সম্রাট মুখোপাধ্যায়: ‘‌স্বপ্ন যাঁরা দেখেন, স্বাধীনচেতা মানুষ যাঁরা, তাঁরা খুব ভাল অবস্থায় নেই। সঙ্ঘাতের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় তাঁদের। রাষ্ট্র অনেক সময়ই তাঁদের গলা চেপে ধরে।’‌ নিজের সাম্প্রতিকতম ছবি ‘‌উড়োজাহাজ’‌–‌এর প্রদর্শনের প্রাক্কালে সাংবাদিক সম্মেলনে এসে এ কথা বললেন পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। জানালেন, এ ছবি এক আদ্যন্ত স্বপ্নতাড়িত মানুষ আর তার সেই স্বপ্ন দেখার সঙ্কটের ছবি।
আর এর পরেই উৎসবের চতুর্থ সন্ধ্যায় নন্দনে ‘‌উড়োজাহাজ’‌ দেখতে বসে যেন এ কথারই প্রতিধ্বনি পাওয়া গেল। এ ছবির কেন্দ্রে আছে এমন এক মানুষ, বাচ্চু মণ্ডল, যে এক উড়োজাহাজ–‌এর প্রেমে পড়েছে। হঠাৎ খুঁজে পাওয়া এক উড়োজাহাজ, যা আসলে পরিত্যক্ত ‘‌ওয়ার এরোপ্লেন’‌। যা ব্যবহৃত হত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। কোনওভাবে তা একটি জঙ্গলের ভেতরে পড়ে এবং বহু বছর পরে তা খুঁজে পায় মোটর মেকানিক বাচ্চু মণ্ডল, যে আদতে একজন স্বপ্ন দেখা মানুষ। বাচ্চু (‌চন্দন রায় সান্যাল)‌ লেখাপড়া জানে না। কিন্তু তার সাধ সে ওই এরোপ্লেনটা জীবনে একবার আকাশে ওড়াবে। এই লক্ষ্যে শুরু হয় তার এরোপ্লেনের ইঞ্জিনের খোঁজ। এই পর্বে তার এই অদ্ভুত শখ ও খোঁজকে পরিচালক আনেন কমেডির ঢঙে। ব্যাপারটার মধ্যে খানিকটা চ্যাপলিন ঘরানার উপাদান যেন চলে আসে।
কিন্তু বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ছবি, আর তাতে বাস্তবতাকে ভাঙাটা বা ডিঙিয়ে যাওয়াটা থাকবে না, তা তো আর হয় না। বু্দ্ধদেব নিজেও জানান, তিনি তাঁর ছবিতে বাস্তবতাকে নানা মাত্রায় দেখতে চান। হয়তো সেটাই তাঁর ছবিতে কবিতার সঙ্গে চিত্রনাট্যের সেতুটা তৈরি করে। ওইদিনও তিনি সাংবাদিক সম্মেলনে জানান, ‘‌পৃথিবীতে এমন বহু পরিচালক আছেন, যাঁরা কবিতার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সিনেমা করেছেন, আবার এমনও বহু পরিচালক আছেন, যাঁরা কোনওদিন কবিতা পড়েনইনি। আমি নিজে কবিতা লিখি। কিন্তু ঠিক কোথায়, কীভাবে কবিতা আমার সিনেমায় ঢুকে পড়ে, তা বুঝতে পারি না। ওটা হয়ে যায় আর তাই হয়তো আমার ছবিকে অনুসরণ করা যায় না।’‌
‘‌উড়োজাহাজ’‌–‌এ কবিতা আছে। সরাসরি উচ্চারণে নয়। ছবির লিরিকাল মেজাজে। আর তা এসেছে মৃত্যুর ছোঁয়াকে বহন করে। এই যে উড়োজাহাজটাকে পায় বাচ্চু, বড় মমতায় তাকে সারাতে আর সাজাতে শুরু করে সে। প্রথমে রং করে। তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উড়োজাহাজের গায়ে ফুটে উঠতে থাকে নানা রকমের নকশা। বাচ্চুর আঁকা। আর এই পর্বে উড়োজাহাজকে সতীন ভেবে যেমন ক্রমশ বাচ্চুর (‌চন্দন রায় সান্যাল)‌ থেকে দূরে সরে যেতে থাকে তার বউ (‌পার্নো মিত্র)‌, তেমনই জঙ্গলের আলো–‌আঁধারিতে বাচ্চু আর এরোপ্লেনের চারপাশে বৈঠকি ভিড় জমায় প্রেতেরা। যারা প্রত্যেকেই কোনও বা কোনও দুঃখে বা অভাবে মরেছে। এই পর্বের ‘‌ম্যাজিক রিয়ালিজম’কে গাঢ় করতে, এমন একটি ‘‌ট্রিটমেন্ট’ ব্যবহার করেছেন বুদ্ধদেব, যা বোধহয় সিনেমায় এই প্রথম। বাচ্চু ও ভূতেদের কথোপকথনের মাঝে চলমান হয়ে ওঠে পশ্চাৎপটে থাকা গাছেরা!‌ কী দ্রুত এক অমোঘ ভাষায় পর্দার বাস্তবতাকে বদলে দেন তিনি!‌
চন্দন রায় সান্যালকে পরের ছবির জন্য আগাম বলে রেখেছেন বুদ্ধদেব। সাংবাদিক সম্মেলনে জানালেন, চন্দন বুদ্ধিমান অভিনেতা। উপরন্তু চন্দনের চেহারায় একটা সাদামাটা ব্যাপার আছে, যা এ চরিত্রের জন্য খুব প্রয়োজন ছিল। ছবি দেখতে বসেও বোঝা গেল চন্দন টোপ–‌এর পরে আবার এমন আলাদা ধরনের চরিত্রের জন্য কতটা অমোঘ ছিলেন অভিনয় ভাবনায়। বিষণ্ণতা আর বিস্ময়কে এক অদ্ভুত অনুপাতে মিশিয়েছেন চন্দন এ ছবিতে তাঁর অভিনয়ে।
‘‌আমি বিদেশের বাজারে যথেষ্ট সফল। দেশের বাজারেও আমার ‘‌মন্দ মেয়ের উপাখ্যান’‌–‌এর মতো কোনও কোনও ছবি অচিন্ত্যনীয় অর্থে বিক্রি হয়েছে। বহু পুরস্কারও পেয়েছি। তবু আমি তৃপ্ত নই। তাই আবার ছবি করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। ১৩ ডিসেম্বর মুক্তি পাচ্ছে ‘‌উড়োজাহাজ’‌। সেই পর্ব  মিটলেই নতুন ছবির কাজে হাত দেব।’‌ নিজের মেজাজে জানালেন বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। তারপর ওপরে নন্দনের প্রেক্ষাগৃহে চলে গেলেন নিজের ছবি দর্শকদের সামনে ‘‌ফরোয়ার্ড’‌ করতে। প্রসঙ্গত, এ ছবির বিষয়বস্তু তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন খবরের কাগজে বেরনো নিউজ এজেন্সির একটা ছোট্ট খবর থেকে।‌‌‌‌

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত ও চন্দন রায়সান্যাল। নন্দনে। ছবি:‌ বিপ্লব মৈত্র

জনপ্রিয়

Back To Top