শিষ্যকে প্রশ্নোত্তরে ধরলেন লোপামুদ্রা ভৌমিক

 

সঙ্গীতবিশারদ বাবাকে দেখেই কি এই বিষয়ে আগ্রহ?‌
দেবজ্যোতি মিশ্র: বাবার কাছেই আমার সঙ্গীতে হাতেখড়ি। তবে বড় হয়ে গানবাজনা নিয়েই পথ চলব, এমন কিছু ভাবনাচিন্তাতেও ছিল না। যেহেতু দেশভাগের পরে বাবা–মা এ দেশে এসেছেন, তাই মোটামুটি স্ট্রাগল করতে করতেই অর্ধেকটা সময় চলে গেছে। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে কেরিয়ার নিয়ে ভাবার মত অবসর খুব একটা ছিল না। বাবা গানবাজনা করতেন। স্বাভাবিকভাবে ওঁর কাছেই বেহালা, গিটার, পিয়ানো, ওয়েস্টার্ন ক্ল্যাসিক্যাল শিখেছিলাম। কিন্তু পেশাগতভাবে গান বেছে নেব এই ধ্যানধারণা মাথাতেও আসেনি।
 সেই ধ্যানধারণার বীজ কি সলিল চৌধুরী বুনে দিলেন?‌
দেবজ্যোতি: একদম! সলিল চৌধুরী আমার জীবনে শুধু সঙ্গীতই দেননি। তিনি আমার জীবনের আলো। আলো সর্বব্যাপী। তা গোটা জীবনে ছড়িয়ে থাকে। সলিলদা আমার কাছে ঠিক তেমন। তিনি আমাকে বুঝিয়েছিলেন জীবনের সারমর্ম। সেটা হল, গানবাজনাটাই সবকিছু নয়। জীবন অনেক বড়। জীবন গানবাজনাকে সঙ্গে নিয়েও পথ চলতে পারে। গানবাজনা ছাড়াও টিকে থাকতে পারে। এই বোধে সলিল চৌধুরী আমাকে দীক্ষিত করেছেন। 
 রবীন্দ্রনাথকে একদিকে রাখলে গান লেখা, সুর করা এবং গাওয়া —এই থ্রি ইন ওয়ান কম্বিনেশনের পুরোধা সলিল চৌধুরী। তাঁর শিষ্যকে এই ধারায় সেভাবে পাওয়া গেল না কেন?‌
দেবজ্যোতি: আমার লেখা প্রচুর গান রয়েছে। সেগুলো যথেষ্ট জনপ্রিয়ও। কিন্তু শ্রোতারা সেগুলো আমার লেখা বলে জানেনই না। ‘‌আমি তোমার সাথে একলা হতে চাই’‌, ‘‌আমার দক্ষিণ খোলা জানলা’‌, ‘‌মেঘের পালক চাঁদের নোলক’‌—এরকম অসংখ্য গানের গীতিকার আমি। মহীনের ঘোড়াগুলির পরে যে ‘‌বাইসাইকেল’‌ সেটা আমার লেখা, আমার সুর। মণিদা মানে গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের অসম্ভব ভাললাগার গান ছিল সেটা। দারুণ খুশি হয়েছিলেন। পরবর্তীতে রূপম নতুনভাবে গানটা গেয়েছেন। পরিচালক অতনু ঘোষের নতুন ছবি ‘‌বিনিসুতো’‌র দু’‌টো গান আমার লেখা। অনীক দত্তর ‘‌মেঘনাদবধ রহস্য’‌র দু’‌টো গানও আমার লেখা ছিল। 
 এত জনপ্রিয় গান। তবু মানুষ গীতিকার হিসেবে চিনল না!‌
দেবজ্যোতি: যখন এই জগতে প্রফেশনালি এলাম, তখন নিজেকে কেবল গান আর ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড সংয়ে সীমাবদ্ধ রাখলাম না। আমাকে প্রচুর বিজ্ঞাপনের কাজ করতে হয়েছে। একইসঙ্গে অন্য অনেকের কথায়–সুরে কাজ করতে হয়েছে। যেহেতু এতগুলো বছরে প্রচুর গীতিকারের সঙ্গে কাজ করেছি, তাই হয়তো আমার নিজের লেখাগুলো মানুষ ততটা আমার বলে জানেন না। 
 ‘‌অটোগ্রাফে’‌ আপনি সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন। কিন্তু নাম হল অনুপম রায়ের। খারাপ লাগেনি?‌
দেবজ্যোতি: এটা নিয়ে কোনও কথাই বলব না। যে যার মতো কাজ করছে। কাজ করবে। সময়ই বলে দেবে, কোন গান থাকবে আর কোন গান থাকবে না। কাজ করে যাওয়াটাই মূল কথা। অনুপম আমার বড় প্রিয় মানুষ। স্নেহের সম্পর্ক। 
 ঋতুপর্ণ ঘোষের বোধের সঙ্গে নিজের শিল্পীসত্ত্বাকে মেশাতে অসুবিধে হয়নি?‌ ওঁর মিউজিক সেন্স নাকি ততটা গভীর ছিল না?‌
দেবজ্যোতি: ঋতুপর্ণ রবীন্দ্রনাথকে আত্মস্থ করেছিলেন। আর রবীন্দ্রনাথের মধ্যে গোটা বিশ্বের সঙ্গীত মিশে রয়েছে। হয়তো সেভাবে সাঙ্গীতিক যোগসূত্র তৈরি করতে পারতেন না ঋতু। কিন্তু অন্তরের অন্দরে লালন করতেন এক বিরাট সঙ্গীতবোধকে। নইলে রেনকোট, তিতলি, মেমোরিজ ইন মার্চ–এ ওরকম লা–জবাব সঙ্গীতের ব্যবহার করতে পারতেন না। আর ‘‌চোখের বালি’‌ তো সর্বকালীন উদাহরণ। 
 আপনি অনেক সময় পুরনো গান, পুরনো সুরকে নতুন প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করেন। এটা সীমাবদ্ধতা না নস্টালজিয়ার টান?‌
দেবজ্যোতি: আমি বরাবর ঐতিহ্য এবং সমসাময়িক সময়কে একসঙ্গে গাঁথতে চাই। আমি আসলে একটা সেতু তৈরি করেছি। যেটা চিরন্তনতার বাহক। তবে আমি এখনও অনুশীলন করে চলেছি। কোনও একটা সময় হয়তো আমার কাজের মূল্যায়ণ হবে। 
 আপনি তো শুধুই অন্যধারার ছবির জন্যই কাজ করেন। তাহলে কি আপনার কাজ সব ধরণের দর্শকের জন্য নয়?‌
দেবজ্যোতি: আমার কাছে ছবিটা ছবিই। ধারা বিভক্তকরণটা আমি ঠিক বুঝি না। আমার ৪০ বছরের মিউজিশিয়ান জীবনে হিট গানের সংখ্যা অগুন্তি। সারা বিশ্বে কাজ করেছি। বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা তো আছেই। সঙ্গে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইরান এরকম অন্যদেশের বহু ছবিতেও কাজ করেছি। সেই গানগুলোও যথেষ্ট হিট। তাই আমাকে আগামীকালই একটা হিট গান দিতে হবে, এরকম কোনও চাপ আমার নেই। এখনও মিউজিক করতে ভাল লাগছে। করছি। যদি কখনও কোনওদিন মনে হয় ভাল্লাগছে না, ছেড়ে দেব। মিউজিক আমার কাছে এমন জিনিস নয়, যে সারাজীবন চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। মিউজিক আমার জীবনের সবটুকু নয়। এখন এতটাই অশান্ত এবং বাস্তুচ্যুত সময়ের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি, যে মনে হয় সময়ের প্রাসঙ্গিকতায় সঙ্গীতের অবস্থান ঠিক করাটা অত্যন্ত জরুরি। 
 সেই অবস্থান খুঁজতেই কি গান গ্রাম‌ তৈরির ভাবনা?‌
দেবজ্যোতি: ওটা আমার স্বপ্ন। জোকার পাশে গাজিপুরে দেড় একর জমিতে গান গ্রাম‌ তৈরি করছি। প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলেমেয়েদের  তো শহরে এসে গান শেখার সামর্থ্য থাকে না। আমার বাবা এবং সলিলদার শিক্ষাকে সঙ্গী করে মিউজিকের বোধকে গান গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চাই। সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে সারা ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলেমেয়েদের সেখানে রেখে সঙ্গীতশিক্ষা দেওয়া হবে। শহরে এসে গ্রামের গান–ভালবাসা ছেলেমেয়েগুলো যাতে হারিয়ে না যায়, সেজন্যই এই উদ্যোগ। আমার এক চিত্রশিল্পী বন্ধু মেহতাব আর আমি এই গ্রামটাকে নিয়ে স্বপ্নে বিভোর। আগামী অক্টোবর থেকেই শুরু হয়ে যাবে গান গ্রাম। আজকের মুমূর্ষু সময়ে দাঁড়িয়ে গান গ্রামই আমার সময়ের প্রতি শুশ্রূষা। 
 সেই শুশ্রূষায় কি গানের জনপ্রিয় রিয়্যালিটি শোগুলো কোনওভাবে আপনাকে সাহায্য করছে?‌
দেবজ্যোতি: রিয়্যালিটি শো কোনওদিন কিচ্ছু তৈরি করতে পারে না! দু’‌তিনজন যাঁরা রিয়্যালিটি শো থেকে উঠেছেন, তাঁরা ওই রিয়্যালিটি শো–তে কোনওদিন না গেলেও একইভাবে উঠে আসতেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, এই ধরণের শোগুলো আসলে গানের ক্ষতি করে দিচ্ছে।

জনপ্রিয়

Back To Top