উৎপল চক্রবর্তী না থাকলে তো গায়ক শ্রীকান্ত আচার্যকে পাওয়াই যেত না। তাই তো?
শ্রীকান্ত আচার্য:‌ অনেকটা তো বটেই। চাকরি ছাড়ার ক’‌দিন আগে দক্ষিণ কলকাতার বিখ্যাত সঙ্গীতবিপণি ‘মেলোডি’র কর্ণধার উৎপল চক্রবর্তী (দুলালদা)‌‌–র সঙ্গে পরিচয়। তখন চাকরি করি। সেই সময় কোনও একটি একান্ত ঘরোয়া আসরে আমার গান শুনে দুলালদা বলেছিলেন, ‘‌তুমি গানটা সিরিয়াসলি করছো না কেন?‌’‌ আসলে গানবাজনা করব, তখন তেমন কোনও পরিকল্পনাই ছিল না। কিন্তু চাকরি ছাড়ার কথা যখন দুলালদাকে বললাম, ‌প্রচণ্ড বকাবকি করলেন। বললেন, ‘‌মূর্খের মতো কাজ করেছো।’‌ সেই বকাবকির পর অবশ্য স্নেহভরেই পাঠালেন ‘এইচএমভি’তে। কারও গান বা বাজনা ভাল লাগলে উনি রেকমেন্ড করতেন। দুলালদা পাঠালেন বটে। কিন্তু আমার ভীষণ লজ্জা করছিল। তবু গেলাম। এইচএমভি’র কলকাতা ব্রাঞ্চের কর্ণধার সুব্রত চৌধুরির সঙ্গে কথা হল। ঘরে বসেই হারমোনিয়াম বাজিয়ে কিছু গান রেকর্ড করেছিলাম একটা ক্যাসেটে। সেটাই দিলাম। বললেন, ‘শুনব। দিনকয়েক বাদে আসুন।’‌ সাতদিন পর গেলে তিনি বললেন, ‘‌আপনার গান ভাল লেগেছে। কিন্তু পুজোর প্ল্যান হয়ে গেছে। এ বছর কিছু করতে পারব না।’‌ শুনে আমি অবশ্য কিছুই মনে করিনি। কিন্তু দুলালদাকে এসে কথাটা জানাতে উনি বোধহয় একটু ক্ষুণ্ণ হলেন। বললেন, ‘এইচএমভি–তে দরকার নেই। তুমি সাগরিকায় যাও।’‌ সংকোচ নিয়েই গেলাম। সেখানেও ডেমো ক্যাসেট রেখে যেতে বলা হল। সাতদিন পর যখন গেলাম, ব্রাঞ্চ ম্যানেজার অনুপম গণ আমাকে নানা কথা জিগ্যেস করতে লাগলেন। পরিবারের কথা, হঠাৎ চাকরি ছাড়লাম কেন ইত্যাদি। আমি কোনও উৎসাহ দেখাচ্ছিলাম না। ভাবছিলাম ক্যাসেটটা ফেরত দিলে কতক্ষণে বাড়ি যাব। কিন্তু আমায় চমকে দিয়ে অনুপমদা বললেন, ‘‌আমরা আপনাকে কনট্র‌্যাক্টে নেব।’‌ শুনে খুব ঘাবড়ে গিয়ে বললাম, ‘‌একটু ভাবার সময় দিন’‌। অনুপমদা বললেন, ‘ভাবার কী আছে ?‌ হাতে আরও অফার আছে নাকি?‌’‌ বাড়ি ফিরে ভাবলাম, আমার তো কিছু হারানোর নেই। রাজি হয়ে গেলাম। সেই শুরু। দুলালদা রেকমেন্ড না করলে আর সাগরিকা কোম্পানি সুযোগ না দিলে এইভাবে শুরু হত কি না কে জানে !
 ওস্তাদ আলি আহমেদ খাঁ–র কাছে তবলার তালিম নিয়েছেন। পেশাদার তবলাবাদক হওয়ার ইচ্ছে ছিল নাকি?‌
শ্রীকান্ত:‌ তবলা আমাকে যতটা উত্তেজিত করে বা আনন্দ দেয়, ভোকাল মিউজিক হয়তো ততটা করে না। ছোটবেলা থেকে বাইশ বছর কেটেছে লেক গার্ডেন্সে। ‘আলাউদ্দিন সঙ্গীতসমাজ’–এর একটি শাখা খোলা হয়েছিল আমাদের বাড়ির কাছে। সেখানেই আমাকে ভর্তি করা হয় তবলা শেখার জন্য। প্রখ্যাত সেতারবাদক ওস্তাদ আলি আহমেদ খাঁ সাহেব সেখানে আসতেন সেতার ও তবলার তালিম দিতে। তাঁর কাছেই শিখেছি পাঁচ–ছ’ মাস। কিন্তু শারীরিকভাবে একেবারেই অশক্ত হয়ে পড়ার জন্য তাঁর আসাটা খুব অনিয়মিত হয়ে গেল। ফলে আমার শিক্ষাতেও ছেদ পড়ল।
 গান শেখা কতটা?‌ আর ভেতরে ছিল কতটা?‌
শ্রীকান্ত:‌‌ শেখা বলতে সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক। দক্ষিণীতে ১০ বছর শিখেছি। স্নাতক হয়েছি। কিন্তু সে শিক্ষার পুরোটাই রবীন্দ্রসঙ্গীত। পরে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ জন্মায় শাস্ত্রীয়সঙ্গীতে। আফশোস হয়, শুরু থেকে যদি শাস্ত্রীয়সঙ্গীতের তালিম নিতে পারতাম! সঙ্গীত জগতের অনেক বন্ধুদের দেখি, ‘‌আমার গুরু’‌ এই শব্দ দুটো বলতে পেরে গর্ব অনুভব করে। সেই আনন্দ থেকে আমি বঞ্চিত। দক্ষিণীর শিক্ষা ছাড়া গানবাজনার যতটুকু জানি–বুঝি বা পারি, তার সবটাই সহজাত ক্ষমতায় আর শুনে। সেভাবেই এখনও শিখে চলি।
 প্রতিষ্ঠা পেয়েও কি শেখা যেত না?‌ গুরু ছিলেন না?‌
শ্রীকান্ত:‌‌ ছোটবেলা থেকে যদি একটা প্রথাগত তালিম এবং রেওয়াজের অভ্যেস ভেতরে তৈরি না হয়, তাহলে একটা বয়সের পর সেটা নতুন করে শুরু করা খুব কঠিন। তার ওপর আমি চিরকেলে ফাঁকিবাজ। তাই ...।
 আপনি পারফর্মার হিসেবে এত খুঁতখুঁতে কেন?‌
শ্রীকান্ত:‌‌ জানি না। আমি আজ পর্যন্ত যত গান রেকর্ড করেছি, সেগুলো আর প্রায় শুনিই না! শুনলেই মনে হয়, অনেক ত্রুটি থেকে গেছে। আরও ভালো হওয়া উচিত ছিল। তৃপ্তি আসে না। ‌
 মৃণাল সেন, ঋতুপর্ণ ঘোষ, কৌশিক গাঙ্গুলি, সৃজিত মুখার্জির সঙ্গে কাজ করেছেন। কার সঙ্গে আড়ষ্ট লেগেছে?‌
শ্রীকান্ত:‌‌ আড়ষ্ট লাগেনি, বরং টেনশন হয়েছে বলতে পারি। মৃণাল সেনের শেষ ছবি ‘‌আমার ভুবন’–এ ‌ কাজ করতে গিয়ে টেনশন হয়েছিল। মৃণালদা বাড়িতে ডাকলেন। ভেবেছিলাম বড়জোর আধঘণ্টা সময় দেবেন। কিন্তু অনেকটা সময় নিয়ে উনি পুঙ্খানুপুঙ্খ বোঝালেন,‌ ছবিতে কোন্‌ জায়গায় গানটা হবে এবং কেন হবে। নিজের কাজ সম্পর্কে কতটা প্যাশন থাকলে আমার মতো এক নগণ্য এলেবেলেকেও এতটা সম্মান ও সময় দেওয়া যায়, সেটা ভেবে ওঁর প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে গিয়েছিল।
 সিনেমার গান গাওয়াটা আর কঠিন জায়গায় নেই, এ কথা মনে করেন কি? তাই কি মানও পড়ছে কোথাও কোথাও ?‌
শ্রীকান্ত:‌‌ বিক্ষিপ্ত কিছু কাজ বাদ দিলে বাংলা গানের ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে মান হয়তো পড়েছে। কারণ, অধিকাংশই নিজস্বতা আনতে পারছে না। সব কিছু প্রায় একই রকম ... ‘হোমোজেনাইসড’ হয়ে যাচ্ছে। এটাই এখন দস্তুর। ছবির গানের স্টাইল ও ভঙ্গি সময়ের সঙ্গে বদলাবেই, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সব একই ছাঁচে পড়ে গেলে আর কোনো বৈচিত্র্য থাকে না। খুব হাতে-গোনা কয়েকজনকে বাদ দিলে কম্পোজারেরও অভাব।
 রিয়েলিটি শোয়ে অন্য বিচারকদের সঙ্গে মতের অমিল হয়?‌
শ্রীকান্ত:‌‌ হয় বইকি। সেটা স্বাস্থ্যকর। হওয়া দরকার।
 কারও সঙ্গে কাজ না করার আক্ষেপ আছে?‌
শ্রীকান্ত:‌‌ থাকবে না ? মনে হয়, সলিল চৌধুরির সুরে যদি এক লাইন গাইতে পারতাম, কিংবা রাহুল দেববর্মন বা নচিকেতা ঘোষের একটু কাছেও যদি যেতে পারতাম, তবে জীবন ধন্য হত।
 গানের অনুষ্ঠানে দর্শকাসনে কেউ ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকলে শ্রীকান্ত আচার্যের বিরক্ত লাগে?‌
শ্রীকান্ত:‌‌ ভীষণ! সেলফোন বহু মানুষকে নির্বোধ বানিয়ে ছেড়েছে।
অডিটোরিয়ামে বসে অনুষ্ঠান চলাকালীন সেলফোন দেখা মানে মঞ্চের শিল্পীকে অপমান বলেই আমি মনে করি। যারা দর্শকাসনে প্রথম সারিতে বসে পেছনে–বসা লোকের সঙ্গে গল্প করে বা সেলফোন দেখে, তাদের নির্বোধ ছাড়া কিছু ভাবি না। নাটক, ফিল্ম বা সঙ্গীতের অনুষ্ঠানে এলে দর্শক বা শ্রোতারও একটা কোড অফ কন্ডাক্ট মেনে চলা উচিত। আমাদের দেশে সেই শিক্ষার বড় অভাব। আর পাঁচটা জায়গার মতোই।

জনপ্রিয়

Back To Top