লড়াই করে জায়গা তৈরি করে নিয়েছেন। ‘নকশিকাঁথা’ র যশ সিরিয়ালপ্রেমীদের অন্যতম হার্টথ্রব এখন। তাঁর ভাললাগার কথা জানলেন লোপামুদ্রা ভৌমিক

 পরিবারেই কেউই তো এ পথের পথিক নয়। আপনি হঠাৎ?‌
‌সুমন দে: আমারও তো আসার কথা ছিল না। আমি শিলিগুড়ির ছেলে। ক্লাস টেনের পর বেঙ্গালুরু চলে যাই। সেখান থেকেই গ্র‌্যাজুয়েশন। কিন্তু কেরিয়ার নিয়ে কখনও কোনও অ্যাম্বিশন ছিল না। ক্লাস টেনে শিলিগুড়িতেই একটা ফ্যাশন শো দেখে বেশ ভাল লাগে। আমার এক বন্ধুর দিদি ছিলেন ফ্যাশন ডিজাইনার। তাঁর সূত্রেই শিলিগুড়িতে মডেলিং শুরু করি। বেঙ্গালুরুতে লেখাপড়ার সঙ্গেই র‌্যাম্প মডেলিং করতে থাকি। সেভাবেই অ্যাডের মডেলিং আসতে থাকে। কিন্তু নাটক বা অভিনয় কস্মিনকালেও না করায় ব্যাপারটা বেশ  কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। অভিনয় স্কুলে ভর্তি হয়ে অভিনয় শেখার জন্য টাকাও বাবার পক্ষে দেওয়া সম্ভব ছিল না। গ্র্যাজুয়েশনের পর অভিনয়ের জন্যই মুম্বই গিয়ে লড়াই শুরু করি। কিছুদিন পর টাকার জন্য জিমের ট্রেনারের কাজ নিই। ভোর ৬টা থেকে দুপুর ২টো পর্যন্ত ট্রেনারের কাজ করতাম। তারপর অডিশন দিতে বেরতাম। তবু খরচা চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলাম। বাধ্য হয়ে নাইট শিফটে একটা কোম্পানিতে চাকরি নিলাম। যাতে দিনে অডিশন দিতে পারি। এরপর সাহারা ওয়ান চ্যানেলের সিরিয়াল ‘‌মাতা কি চৌকি’‌–তে একটা ছোট চরিত্রে কাজ পাই। কলকাতায় ‘‌আমি সেই মেয়ে’‌ সিরিয়ালের মুখ্য চরিত্রে নির্বাচিত হই। ধীরে ধীরে একটা দুটো করে কাজ আসতে থাকে। কিন্তু কেরিয়ারের ব্রেক দিয়েছিল স্টার জলসার ‘‌বধূবরণ’‌। ওই সিরিয়ালের ‘‌অভ্র’‌ চরিত্র  তুমুল জনপ্রিয়তা পেল। এরপর কালার্স বাংলার ‘‌গুরুদক্ষিণা’‌ আর এখন জি বাংলার ‘‌নকশিকাঁথা’।  
 আগে ছিল ১৩ পর্বের ধারাবাহিক। এখন প্রতিদিন। এই রোজনামচা ধারাবাহিকের জনপ্রিয়তায় জোয়ার এনেছে না ভাটা?‌
‌সুমন: সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই বদলেছে। তাই আগের ধারণা এখন আর চলে না। তাছাড়া এখন সিনেমা দেখা যথেষ্ট খরচসাপেক্ষ। যেটা আগে ছিল না। আগে সিনেমাই ছিল বিনোদনের অন্যতম উপকরণ। এখন টিভি। সামান্য কিছু টাকা দিয়ে টিভি রিচার্জ করে নিলেই ঘরে বসে সিনেমা, খবর থেকে খেলা— সবই হাতের মুঠোয়। একটা সিনেমা মুক্তি পাওয়ার দু’‌তিন মাস পরেই টিভিতে দিয়ে দিচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে টিভিই তো দেখবেন মানুষ। আগে একটা বা দুটো চ্যানেল ছিল। এখন গুচ্ছ গুচ্ছ চ্যানেল। একটা সিরিয়াল পছন্দ না হলে চ্যানেল ঘুরিয়ে দেওয়ার অপশন আছে। তবে এখন সিরিয়ালে জোয়ার এসেছে। চূড়ান্ত প্রতিযোগিতা। যে ভাল করবে সে টিকে থাকবে।
 আপনার পরপর তিনটে সিরিয়াল হিট। তিনটেই মূল চরিত্র। একটা সিরিয়ালের জনপ্রিয়তা অন্যটাকে ব্যাহত করে না?‌
সুমন: ‌সেটা যে একেবারেই হয় না তা বলব না। ‘‌বধূবরণ’‌–এর অভ্রর সঙ্গে ‘‌নকশিকাঁথা’‌–র যশের তুলনা আমাকেই শুনতে হয়েছে। এখনও হয়। অনেকে সরাসরি বলেন, অভ্রকেই বেশি ভাল লেগেছিল। কেউ আবার বলেন, যশই সেরা। কী বলব?‌ টেনশনে পড়ে যাই। আবার ভালও লাগে। একটা সিরিয়াল শেষ হয়ে যাওয়ার তিন বছর পরও মানুষ মনে রেখেছেন। এটাই তো পাওয়া। 
 ধারাবাহিকের নায়ক বনাম সিনেমার নায়ক— কে এগিয়ে?‌
সুমন: এটা তো নায়কেক ওপর নির্ভর করে। যেমন দেব, প্রসেনজিৎ বা জিৎ— সিনেমা চলে এঁদের নামে। কিন্তু সিরিয়ালের ব্যাপারটা আলাদা। সেটা কিন্তু হিরোদের নামে চলে না। বরং সেখানে চরিত্রের নামেই হিরোরা পরিচিত হয়ে যান। ছবিতে হিরোই সব। সিরিয়ালে আবার গল্পই মূল। টানটান গল্প না হলে টিকে থাকা কঠিন। সিনেমা তো হিরোর নামে দেখতে যান মানুষ। আর সিরিয়ালে হিরোর নিজের নামটা হারিয়ে যায়। চরিত্রের নামই তার নিজস্বতা হয় দাঁড়ায়।
 সিরিয়ালের নায়ক থেকে সিনেমার নায়ক হওয়া কতটা শক্ত?‌
সুমন: ‌টেলিভিশনের অভিনয়ের ধরন আর বড় পর্দার অভিনয়ের প্রণালী দুটো তো সম্পূর্ণ আলাদা। তবে টেলিভিশন থেকে বড় পর্দার নায়ক অনেকেই হয়েছেন। জিৎ, রাহুল, অনির্বাণ ভট্টাচার্যর মতো অনেকেই আছেন। আবার অনেকে টেলিভিশনে ফিরেও এসেছেন। লড়াই তো অবশ্যই আছে। কিন্তু কতটা কষ্টসাধ্য, সেটা ততদিন বলতে পারব না, যতদিন না আমি নিজে ফিল্মস্টার হচ্ছি!‌ তবে এটা বলতে পারি যে, টেলিভিশন থেকে বড় পর্দায় গেলে অভিনয়ের দক্ষতা অবশ্যই বাড়ে। পাশাপাশি বড় পরিচালক এবং প্রযোজকদের নজরেও পড়া যায়।
 টেলিভিশনের সিরিয়ালগুলো যে ধরনের গল্প দেখাচ্ছে তাতে সমাজের ওপর সত্যিই কি কোনও ভাল প্রভাব পড়ছে?‌
সুমন: ‌ভাল–খারাপ দুটোই আছে। একদিকে যেমন দুটো–তিনটে বিয়ে, পরকীয়া, অবৈধ প্রেম, হিংসা, খুনখারাবি দেখানো হচ্ছে, তেমনই রানি রাসমণি, নেতাজি, বামাক্ষ্যাপা, লোকনাথের মতো সিরিয়ালও তো হচ্ছে। এতে তো লোকশিক্ষার উপাদান রয়েছে। ভাল–খারাপ সবটাই নির্ভর করে মানুষের বেছে নেওয়ার ওপর। 
 টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রির দড়ি–টানাটানির শিকার কতটা হলেন?‌
সুমন: ‌আমি খুব একটা বেশি লাইম লাইটে থাকি না। পার্টি করি না। রাতভর হইহল্লায় মাতি না। হোটেল, ক্লাব, ডিস্কোয় যাতায়াত করি না। উঁচুদরের লোকজনের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষিও করি না। শুটিং শেষ হলেই বাড়ি ফিরে যাই। খাই–দাই, ঘুমিয়ে পড়ি। লো প্রোফাইলে থাকতেই পছন্দ করি। কারণ, আমি জানি একমাত্র অভিনয়ই আছে যেটা আমাকে টিকিয়ে রাখব। তাই সেটাতেই মন দিই। ওটা নিয়েই ভাবনাচিন্তা করি প্রতিনিয়ত। তবে আমার এই লো প্রোফাইলে থাকাটা অনেকের আলোচনার বিষয় হয়ে যায়। কেউ কেউ ভাবতেই পারে না একজন অভিনেতা এভাবে নিজেকে আলোর ঝলকানি থেকে সরিয়ে রাখতে পারে। তারা বলে—‘‌একটু খবর নাও তো। ওর নিশ্চয়ই অন্য কোনও গোপন ব্যাপার আছে!‌’‌ (হাসি)

জনপ্রিয়

Back To Top