পুষ্পরাগ থেকে টোটা। ইন্ডাস্ট্রিতে এসেই নামবদল?‌
টোটা রায়চৌধুরি: নাম তো বদলাইনি। টোটা আমার ডাকনাম। ‌পুরীতে টোটা গোপীনাথের মন্দিরে পুজো দিতে গিয়ে দাদু আমার জন্মের খবর পান। তখন দাদু বলেন, মন্দিরে গিয়ে যখন নাতি হওয়ার খবর পেলাম, তখন ঠাকুরের নামেই ওর নাম রাখা হোক। প্রভাত রায়ের ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়ার পর উনি বললেন, পুষ্পরাগ নামটা সিনেমার জন্য ঠিকঠাক নয়। বরং টোটা নামটা অনেক শার্প। নামটা প্রভাতদার এত ভাল লেগেছিল যে, ‘‌লাঠি’‌ ছবিতে আমার চরিত্রের নামও উনি টোটা দিয়েছিলেন। তারপর একেবারেই টোটা হয়ে গেলাম।
 নিজেকে টলিউডের সলমন খান করে গড়তে চেয়েছিলেন?‌
টোটা: আমার স্বাস্থ্যসচেতনতা সিনেমায় আসার বহু আগে থেকেই। ছোট থেকেই ফুটবল খেলতাম। এবং সেটা যথেষ্ট সিরিয়াসলি। তাবড় কোচরা আমার খেলার প্রশংসা করেছেন। জীবনের লক্ষ্যই ছিল ফুটবলার হব। কিন্তু হঠাৎ বিচ্ছিরিভাবে হ্যামস্ট্রিং ছিঁড়ে যায়। আমার তখন বছর ১৮ বয়েস। হ্যামস্ট্রিং ঠিক করতে প্রায় ৮/‌৯ মাস লেগে যায়। তারপর দেখলাম ফুটবল খেলছি বটে। কিন্তু সেই তুখোড় ভাবটা নেই। মনটা ভেঙে গেল। ভাবলাম সেনাবাহিনীতে যোগ দেব। আর বাহিনীর হয়ে ফুটবল খেলব। ছোট থেকে খেলাধুলো ছাড়া থাকিনি। স্বাভাবিকভাবেই শরীর সচেতনতা, নিয়মানুবর্তিতা ব্যাপারটা তখন থেকেই আমার মধ্যে চলে এসেছে। 
 হিন্দি ছবির সেলিব্রিটি নায়িকাদের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। তবু জাতীয় স্তরের অভিনেতার জায়গাটা পেলেন না কেন?‌
টোটা: মুম্বইতে জায়গা পেতে হলে আওখানে গিয়ে থাকতে হবে। বলিউড সবসময় বহিরাগত অভিনেতাদের সেকেন্ড অপশনে রাখে। মুম্বইয়ে থেকে যেমন হলিউডে স্টার হওয়া যায় না, তেমনই কলকাতায় থেকে মুম্বইয়ে তারকা হওয়া যায় না। কিন্তু আমার প্রথম পছন্দ আমার পরিবার। সেটা ছেড়ে মুম্বই যাওয়া সম্ভব নয়। যাদের জন্য সবকিছু করা, যাদের জন্য পথচলা, তাদেরই কেরিয়ারের জন্য ছেড়ে চলে যাব‌!‌ হয় নাকি?‌ যখন মুম্বইয়ে কাজ শুরু করি, তখন আমার মেয়ে খুব ছোট। মুম্বই যাওয়ার থেকে ওকে কোলেপিঠে করে মানুষ করাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পরিবার নিয়ে বাংলা থেকে উৎপাটিত হয়ে মুম্বই চলে যাওয়াও আমার ধাতে নেই। কলকাতায় থেকে যদি হওয়ার হয় হবে। নচেৎ হবে না। 
 কিন্তু এখানেও ঋতুপর্ণ ছাড়া সেভাবে কেউ ব্যবহার করেনি।‌
টোটা: নাহ্‌। করেনি তো। কেন করেনি বলতে পারব না। এটা নিয়ে আগে ভাবতাম। অভিমান হত। দুঃখ হত। এখন গা–সওয়া হয়ে গেছে। এটা আমার পি আরের অভাব তো বটেই। আমার একটা জেদ আছে। সেটা হল, কাজটা মন দিয়ে করব। কাউকে অসুবিধেয় না ফেলে, নিয়ম মেনে সততার সঙ্গে চলব। তাতে যা পাব, তাতেই আমি সন্তষ্ট। কাউকে তৈলমর্দন করতে পারব না। রাতের পর রাত পার্টি করে, সময় কাটিয়ে কাজ জোগাড় করা আমার দ্বারা হবে না। 
 আঞ্চলিক ছবিতে ভাষা কতটা প্রতিবন্ধক হয়েছিল?‌
টোটা: আমি আমার সংলাপের প্রতিটা শব্দের অর্থ জেনে, খুঁটিয়ে বুঝে তবেই অভিনয় করতাম। একটা সিনে অভিনয় করতেও প্রচুর খাটতাম। সেই পরিশ্রমটা ওদের খুব ভাল লেগেছিল। সঙ্গে আমার নিয়মানুবর্তিতা। কাজ ছাড়া কিচ্ছু বুঝতাম না। বিশেষত দক্ষিণী পরিচালকরা এই ব্যাপারটার জন্যই আমায় বারবার ডাকেন। ওদের কাছে সিরিয়াসনেসের থেকে বড় আর কিচ্ছু নেই। 
 এই জায়গাটায় কি বাংলা ইন্ডাস্ট্রি পিছিয়ে?‌
টোটা: পিছিয়ে বলব না। বাংলার কলাকুশলীরাই তো বাইরে গিয়ে কাজ করছে। নাম করছে। কিন্তু কোথাও যেন একটা সাংগঠনিক দুর্বলতা রয়েছে। অন্তর্নিহিত শক্তির কথা আমরা ভুলতে বসেছি। এখানকার ছেলেমেয়েরা বাইরে গিয়ে সুনামের সঙ্গে কাজ করলে এখানে কেন পারছি না?‌ পরিকাঠামোগত দুর্বলতাও রয়েছে। ইন্ডাস্ট্রির কেষ্টবিষ্টুরা একসঙ্গে বসে দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করে নিজেদের সিস্টেমে বাঁধতে পারেন, তবে নিশ্চয়ই ভাল হবে। তবে ইদানিং কিন্তু বহু ভাল ছেলেমেয়ে, পরিচালক, প্রযোজক এসেছেন।  তাঁরা নিয়ম মেনে একটা অন্য রীতি তৈরির দিকে এগোচ্ছেন। ক’‌বছরের মধ্যেই আমাদের মানসিক দৈন্যদশাটা কেটে যাবে। 
 জাতীয় স্তরে ছবি পুরস্কৃত হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগত পুরস্কার?‌
টোটা: আমি পুরস্কারজয়ী অভিনেতাদের পর্যায়ে পড়ি না। আমাকে যে কাজের জন্য নেওয়া হয়, সেই কাজটা করতে পারি মাত্র। পরিচালক ঠিকঠাক পথ দেখালে ভাল কাজ বেরিয়ে যায়। যেমন ঋতুপর্ণ ঘোষ, অতনু ঘোষ, সুজয় ঘোষ, মধুর ভান্ডারকরের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে হয়েছে। 
 মূলধারা না অন্যধারা?‌ কোনটায় কাজ করে বেশি আনন্দ?‌
টোটা: অবশ্যই মূলধারা। কারণ, বাণিজ্যিক ছবি দেখে দেখেই আমার অভিনয়ে আসার স্বপ্ন। আমার শিক্ষা। বাণিজ্যিক ছবি থেকেই রোজগার। এই ছবি দেখেই আমাকে অন্য ধারার পরিচালকরা ডাকেন। তাই হৃদয়টা পড়ে আছে মূলধারাতেই। তাছাড়া মূলধারাতেও এখন গল্প, পরিচালনা সবক্ষেত্রেই বদল এসেছে। বেশ ভাল সময়ের মধ্যে দিয়েই যাচ্ছি আমরা। 
 কলকাতা ছাড়িয়ে মুম্বই। সেখান থেকে দক্ষিণ ভারত। তবু দিনের শেষে নিজেকে কী মনে হয়?‌ মহাভারতের কর্ণ?‌
টোটা: আমি মহাভারতের এক পদাতিক সৈন্য মাত্র। আমার কাজ হল তলোয়ারটাকে শান দেওয়া। বল্লমটাকে শক্তপোক্ত করা। ঢালে যাতে কোনও ছিদ্র না থাকে, সেটা নজরে রাখা ইত্যাদি ইত্যাদি। যখনই ডাকা হবে, যুদ্ধ করতে প্রস্তুত থাকতে হবে। এইটুকুই। 
 মনে হয় না যে আরও একটু বেশি প্রাপ্য ছিল?‌
টোটা: যখন বয়স কম ছিল, ক্ষোভ তো হতই। মনে হত, যাদের নিয়ে মাতামাতি করা হচ্ছে, আমি তো তাদের থেকে একটু হলেও ভাল কাজ করতে পারি!‌ তারপর দেখলাম, আমার চাহিদার থেকেও বড় শক্তি একজনের আছে। তিনি ঈশ্বর। তিনি যতটা চাইবেন ততটাই হবে। অনেককে তিনি কম দেন। কিন্তু বহুদিন ধরে দেন। আমি সেই কম পাওয়াদের দলে। তাই ২৫ বছর অভিনয় করার পরও লোকে আমাকে ভালবাসে। আমি এখনও ইন্টারভিউ দিচ্ছি।

জনপ্রিয়

Back To Top