সৌগত চক্রবর্তী: ‌• অনেকদিন পর আবার ধারাবাহিকে ফিরলেন ‘‌সাঁঝের বাতি’‌ দিয়ে।
•• অনেকদিন পর বলাটা ঠিক নয়। এর আগেই ‘‌রেশম ঝাঁপি’‌ করেছিলাম। সেই ধারাবাহিকে আমার অভিনীত চরিত্র বেশ প্রশংসাও পেয়েছে। তারপর আট মাসেরও কম সময় নিয়েছি ‘‌সাঁঝের বাতি’‌ করতে। আমি যখনই একটা সিরিয়াল করে পরের কাজ ধরেছি প্রত্যেকবারই এই সময়টুকু আমি নিয়েছি। আসলে একটা চরিত্র থেকে বেরিয়ে আসতে এই সময়টুকু আমার দরকার হয়।
• এখন তো সিরিয়ালে নায়ক-‌নায়িকা মূলত অল্পবয়সী। সেক্ষেত্রে সিরিয়াল করতে গিয়ে কি কখনও মনে হয় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র পাচ্ছেন না।
•• কখনোই তা মনে হয় না। আমি যখনই ধারাবাহিকে যে চরিত্র করেছি তা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আসলে যাঁরা নতুন মুখ তাঁরা তো এই সবে অভিনয়ে এসেছেন। তাঁদের মুখগুলোও দর্শকের কাছে পরিচিত নয়। আর আমি আছি প্রায় ২৩ বছর ধরে। কাজেই রোজ ৩০ মিনিট করে দর্শকদের টিভির সামনে বসিয়ে রাখার ক্ষেত্রে চ্যানেল বা পরিচালক নতুন মুখের চেয়ে আমাদের ওপরেই বেশি আস্থা রাখেন। তাঁরা চান আমি বা আমার মতো সিনিয়ররা যে ট্র‌্যাকটায় আছেন সেটাকেই মেন ট্র‌্যাক করে গল্পটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। কাজেই, সেই গল্পে আমাদের চরিত্রকে আকর্ষনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতেই হবে। শুধু নতুন মুখ দিয়ে সিরিয়াল বিক্রি করা যায় না।
• সিনেমায় আপনাকে বেশিরভাগ সময়েই দেখা গেছে ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করতে। সচেতনভাবেই কি আপনি এরকম চরিত্র পছন্দ করে নিচ্ছেন?‌
•• আমি ভাল চরিত্র চাই। এটাই আমার প্রথম শর্ত। কিন্তু বড় চরিত্র করতে গেলে যে সময়টা প্রয়োজন সেটা দেবার মতো সময় আমার নেই। ধারাবাহিকে অভিনয় করার জন্যেই নেই। কাজেই যথাসম্ভব সময় বাঁচিয়ে সিনেমায় অভিনয় করতে হয়। তাই ছোট হলেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করছি। ধারাবাহিকের ফাঁকে ফাঁকেই এইভাবে সিনেমা করছি বা ওয়েব সিরিজ করছি। এই তো ওয়েব সিরিজ ‘‌ভার্জিন মোহিতো’‌ করলাম। তবে বড় চরিত্রও যে করছি না তা নয়। ‘‌সোয়েটার’‌ করলাম। বেশ ভাল ছবি। নতুন একটা ভাবনা আছে। খুব কম বাজেট কিন্তু ভাবনাটা খুব বড়। এই ধরনের ছবির প্রস্তাব এলে খুব ভাল লাগে। আরও অনেক ছবির প্রস্তাব এসেছিল কিন্তু ধারাবাহিকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র করতে গেলে অনেক কিছু ছাড়তে হয়।
• আপনি তো ‘‌মেরি পেয়ারি বিন্দু’‌ ছবিতেও কাজ করেছেন। এর পর আর কোনও হিন্দি ছবির প্রস্তাব আসেনি?‌
•• এসেছে তো। কিন্তু ধারাবাহিকের কারণে সেই ছবিগুলোয় রাজি হতে পারিনি।
• টেলিভিশনের কাজ যদি বড়পর্দায় কাজের বাধা হয়ে দাঁড়ায় তাহলে ধারাবাহিক ছেড়ে দিচ্ছেন না কেন?‌ 
•• আমি তো ‘‌জলছবি’ তে অভিনয় করতে পারব না। আসলে অনেক ছবিতেই অভিনয়ের প্রস্তাব আসে, যেগুলো নেহাৎ-‌ই জলছবির পর্যায়ে পড়ে। ১০টা জলছবি করার চেয়ে একটা ধারাবাহিক করা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। তাছাড়া, যদি সেরকম কোনও ছবির প্রস্তাব আসে, যেখানে অভিনয় করে আমি তৃপ্তি পাব বলে মনে করি, তাহলে সে সব‌ ক্ষেত্রে চ্যানেল আমাদের সেই সময়টা দেয়। তাই তো ‘‌সোয়েটার’‌ এ কাজ করলাম।
• এখন সিনেমায় আর কী কাজ করছেন?‌
•• কিচ্ছু নয়। আবার একটা ধারাবাহিকে ঢুকে পড়েছি। কাজেই আর সিনেমা করার মতো সময় নেই।
• বলা হয়, সিনেমায় যোগাযোগটাই প্রধান। অভিনয়ে দক্ষতা না থাকা সত্ত্বেও ভাল যোগাযোগের কারণেই নাকি টালিগঞ্জে কাজ পাওয়া যায়। এটা কতখানি সত্যি?‌
•• একদম বাজে কথা। যাঁরা এরকম কথা বলেন, তাঁদের নিশ্চয়ই কিছু খামতি আছে অভিনয়ের ক্ষেত্রে। ব্যক্তিগতভাবে বলতে পারি, আমার পি আর স্কিল অত্যন্ত খারাপ। তাহলে এত কাজ পাচ্ছি কী করে?‌
• আপনিই বলেছেন ইন্ডাস্ট্রিতে আপনার ২৩ বছর হয়ে গেল। এই দীর্ঘ সময়ে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজের পরিবেশে কোনও পার্থক্য লক্ষ্য করছেন?‌
•• পার্থক্য এসেছে একটা জায়গায়। এখন খুব কম সময়ে অনেক বেশি কাজ করে ফেলতে হয়। ফলে সহ শিল্পীদের সঙ্গে সেই গল্প-‌গুজব করে ধীরে সুস্থে কাজ তোলার ব্যাপারটা নেই। আমি যখন ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছি তখন চ্যানেল বলতে ডি ডি সেভেন। পরে এল আলফা বাংলা আর ই টিভি। কাজেই অনেকটা সময় পেতাম।
• আর সহ শিল্পীদের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে?‌ অবনতি হয়েছে না একই রকম আছে?‌
•• আমার তো মনে হয় একই রকম আছে। যদিও এখন গল্প-‌গুজব করার প্রবণতা নেই। তবে সম্পর্কটা খারাপ হয়নি। আমার মনে হয়, এটা নির্ভর করে নিজের ব্যক্তিত্বের ওপর। আমি যদি অন্যদের রেসপেক্ট করি তাহলে সেও আমাকে রেসপেক্ট করবে। তবে কোথাও না কোথাও একটা বর্ডার লাইন থাকা উচিত। যেমন আমি যখন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে অভিনয় করেছি তখন সৌমিত্রবাবু আমাকে যথেষ্ট সম্মান দিয়েছেন। আমাকে তাঁর লেখা নতুন কবিতা শুনিয়েছেন। কিন্তু তা বলে আমি তাঁর সঙ্গে মিনিংলেস ঠাট্টা ইয়ার্কি করব না তিনি আমার সঙ্গে করবেন?‌ তাই একটা বর্ডার লাইন দরকার। আর সেটা আসে রুচি অনুযায়ী।
• কেরিয়ারের ক্ষেত্রে নতুন কোনও আইডিয়া আছে আপনার?‌
•• হ্যঁা, আমার অনেকদিনের ইচ্ছা একটা ছবি পরিচালনা করার। এর আগেও পরিচালনা করেছি, তবে সেটা ডকুমেন্টারির ক্ষেত্রে বা টিলিফিল্মের ক্ষেত্রে। ২০০৮ এ তৈরি করেছিলাম ডকুমেন্টারি ছবি ‘‌আউট ইন ইন্ডিয়া:‌ আ ফ্যামিলিজ জার্নি’‌। খুব শিগগিরই হয়তো একটা ওয়েব সিরিজ পরিচালনা করব। কতাবার্তা চলছে। এইভাবেই ধীরে ধীরে ফিচার ফিল্ম পরিচালনার দিকে এগিয়ে যেতে চাই।
• আর থিয়েটার?‌ তার জন্যে কোনও পরিকল্পনা আছে?‌
•• না নেই। আসলে থিয়েটার প্রচন্ড নিয়ম-‌শৃঙ্খলায় বাঁধা। আমাদের তো শুটিং-‌এর সময়ের কোনও ঠিক নেই। এখন নতুন করে ১৪ ঘণ্টার শুটিং শিডিউল হয়েছে বলে তাও একটু হাঁফ ছাড়তে পারছি। থিয়েটার করতে হলে রোজ একটা নির্দিষ্ট সময় রিহার্সালের জন্য রাখতে হবে। দেখা গেল শুটিং-‌এর জন্যে হয়ত আমিই যেতে পারলাম না। তবে থিয়েটারকে আমি প্রচন্ড অ্যাডমায়ার করি।
• ২৩ বছর এই ইন্ডাস্ট্রিতে কাটিয়ে কখনও কি মনে হয়, যা পাওয়া উচিত ছিল পাইনি?‌
•• আমি খুশি আমার কাজে। অনেক কাজই তো করলাম। ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ, টেলিফিল্ম, পরিচালনা—সব ধরনের কাজই করেছি। সিনেমায় এস ভি এফের সঙ্গেই বেশিরভাগ কাজ করেছি। কাজেই আক্ষেপ থাকবে কেন?‌ আসলে চাহিদা থেকে নিজেকে সংযত রাখতে হবে। আমার একটা হন্ডা সিটি আছে। কিন্তু তাতে কি?‌ এবার একটা মার্সেডিজ চাই। এই মনোভাব থাকলেই আক্ষেপ আসবে। আমি সরল সিদেসাধা ভাবেই আমার জীবনটাকে চালিয়ে নিয়ে যেতে চাই।‌

ছবি :‌ সুপ্রিয় নাগ‌
 

জনপ্রিয়

Back To Top