বরাবরই থিয়েটারের অভিনেতা। সব ধরণের চরিত্রেই অভ্যস্ত। কিন্তু চলচ্চিত্র আপনাকে ‘‌কমেডিয়ান’ দাগিয়ে দিয়েছে।  অন্যধারার ছবিতে আপনার সেভাবে জায়গা হচ্ছে না কেন?‌
কাঞ্চন মল্লিক: টিভি সিরিয়াল, অ্যাঙ্করিংয়ের পর যখন সিনেমায় অভিনয়ে গেলাম, দেখলাম আমার প্রায় প্রতিটা চরিত্রই কৌতুকের‌ হয়ে যাচ্ছে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কৌতুকাভিনয় বড় কঠিন। সবার পক্ষে করা সম্ভব নয়। সেই দায়িত্বটা যখন আমাকে দেওয়া হল, আনন্দের সঙ্গেই নিয়েছিলাম। তার ওপরে ‘‌হে মোর দুর্ভাগা চেহারা’‌। সেটাও কমেডিয়ান করে দেওয়ার পেছনে কাজ করল। যখন আমার কমেডি দর্শক পছন্দ করলেন, তখন তো আনন্দে আত্মহারা। কিন্তু বুঝিনি যে স্ট্যাম্পড হয়ে গেলাম। মিথ্যে বলে লাভ নেই, যখন বুঝলাম, কষ্ট তো হয়েছেই। তবে এখন একটু হাওয়া ঘুরেছে। ‘‌লড়াই’‌, ‘‌শাহাজান রিজেন্সি’‌ ‘‌ধারাস্নান’‌ বা ‘‌জুলফিকার’‌–এর মতো ছবিতে আমার চরিত্রগুলো সেই কষ্টে অনেকটাই প্রলেপ দিয়েছে। আর অন্যধারার ছবিতে আমায় দেখা যায় না কারণ, আমায় কেউ ওইসব ছবিতে নিচ্ছে না। 
 কিন্তু আপনাকে না নেওয়ার কারণটা কী?‌
কাঞ্চন: এই হিসেবনিকেশটা আমি ঠিক বলতে পারব না। মাঝেমধ্যে কেউ কেউ নেয়। সৃজিত মুখোপাধ্যায় কখনও সখনও নেন। পরমব্রত নেন। অঞ্জন দত্ত নেন। কিন্তু বাকিদের অঙ্কটা জানা নেই। আমি তো চরিত্র পাওয়ার জন্য পরিচালকদের পেছনে ঘুরতে পারব না। যাঁরা আমার অভিনয় সম্পর্কে জানেন, তাঁরা তো আমাকে থিয়েটার থেকেই চেনেন। কৌশিক গাঙ্গুলি যখন যাদবপুরে থিয়েটার করেছেন, তখন আমি সেখানে থেকেছি। শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় যখন নান্দীকারে থিয়েটার করতেন তখন থেকে আমায় জানেন। কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ও আমাকে থিয়েটার থেকেই জানেন। এরপরের গোপন মাপটা আমার জানা নেই। তাছাড়া নারীপ্রগতির যুগে মহিলারা তো একটু বাড়তি সুবিধে পেয়েই থাকেন। তার ওপর আমি ক্ষীণজীবী, দুর্বল চেহারার একজন অভিনেতা। আমি তো আর চা খেয়ে বা গল্প করে পার্ট জোগাড় করতে পারব না। 
 যেখানে পৌঁছেছেন তার পেছনে অনেক লড়াইয়ের ইতিহাস আছে। লড়াই আন্দাজে পাওনাটা কি ঠিকঠাক হয়েছে ?‌
কাঞ্চন: আমি অত্যন্ত মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। থিয়েটার করতে গিয়ে সাংসারিক দায়িত্ব পালনের জন্য অনেক যুদ্ধ করতে হয়েছে। আমি যেভাবে, যে পরিবার এবং যে অঞ্চল থেকে উঠে এসেছি তাতে মনে হয় প্রাপ্যের চেয়ে একটু বেশিই পেয়ে গেছি। সাত নম্বর পায়ে দশ নম্বর জুতোর মতো। 
 আপনি তো অভিনয়ের থেকেও বেশি মাচা করেন। মাচা তো আপনাকে বেশি পরিচিতি দিয়ে দিল!
কাঞ্চন: এটা ভুল। দুটোই পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। টিভি সিরিয়াল, অ্যাঙ্করিং বা সিনেমার চরিত্রে যদি আমাকে পছন্দ না হত, তাহলে নিশ্চয় মাচা করার জন্য আমাকে পয়সা খরচ করে নিয়ে যেত না। 
 থিয়েটারই আপনার প্রথম প্রেম। বাংলা থিয়েটার এখন কতটা ভাল অবস্থায়?‌
কাঞ্চন: ভাল বলতে যদি দর্শকানুকুল্যের কথা বলা হয়, তবে সেটা আগেও যেমন ছিল এখনও তেমনই আছে। থিয়েটার চিরকাল কষ্ট করেই করতে হয়েছে। তবু তো এখন থিয়েটার করলে পয়সা পাওয়া যায়। সবক্ষেত্রেই সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক পরিমন্ডল পালটায়। থিয়েটারেরও পালটাচ্ছে। খারাপ হচ্ছে, তা তো বলা যাবে না।
 দেদার অনুদান বাংলা থিয়েটারকে কতটা স্বাস্থ্যবান করেছে?‌
কাঞ্চন: কোথায় অনুদান?‌ আনুদানের টাকা খরচ করার পরও কি থিয়েটার করার টাকা ওঠে?‌ কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়া, মহড়া, পোশাক তারপর নাটক মঞ্চস্থ করা। এতসবের জন্য তিন, চার বা পাঁচলক্ষ টাকা খরচ হয়ে যায়। সেই টাকা কি ওঠে?‌ অনুদান তো ওখানেই শেষ। পরের বছরের জন্য চাতকপাখির মতো বসে থাকো কখন গ্রান্ট আসবে। থিয়েটার করে টাকা তো আর উঠছে না। 
 থিয়েটারে এখন ফ্রিল্যান্স আর্টিস্টদের ছড়াছড়ি। অনেকেই আর একই দলে, একই নাটকে দীর্ঘদিন পড়ে থাকেন না। এটা থিয়েটারের কতটা ক্ষতি বা ভাল করেছে?‌
কাঞ্চন: কী করবে?‌ যে দলকে বিশ্বাস করে, ভালবেসে, পরিশ্রমে, অনুভবে, অনুভূতিতে ভরিয়ে নিজের সবটুকু শ্রম উজাড় করে দেওয়া হয়, দল কি পরবর্তীকালে সেসব নাট্যকর্মীদের সমমর্যাদা দিয়েছে?‌ কেউ কেউ ২০, ২৫, ৩০ বছর এক একটা দলের জন্য জীবনের রক্তঘাম নিংড়ে দিলেন। বিনিময়ে কী পেলেন?‌ দল তাঁদের বিশ্বাস করে না। অপমান করে। সেইজন্যই অনেক নাট্যকর্মী দলত্যাগী হয়ে ফ্রিল্যান্স করছেন। দলগত দাস হয়ে তো থাকতে হয়নি। খারাপ কী তাতে?‌ 
 আপনি তো প্রথম থেকেই স্বপ্নসন্ধানীতে ছিলেন। দীর্ঘ প্রায় ৪/‌৫ বছর আর সেখানে আপনাকে দেখা যায় না। 
কাঞ্চন: এই তো.‌.‌.‌! বিতর্কিত প্রশ্ন। মানুষ তো অনেক জায়গাতেই কষ্ট পায়। অর্থ না পেয়ে কষ্ট নয়। ভালবাসা না পেয়ে কষ্ট। মর্যাদা না পেয়ে কষ্ট.‌.‌। আর শিল্পীরা তো খুব সংবেদনশীল। তাই কষ্টটা তারা অন্যদের থেকে একটু বেশিই পায়। মনে হয়, যে শ্রম ভালবেসে করলাম, সেটা হঠাৎ পণ্ডশ্রম হয়ে গেল?‌ তখন কেউ ঝগড়া করে। আর কেউ নিভৃতে বেরিয়ে আসে। আমি নিভৃতে বেরিয়ে আসা পাবলিক। তাই ‘‌কর্ণকুন্তী সংবাদ’‌–এর লাইনটা আমার জন্য যথার্থ—‘‌আমি রব নিস্ফলের হতাশের দলে’‌।
 ইন্দ্ররঙ্গ প্রযোজিত এবং আপনার পরিচালিত ‘‌একদিন আলাদিন’‌–এর শেষ সংলাপ ‘‌সত্য খুব কড়া আর ঝাঁঝালো’‌। আপনিও ঠোঁটকাটা। সত্যি বলতে পরোয়া করেন না। ব্রাত্য বসুর এই নাটকে কি কোথাও কাঞ্চন মল্লিকের চারিত্রিক ছোঁয়া আছে?‌
কাঞ্চন: হয়তো খানিকটা তাই। এই নাটকটা আমাকে ব্রাত্য বসুই অফার করেছিলেন। বলেছিলাম, পছন্দ হলে করব। পড়ে দারুণ লেগেছিল। তাই রাজি হয়ে যাই। 
 ‌এতদিনের পথচলা। কিন্তু পুরস্কারের ঝুলি তো শূন্যই থেকে গেল। কোনও দুঃখ হয় না?‌
কাঞ্চন: দুঃখ তো হয়ই। মনে হয়, কী পেলাম?‌ একটাই পেয়েছিলাম ‘‌সাথী’‌র জন্য। ইটিভি বাংলা দিয়েছিল। আর সিরিয়ালে খুব ছোটখাট দু’‌একটা। ব্যাস। এখন ভাবি, ব্যালেন্সশিট মেলাতে গিয়ে লাভ নেই। কোথায় কী গোলমাল হয়ে যাবে। তবে যখন মাচা করি, প্রতি রাতে পুরস্কার পাই। প্রত্যন্ত গ্রামে যাঁদের নাম জানি না, মুখ চিনি না, তাঁরা যখন আমাকে দেখে, আমার কথা শুনে আনন্দে ফেটে পড়েন, যখন গভীর রাতে আমাকে দেখার জন্য অন্ধকারে মাইলের পর মাইল রাস্তা পেরিয়ে আসেন, তখন আমি প্রতি রাতে অস্কার পাই। প্রতি রাতে ফিল্মফেয়ার পাই। 

জনপ্রিয়

Back To Top