কোনও শিল্পীরই আধুনিক গান তুমুল জনপ্রিয় হচ্ছে না

পঙ্কজ মল্লিক, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়রা সে যুগে সাধারণের মধ্যে রবীন্দ্রসঙ্গীত ছড়িয়ে দেওয়ার যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, আপনি নাকি এখন সেই ভূমিকায়?‌
‌জয়তী চক্রবর্তী: সেই ভূমিকায় কিনা জানি না। তবে নিজের মতো করে চেষ্টা করছি। আমি সবসময় পারফরমেন্সকেই গুরুত্ব দিই। মানুষের কাছে পৌঁছতে এটাই সবথেকে ভাল উপায় বলে আমার বরাবর মনে হয়েছে। কিন্তু অনুষ্ঠান করতে গিয়ে দেখেছি, যাঁরা রবীন্দ্রনাথের গান করেন, তাঁরা বিশেষ কয়েকটা চেনা গানের মধ্যেই ঘোরাফেরা করেন। কারণ, মঞ্চে শিল্পীর কাছ থেকে শ্রোতারা বহুশ্রুত গানই শুনতে চান। বহুশ্রুত কয়েকটা গানের সঙ্গেই হয়তো মানুষ নিজের অনুভূতিকে মেলাতে পারেন। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, সেসব গানের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের অল্পশ্রুত গানগুলিও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া শিল্পীর দায়িত্ব। এই চেষ্টাটা চালিয়ে যাওয়া খুব দরকার। শিল্পী হিসেবে শ্রোতাকে নতুন কিছু দেওয়াও তো কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। সেটা গ্রহণযোগ্য হতেও পারে, না–ও পারে। তাই বলে ভাবনাটা ছেড়ে দেওয়াও কাজের কথা নয়। 
 কিন্তু শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে হলভর্তি শ্রোতাও তো এখন ইতিহাস!‌ যেমনটা হত পীষূষকান্তি সরকারের সময়।
‌জয়তী: কোনও কোনও শিল্পীর একটা এক্স ফ্যাক্টর থাকে। পীযূষকান্তির হয়তো সেটা ছিল। তার জন্য রবীন্দ্রনাথের গানের গুণগত মানের ওপর প্রশ্ন তোলা ঠিক নয়। পীযূষকান্তি সেই সময়ে একটা ভিন্ন ধারার জন্ম দিয়েছিলেন। ওইরকম ধারার প্রবর্তনকারী সেই সময়ের আগেও আসেনি, পরেও আসেনি। তাই তাঁর গান নিয়ে উন্মাদনাটা সেই সময়ের জন্য অত্যন্ত স্বাভাবিক। তবে সার্বিকভাবে রবীন্দ্রনাথের গান শোনা বা রবীন্দ্রনাথের গানের অনুষ্ঠানের সংখ্যা কিন্তু বেড়েছে। হতে পারে হল ভর্তি করার সাঙ্ঘাতিক ঝুঁকিটা হয়তো কোনও শিল্পী বা কোম্পানির তরফে সেভাবে নেওয়া হয় না। কারণ, বিনোদনটা এখন আর মানুষের খুব একটা প্রয়োজনীয় বিষয় নয়। তাছাড়া, এখন গান শোনার এত মাধ্যম যে টিকিট কেটে অনুষ্ঠান দেখার ইচ্ছেও সেভাবে আর নেই। 
 তাহলে কি বিশ্বভারতীয় ঘেরাটোপ থেকে মুক্ত হয়েও রবীন্দ্রসঙ্গীতের সার্বিক মুক্তি ঘটেনি?‌
‌জয়তী: যে মানুষটির সৃষ্টি অবিনশ্বর, তাঁর কাজ ঘিরে কাটাছেঁড়া তো হবেই। কিন্তু তাতে রবীন্দ্রনাথের কিচ্ছু যায় আসে না। রবীন্দ্রগানের গায়ে একটি আঁচড়ও পড়ে না। ‘‌রবার যেটা সেটাই রবে’‌। মনুষ্যজাতি যতদিন থাকবে, রবীন্দ্রনাথের গানও ততদিন থাকবে। ভাল এবং খারাপ— সব ধরনের কাটাছেঁড়াই চলবে। মানুষ যেটা গ্রহণ করবেন সেটাই টিকে যাবে। 
 আপনি বহু সিনেমায় রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছেন। চিত্রনাট্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং মঞ্চ বা অ্যালবামের রবীন্দ্রসঙ্গীতের মধ্যে তফাত কতটা?‌
‌জয়তী: বিস্তর তফাত! চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে অনেক সময় পূজা পর্যায়ের গানকেও প্রেমের গান হিসেবে তুলে ধরা হয়। আবার প্রেমের গানকে অনেক ক্ষেত্রে স্বগতোক্তির মতো ব্যবহার করা হয়। এটা আমার বেশ লাগে। কারণ, কোনও একটি গান আমি যেভাবে ভেবেছি, যেভাবে শিখেছি বা যে  দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করেছি, সেটাই যখন সিনেমায় গাইছি তখন একটা চরিত্রের মধ্যে তাকে গেঁথে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তাতে নিবেদনটা নষ্ট হয়ে যায় না। তার মাধুর্যটা বদলায়। এভাবে একটা গানকে ভিন্নরূপে দেখতে পাওয়াটা আমার কাছে আবিষ্কারের মতো। 
 সব ধরনের গান গাইলেও জয়তী চক্রবর্তী মানেই শ্রোতার কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী। তাহলে কি অন্য ধরনের গানে কোথাও ফাঁক থেকে গেছে?‌ 
‌জয়তী: রবীন্দ্রগানে শ্রোতার কাছে আমার গ্রহণযোগ্যতা তুলনায় বেশি। অন্য গানে ফাঁক আছে কিনা ভাবিনি কখনও। রবীন্দ্রসঙ্গীত, লোকসঙ্গীত বা আধুনিক— একইরকম নিষ্ঠা নিয়ে গাইবার চেষ্টা করি। কিন্তু আমি যেহেতু আধুনিক লোকসঙ্গীতই মূলত করি, তাই যাঁরা সাবেকি ফোক ভালবাসেন, তঁাদের হয়ত সেভাবে ভাল লাগে না। আর আধুনিকের জন্য এই সময়টা একদম ঘেঁটে আছে। কোনও শিল্পীরই আধুনিক গান তুমুল জনপ্রিয়তা পাচ্ছে বলা যাবে না। 
 কিন্তু সেটারই বা কারণ কী?‌
‌জয়তী: মানুষকে শোনানোর জন্য যে প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন, সেটার এখন বড্ড অভাব। অ্যালবামের দিন শেষ। এফ এম চ্যানেলগুলো আর সেভাবে বাংলা গান শোনাচ্ছে না। মানুষ আধুনিক গান শুনবেন কোথা থেকে?‌ ইউটিউবে নতুন প্রজন্ম সাবলীল হলেও যাঁরা বয়স্ক, তাঁরা একেবারেই অভ্যস্ত নন। ইউটিউবে শুধু শোনা নয়, গান দেখানোটাও একটা বড় বিষয়। গানের সঙ্গে যে চিত্রায়ণ, সেটা দেখেই মানুষ সংশ্লিষ্ট গানের বক্তব্যের ব্যাখ্যা পাচ্ছেন। কানে শুনে নিজস্ব চিন্তার কোনও সুযোগ থাকছে না। এটা শ্রোতার ভাবনারও ওপরেও কিছুটা হস্তক্ষেপ করা বৈকি! এর ফলে বহুক্ষেত্রেই গানের মানের বালাই থাকছে না। আর তার বিরূপ প্রভাব পড়ছে শ্রোতার মনে। 
 তাহলে এই মুহূর্তে বাংলা গানের অবস্থাটা ঠিক কী?‌
‌জয়তী: কাজ তো নিরবচ্ছিন্নভাবেই হয়ে চলেছে। সৃষ্টি তো কখনও থেমে থাকে না। বেশ কিছু ভাল কাজও হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দায়িত্ব হল, সেগুলো যাতে মানুষের কাছে পৌঁছয়, সেই মাধ্যমগুলো আরও প্রসারিত করা। বাংলা গানে অবশ্যই নতুন কিছু হবে।
 রিয়্যালিটি শোগুলো কি সেই নতুন কিছুর পথ দেখাচ্ছে?‌
‌জয়তী: আমার মনে হয় না। সাময়িক নামযশ, রোজগারপাতি বৃদ্ধি, সাময়িক হৈচৈ ছাড়া আর কিছু হয় না রিয়্যালিটি শো থেকে। এটা দীর্ঘমেয়াদী নয়। ইতিহাস তা প্রমাণ করে দিয়েছে।

জনপ্রিয়

Back To Top