির্দেশনার কাজ করতে চলেছি। 
 হিন্দি ছবি ‘‌ধড়ক’‌–এ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এরপরও কি হিন্দিতে দু’‌চার মিনিটের চরিত্রে পর্দায় মুখ দেখাবেন?‌
খরাজ: সুযোগ আসছে করছি। বছরে ৩/‌৪টে হিন্দি ছবি আসছে। ভাল বড় রোল যদি না পাই, তাহলে তো কিছু করার নেই। তবে অভিনয় অভিনয়ই। সেটা ছোটবড় ভাবতে নেই। আমার প্রথম থেকেই মনে হয়েছে, একটা সিনেও এমন কাজ করব যে লোকের মনে গেঁথে থাকবে। সেটাই আমার সাফল্য।
 টেলিভিশনে ‘‌চন্ডীপাঠ’‌ নামে একটা অনুষ্ঠান করতেন। সেখানে কি রাজনৈতিক কমিটমেন্ট ছিল?‌ নাকি নিছক সঞ্চালক?‌
খরাজ: বিভিন্ন সামাজিক ইস্যু এবং রাজনীতি মিলেমিশে ছিল অনুষ্ঠানটাতে। সে সময় বামফ্রন্ট সরকার। ‘‌চন্ডীপাঠ’‌–এ সেই সরকারের তুমুল সমালোচনা করেছি। আমি কেবল সাধারণের মনের কথাটা সকলের সামনে তুলে ধরতাম। তৎকালীন কিছু নেতা অনুষ্ঠানটা দেখে বলেছিলেন, আমরা কি এতটাই খারাপ?‌ আমি বলেছিলাম—‘‌শাসন করা তারই সাজে সোহাগ করে যে’‌। 
 আপনাকে তো কোনও রাজনৈতিক শিবিরেও দেখা যায় না। সহকর্মী অনেকেই তো শিবিরে আছেন। আপনি ডাক পাননি?‌
খরাজ: প্রচুর পেয়েছি। কিন্তু ওটা আমার কাজ নয়। আর যেটা জানি না, সেটা নিয়ে কোনও ঝঁুকি নিতে চাই না। অন্যান্য যাঁরা অভিনয় থেকে রাজনীতিতে গেছেন, তাঁরা ওই বিষয়ে কতটা দক্ষ আমি জানি না। কিন্তু আমার রাজনীতি বিষয়ে মোটেই দক্ষতা নেই। 
 প্রচলিত ধারণা হল, অভিনয় করতে গেলে চেহারাটা ছিপছিপে রাখতে হয়। আপনার বপুই কি আপনাকে কয়েক ধাপ পিছিয়ে দিল?‌
খরাজ: এই পেশায় জহর রায়ই হোন বা চিন্ময় রায়— পার্ট সবার আছে। এখন আমি রোগা হয়ে গেলে যদি বাংলায় কোনও মোটাসোটা অভিনেতার দরকার হয়, তখন মুম্বই থেকে তুলে আনতে হবে। এত ঝক্কির কী দরকার। একটা তো কেউ গোলগাল থাক। কাজেকম্মে লাগবে।

জনপ্রিয়

Back To Top