অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: কবে সিনেমা হলের দরজা খুলবে, এটা এখনও অনিশ্চিত। কিন্তু করোনা–সন্ত্রাস এবং প্রবল ঘূর্ণিঝড় আমফানের দাপট সামলাতে না পেরে রাজ্যে যে আরও বেশ কিছু সিনেমা হল চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে, এ নিয়ে কোনও সংশয় নেই সিনেমা শিল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বহু বিশিষ্ট মানুষের। এঁদের মধ্যে সিনেমা হলের মালিক আছেন, প্রযোজক আছেন, প্রযোজক সংগঠনের কর্তাব্যক্তিও আছেন। রাজ্যে সিঙ্গল স্ক্রিন সিনেমা হলের সংখ্যা কমতে কমতে প্রায় ২২০–তে এসে ঠেকেছে। সেই সংখ্যা আরও কমে গেলে বাংলা সিনেমা শিল্পের সমস্যা যে আরও বাড়বে, সন্দেহ নেই।
কবে খুলবে সিনেমা হল?‌ এ নিয়ে কোনও কিছুই বলতে পারছেন না মিনার–বিজলী–ছবিঘরের কর্ণধার সুরঞ্জন পাল কিংবা প্রিয়া সিনেমার মালিক অরিজিৎ দত্ত। প্রযোজকদের সর্বভারতীয় সংগঠন ফিল্ম ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ার প্রেসিডেন্ট ফিরদৌসুল হাসান বললেন, আমরা তো কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আবেদন করেছি ১৫ জুলাই থেকে যেন সিনেমা হল খোলার অনুমতি দেওয়া হয়। কেন্দ্রের অনুমতি পেলে তখন বিভিন্ন রাজ্য  পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে। উত্তর এখনও পাননি বলে জানালেন ফিরদৌসুল।
বাংলা ছবির অন্যতম প্রযোজক ও একটি সিনেমা হলের মালিক অতনু রায়চৌধুরি বললেন, ১৫ আগস্টের আগে সিনেমা হল খুলবে বলে মনে হচ্ছে না। ট্রেনই তো বন্ধ ১২ আগস্ট পর্যন্ত!‌
দক্ষিণ এবং উত্তর কলকাতায় গত কয়েক বছরে একটার পর একটা নামকরা সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে। দক্ষিণ কলকাতার উজ্জ্বলা, ভারতী, পূর্ণ–র মতো হল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও বিজলী, ইন্দিরা, বসুশ্রী কিংবা প্রিয়া সিনেমার মতো প্রেক্ষাগৃহ বেঁচে আছে। উত্তরের হাতিবাগান এলাকায় অধিকাংশ সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে। পুরনো নামকরা হলের মধ্যে টিকে আছে মিনার। আর আছে থিয়েটার থেকে সিনেমা হলে রূপান্তরিত স্টার।
মিনারের কর্ণধার সুরঞ্জন পাল বললেন, এভাবে টিকে থাকা খুব কঠিন। তাঁর মিনার, বিজলী, ছবিঘর মিলিয়ে সিনেমা হলের কর্মীসংখ্যা প্রায় ৫০। বললেন, জমানো টাকা থেকে এঁদের ৩ মাস বেতন দিচ্ছি। অন্য ব্যবসা আছে বলে সামাল দিতে পারছি। লকডাউনে সেই ব্যবসাও তো বন্ধ। কীভাবে চালাব তিনটে হল!‌
সুরঞ্জনবাবু তবু কর্মীদের বেতন দিচ্ছেন। কিন্তু অনেক হল–‌মালিকই অস্থায়ী কর্মীদের বেতন দিতে পারছেন না। টিকিট বিক্রি থেকে দর্শকদের বসানোর কাজে বহু অস্থায়ী কর্মী আছেন। তাঁদের অবস্থা এখন দুঃসহ। কেউ কেউ আনাজ বেচে কায়ক্লেশে সংসার চালাচ্ছেন। প্রিয়া সিনেমার মালিক অরিজিৎ দত্ত বললেন, শুধু হল চালিয়ে যে সব মালিক সংসার চালান, তাঁরা কোথা থেকে কর্মীদের বেতন দেবেন ?‌ অনেক হল তো এবার বন্ধ হয়ে যাবে। শুধু সিনেমা ভালবেসে কি পেট ভরবে?‌ অরিজিৎ মনে করেন, রাজ্যে সিঙ্গল স্ক্রিনের সংখ্যা ২২০ থেকে ১৭৫–‌এ নেমে আসবে।
অতনু রায়চৌধুরির সিনেমা হল ‘‌বারুইপুর শো হাউস’‌। বললেন, আমফানে আমাদের সিনেমা হলের চাল উড়ে গেছে। সারাতে লাখ চারেক খরচ। আমফানে বহু সিনেমা হল ক্ষতিগ্রস্ত। কোথাও চাল উড়ে গেছে, কোথাও গাছ পড়ে দেওয়াল ভেঙে গেছে। সিনেমা হলই যে সব মালিকের উপার্জনের একমাত্র ভরসা, তাঁরা কী করে এই ক্ষতি সামলাবেন?‌ প্রশ্ন অতনুবাবুর। তাঁরও সংশয়, আবার হয়তো বেশ কিছু সিঙ্গল স্ক্রিন সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাবে এখানে।
ইম্পার পিয়া সেনগুপ্ত বললেন, এখন প্রায় ২২০টা সিঙ্গল স্ক্রিন এই রাজ্যে। তাঁরও আশঙ্কা, আরও কিছু সিনেমা হল বন্ধ হতে পারে। সুরঞ্জনবাবু বললেন, শুধু তো কর্মীদের বেতন নয়, হলের ইলেকট্রিক বিল আছে, ট্যাক্স আছে। এছাড়া, আধুনিক ইউএফও মেশিন এই লকডাউনেও প্রতিদিন তিন ঘণ্টা চার্জ দিয়ে চালু রাখতে হয়েছে। এরপর সিনেমা হল খুললে স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্যানিটাইজ করা, নানা ব্যবস্থার খরচও কম হবে না। কিন্তু টিকিটের দাম বাড়ানোও অসম্ভব।
অতনু রায়চৌধুরি প্রযোজিত ছবি ‘‌টনিক’‌ তৈরি হয়ে আছে। নায়ক দেব। পুজোয় রিলিজ করছেন?‌ প্রশ্ন করতেই বললেন, কবে হল খুলবে, সেটাই অনিশ্চিত। পুজো তো এসেই গেল। সব কিছু ঠিকঠাক হলে, ২৫ ডিসেম্বর রিলিজ। আগে হল খুলুক।
 

জনপ্রিয়

Back To Top