(স্পষ্টই বললেন ‘কিরীটী‌’‌ ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত। মুম্বই থেকে কলকাতায় এলেন ‘বসন্ত রঞ্জনী‌’‌ অবলম্বনে তাঁর দ্বিতীয় কিরীটীর নীলাচল-‌কাণ্ডের প্রচারে। আপাদমস্তক পেশাদার ইন্দ্রনীল সাক্ষাৎকারেও ধারালো তাঁর চেহারার মতোই। কথা বললেন রাখঢাক না করেই। শুনলেন অদিতি রায়।)
 

• বাংলা ছবিতে বিবিধ গোয়েন্দার ভিড়ে কিরীটী কতটা প্রতিযোগিতার মুখে?‌
•• দেখুন, বাংলা সাহিত্যের সব গোয়েন্দারাই নিজস্বতা নিয়ে হাজির। সবাই স্বতন্ত্র। ধরুন ফেলুদা বা ব্যোমকেশ। দুজনেই ইউনিক। ধরণও ভিন্ন। ব্যোমকেশ অনেকটাই প্রাপ্তবয়স্কদের, আর ফেলুদা মূলত কিশোরদের জন্য হলেও, এখন ইউনিভার্সাল। সেরকমই শবর, অর্জুন, কাকাবাবু বা কিরীটী, সবাই স্বমহিমায় উজ্জ্বল। তাই ব্যক্তিত্বে কেউ কারুর প্রতিযোগী নয় বলেই আমি মনে করি। কিরীটীর মধ্যে যেমন পাশ্চাত্যের প্রভাব বেশি। একটু যেন সাহেবী ধরণের!‌ ফেলুদা, ব্যোমকেশ মগজাস্ত্রের ওপর বেশি নির্ভরশীল, কিরীটী শারীরিক ভাবে অনেক বেশি সক্রিয়। মাথার কাজ যেমন আছে, তেমনই অ্যাকশনেও কিরীটী সমান দক্ষ। 
• আপনি ছাড়াও বাংলায় আরও দু’‌জন কিরীটী চরিত্রে অভিনয় করেছেন। চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী এবং প্রিয়াংশু চ্যাটার্জী। এক্ষেত্রেও কি প্রতিযোগিতা নিয়ে ভাবেননি?‌
•• দেখুন, উনি আগে ‘‌কিরীটী’‌ করে ফেলেছেন, তিনি আগে করে ফেলেছেন, এসব ভাবনা তখনই আসে, যখন ছবি চলেনা!‌ একই বিষয় নিয়ে দশজন ছবি বানিয়ে ফেললেন, বা একই চরিত্রে দশজন অভিনয় করে ফেললেন, এতে কিছু আসে যায়না যদি আপনার ছবিটা ভাল হয়। ভাল না হলে দশহাজার অজুহাতও থাকে!‌
• পরিচালক অনিন্দ্যবিকাশের মতে আপনিই একমাত্র অভিনেতা, যাঁর সঙ্গে নীহাররঞ্জন গুপ্তর কিরীটীর বর্ণনা একেবারে মিলে যায়। আপনি কী বলবেন?‌
•• হ্যাঁ, অনিন্দ্যদা আমাকে এটা বলেছেন। ব্যাকব্রাশ চুল, লম্বা, চশমা পরা নীহাররঞ্জনের চেহারাটাও এরকমই, তাই সচেতন ভাবে হোক বা অসচেতন ভাবে, কিরীটীর চেহারাটাও এভাবেই ডিজাইন করেছেন লেখক। ব্যাকব্রাশ তো করেই নেওয়া যায়, তাছাড়াও আমার চেহারাটা এবং ইমেজটাও নাকি অনেকটা ওরকমই (হাসি‌)।‌
• কিরীটী পড়েছেন?‌
•• ‘‌কালো ভ্রমর’‌ পড়েছিলাম। প্রথমবার কিরীটী চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে মনে হয়েছিল, জেনে নেওয়া দরকার। তবে এই গল্পটা (বসন্ত রঞ্জনী‌)‌ পড়িনি। পুরোটাই চিত্রনাট্যের ওপর নির্ভর করেছি। আসলে প্রথমবার জেনে নেওয়া প্রয়োজন ছিল কিরীটীর বৈশিষ্ট্য কী কী। 
• কিরীটী হয়ে ওঠার প্রস্তুতি কেমন ছিল?‌
•• আমি সবসময়ই ‘ডিরেক্টরস অ্যাক্টর‌’‌। পরিচালক যেমনটা চান আমি তেমনটাই করি। ‘নীলাচলে কিরীটী‌’-‌তে‌ তো আমি কিরীটী হয়েই উঠেছিলাম, কাজেই আলাদা করে কিছু করিনি। প্রথমবার অবশ্যই অনিন্দ্যদা’‌র সঙ্গে বসে ‘‌লুক’‌ কীরকম হবে, কীভাবে কথা বলব বা শারীরিক ভাষা কেমন হবে, সেটা আলোচনা করে নিয়েছিলাম। কোনও ওয়র্কশপ করতে হয়নি। কিরীটীকে বুঝতে চেষ্টা করেছিলাম। তাতে আমার মনে হয়েছিল কিরীটী কোনও পরিস্থিতিতেই আবেগ নির্ভর নয়। বরং কিছুটা নির্লিপ্ত, নিস্পৃহ। সব বিষয়কেই বস্তুগত দূরত্ব থেকে নজর করাই কিরীটীর বৈশিষ্ট্য। এই পেশাদারিত্বটাই আমি আনতে চেষ্টা করেছি। সেটা কাজে দিয়েছে বলেও আমার ধারণা। 
• পরিচালক অনিন্দ্যবিকাশ বা প্রযোজক রূপা দত্তর সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন?‌
•• আমি একজন পেশাদার অভিনেতা। আমার কাছ থেকে ওঁরা যতটা চেয়েছেন, আমি ১০০ শতাংশ সেটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। সময়ে শুটিংয়ে পৌঁছনো থেকে শুরু করে, অভিনীত চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা, আমার যোগ্যতা অনুযায়ী। কাজেই, কে বড় প্রযোজক, কে ছোট, কে নতুন পরিচালক, কে নামজাদা সেটা বিষয় নয়। ঋতুপর্ণ ঘোষ হলেও আমার পেশাদারিত্ব যেমন ছিল, প্রথম কাজ করছেন এমন পরিচালকের ক্ষেত্রেও তেমনই থাকে। কাজেই সবার ক্ষেত্রেই আমার অভিজ্ঞতা দারুণ। সেরকমই অনিন্দ্যদা বা ক্যামেলিয়ার সঙ্গেও আমার পেশাদার সম্পর্ক খুব ভাল।
• মুম্বইতে কাজ করতে করতে বাংলায় ফিরে আসার কারণ কী?‌ ভাল ছবির অফার?‌
•• না ঠিক তেমনটা নয়। মুম্বইতে যখন টেলিভিশনে কাজ শুরু করলাম ২০০৬ নাগাদ, তখন টানা বছর দুয়েক কাজ করতে করতে বেশ একঘেয়ে লাগছিল। সেই সময় প্রথম বাংলা ছবির প্রস্তাব আসে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর (জানলা‌)‌ কাছ থেকে। আন্তর্জাতিক খ্যাতি-‌সম্পন্ন একজন পরিচালকের সঙ্গে কাজ করলে আমার বায়োডেটা বেশ ওজনদার হবে বলেই মনে হয়েছিল। তার পরপরই অতনু ঘোষ ‘‌অংশুমানের ছবি’‌-‌তে আমাকে ডাকেন। চিত্রনাট্য পড়ে মনে হল, দারুণ তো!‌ আর একটা বাংলা ছবি করেই ফেলি। তারপর তো কৌশিক গাঙ্গুলির ‘আরেকটি প্রেমের গল্প‌’‌, সৃজিত মুখার্জির ‘অটোগ্রাফ‌’‌ আসতে শুরু করল। সেইসময় ২০০৯ নাগাদ স্বল্প বাজেটের বাংলা ছবি একটা অন্য পথের সন্ধান পেয়েছে কিন্তু। তাতে আমিও সামিল হয়ে পড়লাম!‌ ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় থাকা যাকে বলে আর কী!‌ তাই টেলিভিশন থেকে তখন বিরতি নিয়েছিলাম। কারণটা আমার ক্রিয়েটিভ খিদে।
• তাহলে আবার মুম্বইতে ফিরলেন কেন?‌ এখন তো ‘নিমকি মুখিয়া‌’ ধারাবাহিকে নিয়মিত আপনি।
•• মুম্বইতে ফেরার সবথেকে বড় কারণ আমার পরিবার। ২০০৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত আমি মাসে ২০/‌২২ দিন কলকাতাতেই কাটাতাম। বছরে ৬/‌৭ টা বাংলা ছবি মুক্তি পেত আমার। আমার মেয়ে বড় হচ্ছে, একটুও সময় পেতাম না ওর সঙ্গে সময় কাটানোর। তাই সচেতনভাবেই কলকাতায় কাজ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।
• এরপর আর কোন বাংলা ছবিতে দেখা যাবে আপনাকে?‌
•• এখন টেলিভিশন নিয়েই বড্ড ব্যস্ত তো। আর কোনও বাংলা ছবির কাজ এখন হাতেও নেই। সময়ও পাচ্ছিনা।
• এতদিন বাদে টেলিভিশনে কাজ করতে কেমন লাগছে?‌
•• সৌভাগ্য একটাই, ‘নিমকি মুখিয়া‌’‌ খুব ভাল লেখা হচ্ছে। ধারাবাহিকগুলো অর্থনৈতিক দিক থেকে সুবিধাজনক হলেও লেখাগুলো ক্রমাগত ক্লিশে হতে থাকে, ফলে একঘেয়েমী এসে যায় তাড়াতাড়ি। টেলিভিশন কিন্তু অভিনেতা বা পরিচালকের মাধ্যম নয়। লেখকের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে টিআরপি। এই শোয়ের লেখক জাম্মা হাবিব। তিনি প্রযোজকও। মুম্বইয়ের বেশ নামকরা শো-‌রাইটার উনি। আমার চরিত্রটাও ইন্টারেস্টিং। গ্রামের বিডিও। এমনিতে ভালমানুষ, পাশাপাশি বাস্তবের কাছাকাছিও। ঘুষ নেয়, একটু আধটু দূর্নীতিগ্রস্তও (হাসি‌)। এখনও অবধি মজাই লাগছে!‌
• মুম্বইতে বড়পর্দায় আপনাকে দেখা যাচ্ছেনা কেন?‌ সমান্তরাল বাংলা ছবিতে যেমন আপনার একটা চাহিদা আছে, মুম্বইতে কেন নেই?‌
•• মুম্বই অনেক বড় ইন্ডাস্ট্রি কলকাতার তুলনায়। কলকাতায় এই ধরণের ছবিতে কাদের ভাবেন পরিচালকরা?‌ ঋত্বিক, আবির, পরমব্রত, যিশু বা আমি। বড়জোর ৬/‌৭ জন। আর মুম্বইতে এরকম অভিনেতা অগুন্তি!‌ কত বড় বড় সব অভিনেতা রয়েছেন। এবার আমি যদি বলি আমি মুম্বইতে ছবি করছিনা, এটা মিথ্যে বলা হবে!‌ শাহরুখ, আমির বা সলমান ছাড়া আর কেউ নেই যাঁরা সিদ্ধান্ত নেন এই ছবিটা করবেন বা ওটা করবেন না!‌ এখানেও প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ছাড়া আর কার এই ক্ষমতা আছে?‌ কাজেই মুম্বইতে সেরকম কাজ পাচ্ছি না বলাটাই বোধহয় সমীচীন (হাসি‌)‌!‌
‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top