সম্রাট মুখোপাধ্যায়: গোদারের প্রথম ছবি করার কারণটি ভারি অদ্ভুত!‌ তখন গোদার প্যারিস, তাঁর কাফে–সমূহ, বন্ধুদের সঙ্গে ভারী আড্ডা, সাঁত্রের সান্নিধ্য, এবং তাঁর প্রাণের কাগজ ‘‌কাইয়ে দ্যু সিনেমা’‌ থেকে বহু দূরে। সুইৎজারল্যান্ডে, চাকরি করছেন। এক বাঁধ নির্মাণ সংস্থার চাকরি। আর সে চাকরি করতে –করতেই গোদারের প্রথম ছবি বানানো, বিষয় ওই বাঁধ নির্মাণ। নাম ‘‌অপারেশন বেটন’‌, ১৭ মিনিট দৈর্ঘ্যের এক তথ্যচিত্র।
সালটা ১৯৫৩। গোদার সুইৎজারল্যান্ড যেতে বাধ্য হলেন। কারণ অর্থাভাব। সেই সময় তাঁদের পারিবারিক মাসোহারা বন্ধ হয়ে গেছে। সুইৎজারল্যান্ডেই একটা কাজ পেয়েছিলেন আগের বছর। একটি টেলিভিশন কোম্পানির কাজ। বাবা ছিলেন চিকিৎসক। তিনি সুইৎজারল্যান্ডে বদলি হয়ে যান, প্যারিসে গোদার জন্মানোর এক বছরের মধ্যে। ফলে গোদারের সুইস নাগরিকত্ব ছিল। পরে আবার তিনি প্যারিসে ফিরে আসেন ১৯ বছর বয়েসে ‘‌জাতিতত্ত্ব’‌ নিয়ে সরবর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে। যেখানে এসে তাঁর ত্রুঁফো, রোমার, রিঙেত, শ্যাব্রলদের সঙ্গে দোস্তি। যাঁরা গোদারের সঙ্গে মিলে ফরাসি সিনেমার বিখ্যাত সেই ‘‌পঞ্চ পাণ্ডব’‌। যাঁদের হাতে তৈরি হবে বিশ্ব–সিনেমার এক বড় মোড় বদল ‘‌ন্যুভেল–ভাগ’‌ বা ‘‌নবতরঙ্গ’‌। 
চুরির দায়ে লক আপ
টিভি–র চাকরিটা করছিলেন গোদার। পরবর্তীতে টিভি–র প্রতি তাঁর যে প্রবল আকর্ষণ, তিনি যে মনে করতেন সিরিজ ছবি বা ‘‌সিরিয়াল’‌–এর ক্ষমতা অপরিসীম। তাঁর জন্ম সম্ভবত‌ এখান থেকেই। কিন্তু এ’‌কাজ বেশিদিন করা হল না তাঁর। এখান থেকে বিতাড়িত হলেন টাকা চুরির দায়ে। পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তারও করেছিল!‌ চারদিন জেল খাটার পরে মুক্তি পান তিনি ডাক্তার বাবার প্রভাবে। এরপর কিছুদিন মানসিক চিকিৎসাও চলে তাঁর। এর আগেও একবার চুরি করেছিলেন গোদার, তবে তা প্যারিসে দাদামশাইয়ের লাইব্রেরি থেকে দুষ্প্রাপ্য বই। উদ্দেশ্যও ছিল মহৎ, তা বিক্রি করে বন্ধু রিভেত–কে টাকা এনে দেওয়া সিনেমা বানানোর জন্য।
যাই হোক, তখন গোদার বাঁধ নির্মাণের দেখাশোনা করছেন। যা মাইনে পান, বেশিটাই খরচ হয় না। সেই জমানো টাকা খরচ খরতেই প্রথম ওই ছবি বানানো। সালটা ১৯৫৪। আর এরপরের বছরই বানালেন মোপাসাঁর গল্প থেকে ‘‌উনে ফেম কোকেত’‌ নামের ১০ মিনিটের কাহিনিচিত্র। শুরু হল মোটামুটি বছরে একটা করে ছোট ছবি বানানো।
ছবি করবেন ভাবছেন
গোদারের জন্ম প্যারিসে, ১৯৩০–এর ৩ ডিসেম্বর। আর সেই ছবির শহর, কবিতার শহরে ফিরেই গোদারের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি ‘‌ব্রেথলেস’‌ বানানো ১৯৬০–এ। যার চিত্রনাট্যের উৎস ছিলেন বন্ধু ফ্রাঁসোয়া ক্রুঁফো। যিনি তাঁর আগের বছরই ‘‌দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ’‌ বানিয়ে আলোচনার তুঙ্গে। বস্তুত বন্ধুদের মধ্যে গোদারই ছবি শুরু করেন শেষে। পরবর্তীতে এই ত্রুঁফোর সঙ্গেই তাঁর বন্ধুত্ব এই গাঢ়, এই বিচ্ছেদে পরিণত হয়। ত্রুঁফোর ‘‌ডে ফর নাইট’‌ দেখতে বসে বিরক্ত হয়ে উঠে যান গোদার। আবার গোদারের সিনেমায় রাজনীতির আধিক্য নিয়ে সমালোচনা করেন ত্রুঁফো। ‘‌ব্রেথলেস’–এর গল্পের কাঠামো রোমাঞ্চকর। ছবির নায়ক গাড়ি চুরি করতে গিয়ে পুলিশকে খুন করে ফেলে। তারপর তার সাংবাদিক বান্ধবী, যার বাড়িতে নায়ক আশ্রয় নিয়েছে, সেই তাকে ধরিয়ে দেয়। এ ছবি ভাল লেগেছিল সত্যজিৎ রায়ের। বলেছিলেন, ‘‌প্রেমের গল্প হয়েও গতানুগতিক প্রেমের গল্পের সঙ্গে এর কত তফাত।’‌ আর মৃণাল সেনের ‘‌ইন্টারভিউ’‌ দেখলে বোঝাই যায় ‘‌ব্রেথলেস’‌–এর ‘‌ট্রিটমেন্ট’ কতটা গ্রস্ত করেছিল তাঁকে। খুবই কম বাজেটে বানানো ‘‌ব্রেথলেস’‌ সুপারহিট হয়েছিল, নানান ধাক্কা ও চমক সত্ত্বেও। শোনা যায়, ছবির ‘‌প্রোডাকশন কস্ট’‌–এর ৫০ গুণ টাকা তোলে সর্বমোট এ’‌ছবি বাজার থেকে। কিন্তু বাজার আর তার অঙ্ক কোনওদিনই আটকে রাখতে পারেনি গোদারকে। তাঁর রাজনীতি আর ‘‌অ্যাটিটিউড’‌ই তাঁকে রাজা বানিয়েছে। তা না হলে এই বয়েসে এসেও নিয়ম করে ছবি বানান! গত বছর কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁর সাম্প্রতিকতম ছবি ‘‌দ্য ইমেজ বুক’‌ দেখতে নন্দনে দর্শক ভেঙে পড়ে। তা না হলে এই বয়েসে এসেও ‘‌অস্কার’‌ প্রত্যাখ্যান করেন।
আর তাঁর মেজাজ, দর্শন?‌ তাঁর কথায়, ছবির শুরু, মাঝখান, শেষ সব থাকে, থাকে না শুধু এগুলো ধারাবাহিকভাবে বলার দিব্যি। তাঁর পছন্দ সিনেমা হবে এক থেকে বড় জোর দেড় ঘণ্টা। তা, ‘‌ব্রেথলেস’‌ বানিয়ে দেখলেন আড়াই ঘণ্টা হয়ে গেছে। কী করলেন?‌ বসলেন, দেখলেন, পছন্দ হওয়া দৃশ্যগুলো গোটাটা রেখে বাকিটা ফেলে দিলেন!‌ এই হলেন গোদার। সিনেমার কালাপাহাড়, শোনা যাচ্ছে এই নব্বই ছুঁই ছুঁই বয়েসেও তিনি নতুন ছবি তৈরির প্রস্তুতি চালাচ্ছেন। নর–নারী সম্পর্ক নিয়ে। 
বাঙালি তাঁর সিনে–যাপনে চিরকালই গোদার–প্রেমী। শোনা যায় মজা করে রাধাপ্রসাদ গুপ্ত তাঁকে বাংলার ‘‌অদৃততম’‌ পরিচালকই বলতেন। সেই গোদার–উদ্‌যাপনে এবারের বইমেলায় ‘‌চলচ্চিত্র চর্চা’‌ পত্রিকা সংখ্যা বের করল গোদারকে নিয়ে। সম্পাদক বিভাস মুখোপাধ্যায়–এর সংখ্যাজুড়ে নতুন–পুরনো দু’‌ডজন লেখা। সেখানে এই পূর্ণেন্দু পত্রী তো ওই সুবিমল মিত্র। আর গোদারের ছ’‌ছ খানা সাক্ষাৎকার কথামৃত। ফলে এখন উৎসবের চত্বরে তা নিয়ে কাড়াকাড়ি।  ‌  ‌

জনপ্রিয়

Back To Top