সিনেমার শিশুশিল্পী থেকে টেলিভিশনে ধারাবাহিকের দাপুটে অভিনেতা। দীর্ঘ তঁার যাত্রাপথ। তার বঁাকে বঁাকে চড়াই–উতরাইয়ের কথা শুনলেন লোপামুদ্রা ভৌমিক

ছোটবেলায় কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে জনপ্রিয়তা পেলেন। বড় হওয়ার পর আর মূল চরিত্রে সুযোগ এল না। কেন?‌
অরিন্দম গাঙ্গুলি: ‘‌হংসরাজ‘‌ ছিল আমার ষোল নম্বর ছবি। পাঁচ বছর বয়স থেকে সিনেমায় অভিনয় শুরু করি। ‘‌মাদার’‌ও গোল্ডেন জুবিলি হয়েছিল। সেখানে শর্মিলা ঠাকুরের ছেলের চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। কিন্তু ‘‌হংসরাজ’‌–এর সাফল্যে সেটা চাপা পড়ে যায়। পরবর্তীকালে বেশকিছু ছবিতে আমাকে নায়ক করা হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো সাফল্য পায়নি। কারণ, তখন বাংলা ছবি ক্রমে নাচাগানা নির্ভর হয়ে উঠছিল। যেখানে আমাকে মানাত না। এরপর আমার শ্বশুরমশাই জোছন দস্তিদার আমাকে ধারাবাহিকে নিয়ে এলেন। প্রথম অভিনয় ‘‌সেইসময়’–এ। ওই ধারাবাহিকের জনপ্রিয়তাই আমাকে মাষ্টার অরিন্দম থেকে অরিন্দম গাঙ্গুলি হতে সাহায্য করেছিল। এরপর টেলিভিশনে একের পর এক ধারাবাহিকের মূল চরিত্রে অভিনয় করতে শুরু করলাম। ফলে আস্তে আস্তে ধারাবাহিকের শিল্পী হয়ে গেলাম। যদিও ছবির কাজও পাশাপাশি সমানতালেই করে গিয়েছি। 
 পরবর্তীকালে তো অন্যধারার ছবি মূলধারা হয়ে গেল। সেখানে তো নাচাগানা নেই। সেখানেও সুযোগ এল না কেন?‌
অরিন্দম: এসব ছবির পরিচালকরা হয়তো আমায় বন্ধু মনে করেন না। তবে কারও বদান্যতা ছাড়াই আমি নিজের জগৎ তৈরি করে নিয়েছি। ‘বামাক্ষ্যাপা’ থেকে ‘‌ভানুমতির খেল’‌–এর ম্যাজিশিয়ান মহেন্দ্র সরকার— বারে বারে ইমেজ ভেঙে প্রমাণ করে দিয়েছি অভিনয়টা আমি পারি। তাই কেউ ডাকল কি ডাকল না, তাতে সত্যিই কিছু যায় আসে না।
 ধারাবাহিকের শিল্পী হয়ে যাওয়ায় কোনও কষ্ট লুকিয়ে নেই?‌
অরিন্দম: একটা সময় খারাপ লাগত। কারণ, আমার কেরিয়ারের শুরু ছবি দিয়ে। সেটাই আমার প্রথম পছন্দ। তাই মনে হয় ছবিতে আমার হয়ত আরও কিছু দেওয়ার ছিল। অতীতের পরিচালকরা যাকে যে চরিত্রে মানাবে, তাকে সেই চরিত্রের জন্যই বাছতেন। পরবর্তীকালে পিআর–টা পার্ট পাওয়ার জন্য বড় ফ্যাক্টর হয়ে দেখা দিল। যারা বেশি ধরা–করা করতে পারবে, এক গ্লাসের ইয়ার হবে, তারাই ভাল চরিত্র পাবে। কাজ আর সুযোগ তৈরি হয় মদের আসরেই। এটা আমি কোনওদিনই পারিনি। আর পারবও না। 
 রবীন মজুমদারের পর গায়ক–নায়ক কম্বিনেশন আপনার মধ্যে ছিল। সেটাও তো দেখা যাচ্ছে কাজে লাগল না।
অরিন্দম: এক্ষেত্রেও ধারাবাহিকই আমাকে সুযোগ করে দিয়েছে। বহু ধারাবাহিকে আমি চরিত্রের মধ্যেই গান গেয়েছি। বামাক্ষ্যাপাতে আগেভাগেই গান রেকর্ড হয়ে যাওয়ায় পুরো গান গাইবার সুযোগ ছিল না। কিন্তু অন্যান্য ধারাবাহিকে আমার চরিত্রে গান থাকলে সে গান আমি নিজেই গেয়েছি। 
 ধার্মিক চরিত্রে অভিনয় করলেই গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়কে অনুকরণের প্রবণতা আসে। আপনিও কি তাই করেছিলেন?‌
অরিন্দম: ওঁর ছায়া থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছি বলেই তো এতটা সাফল্য পেয়েছি। গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘রামকৃষ্ণ’ মানুষের মনে গেঁথে আছে। ওঁকে নকল করার চেষ্টা করলে আমি কখনও সফল হতাম না। একটা অনুপ্রেরণা তো নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু অভিনয়টা নিজের মতো করেই করার চেষ্টা করেছি। স্বাতন্ত্র দেখিয়েছি বলেই তো এত বছর ধরে আমার অভিনীত বামাক্ষ্যাপাকে মানুষ এত ভালবেসেছেন।
 জোছন দস্তিদারের সময় চার্বাকের নাটকের মূল সুর ছিল মূলত রাজনৈতিক টানাপোড়েন। পরবর্তীকালে আপনারা সেই ধারা থেকে সরে এলেন। কেন?‌ চাপের কাছে নতি স্বীকার?‌
অরিন্দম: চাপ তো নিশ্চয়ই! আর্থিক চাপ। তখন চার্বাকের টালমাটাল অবস্থা। প্রচণ্ড আর্থিক সমস্যা। সেই সময় সঙ্গতি ফেরাতেই ‘‌চল পটল তুলি’‌ প্রযোজনার সিদ্ধান্ত। চার্বাক ‘‌চল পটল তুলি’‌র মত নাটক করবে, এটা ছিল অভাবনীয়। অনেক সমালোচনা হয়েছে। আসলে প্রচলিত ধারণা ছিল, নাটক মানেই বড়দের। ফলে নাটকের দর্শকও সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছিল। যখন ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষ নাটক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন, এবং নাটকে চটজলদি জনপ্রিয়তা ধরতে অশ্লীল শব্দের ব্যবহার হচ্ছিল, ‘‌চল পটল তুলি’‌ তখন সব বয়সী দর্শককে একসঙ্গে হল–এ বসিয়ে নাটক দেখাতে সক্ষম হল। শিবরাম চক্রবর্তীর সাত–আটটা আলাদা গল্প একসঙ্গে গেঁথে এই নাটকটা করেছিলাম। নাটকটা তুমুল জনপ্রিয় হল এবং চার্বাক ঘুরে দাঁড়াল। এরপর তো একের পর এক সফল নাটক। ‘‌অপ্সরা থিয়েটারের মামলা’‌, ‘‌দুধ খেয়েছে ম্যাও’‌, ‘‌চিটেগুড়’‌, ‘‌এখন তখন’‌, ‘‌শিরোনাম’‌ বা সাম্প্রতিক ‘‌ভীতি ও শুভেচ্ছা’‌।  এইসব নাটকের মধ্যে রাজনৈতিক মতবাদ তো রয়েছেই। ‘‌চল পটল তুলি’‌–ও তো চূড়ান্ত পলিটিক্যাল স্যাটায়ার। ‘‌দুধ খেয়েছে ম্যাও’‌তেও ছিল। কিন্তু হাসির মোড়কে। চার্বাক এখন সফল একটি দল। নিজের যোগ্যতায় একের পর এক মঞ্চসফল নাটক করছে। কোনও রকম গ্রান্ট বা আর্থিক আনুকূল্য ছাড়াই। 
 গ্রান্ট বা অনুদান এসে কি বাংলা থিয়েটারের সত্যিই কোনও উন্নতি করছে?‌
অরিন্দম: গ্রান্টের টাকা পাওয়ার পর বছরে নির্দিষ্ট কিছু প্রোডাকশন করতে হয়ই। ফলে যেটা হওয়ার সেটাই হচ্ছে। মাঝে বেশ কিছুদিন গ্রান্ট বন্ধ ছিল। তাতে কিছু থিয়েটার দলের প্রায় নাভিশ্বাস উঠে গিয়েছিল। অনুদান–নির্ভরতা থাকলে এটা হবেই। একসময় তো গ্রান্টের ব্যাপার ছিল না। তখনও ভাল থিয়েটার হত। অনুদান– নির্ভরতা বোধহয় বাংলা থিয়েটারকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। হয়তো আর্থিক কারণে আমাদেরও কখনও অনুদানের পথে হাঁটতে হবে। কিন্তু এখনও চার্বাক নিজের খুঁটির জোরেই ভাল থিয়েটার করছে। 
 এতদিনের কেরিয়ার অরিন্দম গাঙ্গুলির। জাতীয় পুরস্কার তবু অধরাই থেকে গেল। কষ্ট হয় না?‌
অরিন্দম: প্রত্যেকেই পুরস্কার আশা করে। যদি বলি, জাতীয় পুরস্কার প্রত্যাশাই করিনি, তাহলে মিথ্যে বলা হবে। কিন্তু এটাও সত্যি যে, মা তারা সবটা সবাইকে দেন না। আমি দর্শকের এত পুরস্কার পেয়েছি, যে সেই পাওনাটাই সব খামতি মুছিয়ে দিয়েছে।

জনপ্রিয়

Back To Top