সংযুক্তা বসু: ●‌ মানসী সিনহা পরিচালিত প্রথম ছবি ‘‌এটা আমাদের গল্প’‌তে আবার একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করছেন। চরিত্রটা ঠিক কী রকম?‌ 
●‌● ‌চরিত্রটার নাম সিমরন। তার ২৩/‌২৪ বছর বয়সের একটি ছেলে আছে। নিজস্ব জীবনে অনেক রকম না পাওয়ার যন্ত্রণা আছে। জীবন থেকে ভালবাসা হারিয়ে যাওয়া, মাঝ বয়সের ক্রাইসিস নিয়ে সিমরন এক পাঞ্জাবি মেয়ে। যার চরিত্রে আমি অভিনয় করছি।
●‌ পাঞ্জাবি মহিলার চরিত্রে অভিনয় করছেন। আপনার কি পাঞ্জাবি মহলে যোগাযোগ ছিল কখনও?‌
●‌●‌ ভবানীপুর এলাকায় বাপের বাড়ি। ওখানে অনেক পাঞ্জাবি পরিবারের বসবাস। আমারও তাদের বাড়িতে যাতায়াত ছিল। তাই সিমরনের সঙ্গে একাত্ম হতে কোনও অসুবিধে হ্য়নি। পাঞ্জাবিদের লাইফ স্টাইল, খাওয়া–দাওয়া, সংস্কৃতি, সঙ্গীত আমাকে আপ্লুত করে। আমি রবীন্দ্রভারতীর অধীনে বটু পালের কাছে লোকনৃত্য শিখি। ভাংড়া আমার খুব প্রিয় নাচ। এই ছবিতে পাঞ্জাবি কালচার খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়েছেন মানসীদি।
●‌ শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় আছেন এ ছবিতে। ছবিতে উনি আপনার কে হয়?‌
●‌●‌ শাশ্বত মানে অপুদা এখানে আমার ভাশুর। আর সোহাগদি (‌সেন)‌ আমার পিসি শাশুড়ি। সোহাগদিকেও খুব মানিয়েছে পাঞ্জাবি লুকে।
●‌ মানসী সিনহা অভিনেত্রী হিসেবে সুপরিচিত। পরিচালক হিসেবে কেমন?‌
●‌●‌ দুর্দান্ত। নতুন পরিচালকেরা অনেক সময়ই কাজ করেন। মানসীদিকে পেয়ে মনে হল একজন পুরোপুরি তৈরি পরিচালককে পেলাম। উনি কোন শটের পর কোন শট নেবেন সেটা একেবারে ছকে কাজে বসেন। কোথাও কোনও ফাঁক নেই। সব থেকে বড় কথা ওঁর মধ্যে কোনও টেনশন নেই। রিল্যাক্স করে কাজ করেন। কোন সিন কেমন ভাবে করবেন সেটা মানসীদির কাছে খুব পরিষ্কার। চিত্রনাট্যও ওঁর নিজের লেখা। আসলে প্রত্যেক অভিনেতার মধ্যেই একটা ছবি আঁকার মানসিকতা থাকে। সেটাই উনি এঁকেছেন।
●‌ বাংলা সিরিয়ালে বছর পাঁচেক টানা কাজ করার পর মুম্বই পাড়ি দিলেন। কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় ছিন্ন হল। মুম্বইয়ের স্ট্রাগলটা ঠিক কেমন ছিল?‌
●‌●‌ মুম্বইয়ে সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে অন্য এক কনীনিকাকে পেলাম। যে সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে এক উন্নততর মানুষ হয়ে উঠল। বাজার করতে, রান্না করতে যে অর্থ লাগে, এনার্জি লাগে বুঝলাম এ সবেরই একটা মূল্য আছে। সেই মূল্যটা বুঝতে পারলাম। বাঁচতে গেলে যে লড়াই করেই বাঁচতে হয়, সেটা আমি মুম্বইয়ের স্ট্রাগলের মধ্যে দিয়ে বুঝেছি। ফলে মানুষ হিসেবে একটা বেটার জায়গায় উত্তরণ ঘটেছিল মুম্বই গিয়ে। তবে হ্যাঁ মুম্বই গিয়ে যে আমি অনেক কাজ পেয়েছি তা নয়। কিন্তু অন্য এক কনীনিকা হয়ে কলকাতায় ফিরেছিলাম। পয়সার মূল্য, জীবনের মূল্য, বাবা–‌মায়ের ভালবাসার মূল্য, এমনকী কোনও কিছু না পাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মূল্যবোধ মুম্বই তৈরি করে দিয়েছে।
●‌ মুম্বই চলে যাবার কারণটা ঠিক কী ছিল?‌
●‌●‌ বাংলা সিরিয়ালে আর অভিনয় করতে চাইছিলাম না। যে ধরনের বাঙালিয়ানায় ভরা সিরিয়ালের স্কুলিংয়ে আমি অভ্যস্ত ছিলাম, সেই ধরনের সিরিয়াল আর হচ্ছিল না। হিন্দি সিরিয়ালের কপি হচ্ছিল। তখন সিনেমায় অভিনয়ের কথা ভাবি। সবাই বলে আমি দেখতে শুনতে ভাল, অভিনয় জানি। তা সত্ত্বেও ছবিতে খুব বেশি কাজ করা আমার হল না। 
●‌ কেন হল না?‌
●‌●‌ আমার যেটা মনে হয় চার পাশের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারিনি। ইমম্যাচিওরড ছিলাম। জানতামই না জনসংযোগ কাকে বলে। কাজ পেতে গেলে মানুষের সঙ্গে গল্প করতে হয়, মিশতে হয়, এই সব আমার অজানা ছিল।
পরে অবশ্য বুঝেছি এসব করেও কাজ পাওয়া যায় না। কাজ পেতে গেলে ভাগ্য, সময়, যোগাযোগ এসবগুলোই দরকার। প্রত্যেক মানুষের নিজেকে প্রমাণ করার জন্য একটা সময় আসে। তাই কেন কাজ পেলাম না এ নিয়ে মন খারাপ করে যে কোনও লাভ নেই এটাও বুঝলাম। নিজেকে কী করে উন্নত করব সেটাই বড় কথা।
আরও একটা ব্যাপার দেখেছি স্ট্রাগলিং পিরিয়ডে সব থেকে ভাল কাজগুলো বেরোয়। নিজেকে প্রমাণ করার একটা তাড়না থাকে তো!‌
●‌ আপনি কি এখনও স্ট্রাগল করছেন?‌
●‌●‌ আলবাত করছি। নতুন পরিচালকেরা আমাকে কাজে নেন। কিন্তু কই, পরের ছবির জন্য আমার কথা ভাবেন না তো। এখন আমি ঠিক করেছি যে রোল পাব, সেই রোলেই নিজেকে প্রমাণ করব ‘‌আই অ্যাম দ্য বেস্ট’‌।
●‌ মুম্বইয়ে না গিয়ে কলকাতায় মাটি আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকলে কী হত?‌
●‌●‌ সব মাছই বড় জায়গায় সাঁতার কাটতে চায়। আমিও চেয়েছিলাম। তারপর সাগরে গিয়ে বুঝলাম, সে জলও আমার জন্য নয়। ফিরে এসেছি। কলকাতার পড়ে থাকলে এর বেশি আর কি হত?‌ এখন যে জনপ্রিয়তা পেয়েছি তার উনিশ বিশ হত।
●‌ ‘‌মুখার্জিদার বউ’‌ ছবিতে আপনি নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করলেন এবং প্রচুর সাফল্য পেলেন। সেই সাফল্যটাকে উপভোগ করলেন তো?‌
 ●‌●‌ একটা মানুষ যখন লড়তে লড়তে জীবন চালায়, তখন খুব উঁচু শিখরে পৌঁছালেও বিশাল আনন্দ উচ্ছ্বাস হয় না। বহুবার মুখ থুবড়ে পড়ে উঠে দাঁড়িয়েছি তো। দাঁড়াবার পর একবার মনে হয়েছে যখন তখন পড়ে যেতে পারি। এই বাস্তবটাকে মনে রেখে যেটুকু সাফল্য উপভোগ করার করেছি। আর ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছি, আমি যেন, এর থেকে আরও ভাল কাজ পাই। তবে শিবুদা (‌শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নন্দিতাদির (‌নন্দিতা রায়)‌ কাছে আমি কৃতজ্ঞ যে উইনডোজ প্রযোজনা সংস্থার তরফ থেকে ওঁরা আমাকে ‘‌মুখার্জিদার বউ’‌ হিসেবে ভেবেছেন। নাই তো ভাবতে পারতেন। শুধু তাই নয় আমি ‘‌হামি’‌তেও একটি বড় চরিত্রে কাজ করেছি।
●‌ ‘‌মুখার্জিদার বউ’‌–‌এর পরিচালক পৃথা চক্রবর্তীও ছিলেন নবীন পরিচালক। কেমন লাগল ওঁর সঙ্গে‌ কাজ করে?‌
●‌●‌ ‘‌মুখার্জিদার বউ’‌ যখন করি, তখন আমি দু’‌মাসের অন্তঃসত্ত্বা। পৃথা খুব শান্ত মাথার মানুষ। খুব সুন্দরভাবে একটা ছোট্ট জোনের মধ্যে কাজটা সামলেছে। আরও একটা ব্যাপার ভাল লাগে, কোনও মেয়ে যদি ইন্ডাস্ট্রিতে কাজে এগিয়ে যায়, নিজেকে প্রমাণ করতে পারে, আনন্দ হয়। পৃথার বেলাতেও সেই আনন্দটা আমি পেয়েছি।
●‌ সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘‌চতুষ্কোণ’‌ ছবিতে আপনি কাজ করেছিলেন। তারপর ওঁর কাছে আর কোনও কাজ চাননি?‌
●‌●‌ আগে কাজ চাইতে লজ্জা লাগত। কিন্তু এখন আমি কাজ চাই অবলীলায়। আমি বার বার প্রত্যেককে এসএমএস করি, লিখি, যদি কোনও কাজ হয় তো বলবেন। কাজ আমার দরকার। তাই ওঁদেরকে জানানোটা দরকার। কিন্তু কেউই ডাকেনি কাজের জন্য। আমি আশাবাদী। আশা করি ভবিষ্যতে কাজ পাব।
কিন্তু বাংলা ছবিতে কাজ না পাওয়া নিয়ে যদি কোনও আক্ষেপ থেকে থাকে তবে সেটা তো নতুন প্রজন্মের পরিচালকেরা দূর করে দিচ্ছেন। অবশ্যই। ‘‌মুখার্জিদার বউ’‌–এ লিড রোল পেয়েছি। ইন্দ্রাশিস আচার্যের ‘‌বিলু রাক্ষস’‌ ছবিতেও নায়িকা চরিত্রে কাজ করেছি। অভিজিৎ সেনের মুক্তি আসন্ন ছবি ‘‌টনিক’‌–এ একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র করছি। সবচেয়ে বড় কথা একটা ছবির চরিত্রের সঙ্গে আরেকটা ছবির চরিত্রের মিল নেই। আমিও চেষ্টা করি প্রত্যেকটা ছবিতে আলাদা আলাদা ধরনের অভিনয় করতে। 
●‌ অভিনয় করতে করতে কখনও রবি ওঝার কথা মনে পড়ে?‌ যিনি আপনাকে প্রকাশ্যে এনেছিলেন?‌
●‌●‌ অবশ্যই মনে আসে। উনি আমার মেন্টর। যখন আমি রবি ওঝার সঙ্গে কাজ করি, তখন আমার বয়স আঠারো–উনিশ। ভালবাসা যে কত রকমের হয়, তখন আমি জানতাম না। পুজোও এক ধরনের ভালবাসা। পরিচালক রবি ওঝাকে আমি মনে মনে ভক্তি করি। উনি যে ধরনের সম্মান বা ভালবাসা আমায় দিয়েছেন এমনটা জীবনে আর কেউ আমাকে দেননি। যা আমি পেয়েছিলাম ‘‌এক আকাশের নীচে’‌–‌র মতো সিরিয়াল করার সময়। বা ওঁর সঙ্গে বাংলা ছবি ‘‌আবার আসিব ফিরে’‌ করার সময়। রবি ওঝা বলেছিলেন ভারতবর্ষের অন্যতম সেরা অভিনেত্রী আমি। এই কথাগুলোকেই আত্মবিশ্বাসের পাথেয় করে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করছি।
●‌ কাজের পাশাপাশি বিবাহিত জীবনে ব্যালান্স করছেন কী ভাবে?‌
●‌●‌ মাঝে মাঝে একটু কুঁড়ে হয়ে পড়ি। সন্তান জন্ম দেবার পর তো একটা ক্লান্তি আসে। আমার বিবাহিত জীবন কাটে বাগুইআটিতে। বাপের বাড়ি দক্ষিণ কলকাতার বকুলবাগান রোডে। এই দুই জায়গায় ছোটাছুটি করে মেয়েকে মানুষ করছি। পাশাপাশি কাজের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আসল কথা, লড়ে যাচ্ছি। লড়াই চলছে চলবে।
●‌ মিষ্টি এক মেয়ে হয়েছে শুনেছি আপনার। কী নাম মেয়ের?‌
●‌●‌ মেয়ের ভাল নাম অন্তঃকরণী। ডাক নাম কিয়া। কিয়া মানে নব ঋতুর আগমন।
●‌ শুটিংয়ের সময় মেয়ে কোথায় থাকে?‌
●‌● মায়ের কাছে রাখি। মা–‌ই একমাত্র ভরসা।
●‌ ভবিষ্যতের স্বপ্ন কী?‌
●‌●‌ আমার এখন সমস্ত স্বপ্ন কিয়াকে ঘিরে। প্রত্যেকদিন কিয়ার নতুন নতুন বেড়ে ওঠা দেখতে দেখতে আমার মধ্যে একটা বাচ্চা কোনির জন্ম হয়। ওর সঙ্গে যখন থাকি মনে হয় ওর বয়স আর আমার বয়স এক।
●‌ শেষ কাজ করেছিলেন ‘‌অন্দরমহল’‌ সিরিয়ালে। সিরিয়ালটি খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। ছাড়লেন কেন?‌
●‌●‌ আমি তো নিজে তখন অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছি। ডাক্তার রেস্ট নিতে বলছেন। কিন্তু সিরিয়ালের শিডিউল ম্যাচ করবে কী ভাবে আমার রুটিনের সঙ্গে?‌ বেশি স্ট্রেস নিয়ে কাজ করা সম্ভব ছিল না। তাই এনওসি দিয়ে বেরিয়ে আসি। তার দুদিন বাদে ১৬ দিন ‘‌মুখার্জিদার বউ’–‌এর শুটিং করে পুরোপুরি বিশ্রামে চলে যাই।
●‌ সিনেমা করার জন্য এত উদগ্রীব, সিরিয়াল পেলে অভিনয় করবেন?‌
●‌●‌ অবশ্যই করব। কিন্তু ভাল গল্প হতে হবে। তাতে বাঙালি জীবনের ছাপ থাকবে। সিরিয়াল যেমন বহু মানুষের কাছে অভিনেতা অভিনেত্রীদের পৌঁছে দেয়, তেমনি অর্থের প্রয়োজনও মেটায়। অর্থের দরকার তো আছেই। মেয়েকে যথাসাধ্য সময় দিয়ে যদি সিরিয়ালের কাজ করতে পারি, সিরিয়াল নির্মাতারা যদি আমার সময়ের শর্তে রাজি থাকেন তো নিশ্চয়ই করব। কোনও অন্যথা হবে না।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top