সম্রাট মুখোপাধ্যায়- ভারতীয় সিনেমার দ্বিতীয় নবতরঙ্গের অন্যতম প্রধান পরিচালক বাসু চ্যাটার্জি প্রয়াত। বয়সজনিত কারণে নানা অসুস্থতায় ভুগছিলেন। বৃহস্পতিবার মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০। রেখে গেলেন দুই কন্যা সোনালি ও রূপালিকে। প্রসঙ্গত‌ রূপালি গুহও বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে পরিচালকের জীবন বেছে নিয়েছেন।
বাঙালি পরিবারে জন্ম হলেও জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজস্থানের আজমেড় শহরে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন অল্প কিছুদিন। বাঙালি জীবনের সঙ্গে তাঁর নাড়ির যোগ তৈরি করে দেয় বাংলা সাহিত্য। শরৎচন্দ্র, প্রভাতকুমার থেকে মনোজ বসু, সমরেশ বসু ছিল তাঁর কণ্ঠস্থ। নতুন উপন্যাস বেরোলেই অর্ডার দিয়ে বম্বেতে আনিয়ে পড়ে ফেলতেন। সিনেমাতে হাত–‌পাকানো কলকাতা থেকে বম্বে পাড়ি দেওয়া বাসু ভট্টাচার্যের হাত ধরে। বয়সে বাসু চ্যাটার্জির চেয়ে যিনি বছর চারেকের ছোট বাসু ভট্টাচার্য ছিলেন কিংবদন্তি বিমল রায়ের ইউনিটের সহকারী। ১৯৬৬–‌তে তিনি যখন ‘‌তিসরি কসম’‌ তৈরি করছেন, তখন বাসু চ্যাটার্জি ঢুকে পড়লেন তাঁর ইউনিটে সহকারী পরিচালক হয়ে। এরপর অভিজ্ঞতা বাড়াতে ১৯৬৮–‌তে কাজ করেছেন ‘‌সরস্বতীচন্দ্রা’‌র মতো বড় ব্যানারের ছবিতেও, সহ–‌পরিচালনা বিভাগে।
নিজে স্বাধীনভাবে পরিচালক হলেন পরের বছর ১৯৬৯–‌এ। ‘‌সারা আকাশ’‌। ১৯৬৯। এই বছরে ভারতীয় সিনেমার নবতরঙ্গের দ্বিতীয় ধাপ শুরু। এর প্রায় দেড় দশক আগে বাংলায় ‘‌পথের পাঁচালী’‌ মুক্তি দিয়ে শুরু হয়েছিল প্রথম ধাপ। আর দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়েছিল মৃণাল সেনের ‘‌ভুবন সোম’‌ দিয়ে হিন্দিতে। সেই ছবির মুক্তির পরপরই এল বাসু চ্যাটার্জির ‘‌সারা আকাশ’‌। ছবির কেন্দ্রে এক যুবক। তার রুচি, বিবাহ সম্পর্কে তার নিজস্ব ধারণা, নাগরিক অস্থিরতা— সব মিলিয়ে এক অস্তিত্ববাদী ছবি যেন। চমকে উঠেছিল দর্শক। পরের ছবি তিন বছর পরে। ‘‌পিয়া কা ঘর’‌, যে ছবি আরেক প্রবাসী–‌বাঙালি নায়িকা জয়া ভাদুড়িকে ‘‌পাশের–‌বাড়ির–‌বউ’‌ ইমেজটা এনে দিয়েছিল। বিয়ের পরে এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে এক নববিবাহিত দম্পতির নিজস্ব ঘর পাওয়ার সমস্যা। এমন একটি অর্থনৈতিক সমস্যাসঙ্কুল ‘‌ইস্যু’‌কে রোমান্স আর সিরিও–‌কমিকে মুড়ে কেমনভাবে উপস্থাপনা করা যায়, দেখালেন বাসুবাবু। এখান থেকেই তাঁর নিজস্ব ঘরানার জন্ম।
কী ছিল সেই ঘরানায়?‌ তাঁর চূড়ান্ত সফল সবকটি ছবিই রোমান্টিক ছবি। সেই রোমান্স আসত ডেলি প্যাসেঞ্জারির ট্রেনের কামরায়, চাকুরি‌জীবীদের ‘‌চওল’‌ কিংবা অফিসে, হঠাৎই, বা একটু দুর্ঘটনাবশত‌ নাটকীয়তায়। আর সেই প্রেমের পথে বাধা হত মূলত‌ আর্থিক অবস্থান। যদিও তা সমাধান পেত মজার পথেই। তাঁর নায়কেরা সাধারণত‌ লাজুক, ভীরু, স্বল্পবাক— যেন চ্যাপলিনেরই এক অন্য রূপ। ‘‌সফেদ ঝুট’‌, ‘‌মঞ্জিল’‌, ‘‌বাতোঁ বাতোঁ মে’‌, ‘‌দিল্লাগি’‌, ‘‌ছোটি সি বাত’‌— ‌এরই রকমফের। হলিউডের বিলি ওয়াইল্ডারের ভক্ত ছিলেন। ফলে প্রথম ছবিতে যথেচ্ছ গল্প ভাঙলেও পরে ফিরে এসেছিলেন নিটোল গল্প বলার ঢংয়ে। আর সেসব গল্পের অধিকাংশই ছিল বাঙালি লেখকদের লেখা। সঙ্গে ‌মন কাড়া গান। ফলে বক্স অফিস অধরা থাকেনি। মজার কথা, বাসু চ্যাটার্জির ছবির সেরা সময় যেটা মধ্য–‌সত্তর থেকে মধ্য–‌আশি, সেই সময়টা পর্দায় রাগী নায়কদের কাল হিন্দি ছবিতে। বক্স ‌অফিসে তাঁদেরই জয়‌জয়কার। অথচ তারই ভেতর উল্টোপথে গিয়ে ব্যবসা পেয়েছে এইসব ‘‌স্নিগ্ধ’‌ মেজাজের ছবি। আরও মজার কথা, যখন ওই সব ছবিতে অমিতাভ–‌মিঠুনরা এসেছেন বাসুবাবুর ছবিতে ‘‌মঞ্জিল’‌ বা ‘‌শৌকিন’‌–‌এর মতো ছবি করতে, তাঁরা তাঁদের ‘‌লার্জার দ্যান লাইফ’‌ ইমেজ ছেড়েই এসেছেন।
শুধু মজার ছবি নয়, সিরিয়াস ছবিতেও বাসুবাবু নিজের দক্ষতা বুঝিয়েছেন ‘‌স্বামী’‌ বা ‘‌রত্নদ্বীপ’‌ বা ‘‌এক রুখা হুয়া ফয়সলা’‌র মতো ছবিতে। ছোট পর্দাতেও সমান সফল। ‘‌রজনী’‌ বা ‘‌ব্যোমকেশ বক্সী’‌ তো টিভি সিরিয়ালের ইতিহাসে মাইলফলক। দুঃখ ছিল দুটো। এক, যে বছর উত্তম ‘‌ওগো বধূ সুন্দরী’‌ করেছিলেন, একই বছর একই কাহিনি নিয়ে দেব আনন্দকে নায়ক করে তিনি বানিয়েছিলেন ‘‌মনপসন্দ’‌। লড়াইটা জমল না। আর শেষ বয়সে করা ‘‌হঠাৎ বৃষ্টি’‌, ‘‌চুপিচুপি’‌, ‘‌টক ঝাল মিষ্টি’‌, ‘‌হচ্ছেটা কী’‌, হঠাৎ সেদিন’‌— ‌ এইসব বাংলা ছবির সফল না হতে পারা। কলকাতাবাসীর প্রিয় পরিচালক হয়েও কলকাতা–‌চ্যাপ্টার সুখের হয়নি তাঁর। বৃহস্পতিবার তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হল মুম্বইয়ের সান্তাক্রুজ শ্মশানে।‌‌
শোকপ্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বলেছেন,‘‌বাসু চ্যাটার্জির মৃত্যুসংবাদে দুঃখ পেয়েছি। দুর্দান্ত এবং স্পর্শকাতর তাঁর কাজ। মন ছুঁয়ে যায়। সহজ, সরল এবং একইসঙ্গে জটিল ভাবনা, সাধারণ মানুষের সমস্যা, নিত্যদিনের সঙ্ঘর্ষ তুলে ধরেছে তাঁর ছবি। তাঁর পরিবার ও অসংখ্য অনুরাগীর প্রতি সমবেদনা। ওঁ শান্তি।’‌
অনুপম খের টুইটে লিখেছেন,‘‌আপনার অভাব বোধ করব বাসুদা। আপনার সহজ, সরল স্বভাব ও সিনেমা— এসবের অভাব বোধ করব। ওঁ শান্তি।’‌
অনিল কাপুর বলেছেন,‘‌সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন পরিচালক বাসু চ্যাটার্জি। তাঁর অভাব বোধ করব। অনায়াস প্রতিভাধর এবং অসামান্য একজন ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।’‌ 
‌সুজিত সরকারের মন্তব্য, ‘‌একটি বাংলা ধারাবাহিকে ওঁর সহকারী হিসেবে আমার প্রথম কাজ। শুটিং হয়েছিল দিল্লির সি আর পার্কে। ওঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।’‌
অনুরাগ কাশ্যপ‌ লিখেছেন,‘‌বাসু চ্যাটার্জি চলে গেলেন। আমার মতে, তাঁর মতো করে খুব কম লোক জীবনের হালকা দিকগুলো দেখেছেন। আমি তাঁর বিরাট অনুরাগী। ‘‌কহানি–‌২’‌ দিয়ে তা প্রমাণ করেছি। বাসুদাকে ভালবাসা।’‌

 

  মমতা ব্যানার্জি  বলেছেন- প্রবাদপ্রতিম পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার বাসু চ্যাটার্জির মৃত্যুতে আমি বেদনাহত। ‘‌ছোটি সি বাত’‌, ‘‌চিতচোর’‌, ‘‌রজনীগন্ধা’‌, ‘‌ব্যোমকেশ বক্সি’‌, ‘‌রজনী’‌–‌র মতো রত্ন দিয়েছেন তিনি। তাঁর পরিবার, বন্ধু, অনুরাগী ও সমগ্র চলচ্চিত্রমহলকে সান্ত্বনা জানাই।

অমিতাভ বচ্চন বলেছেন- বাসু চ্যাটার্জির মৃত্যুতে প্রার্থনা এবং সমবেদনা। মৃদুভাষী ভদ্রলোক ছিলেন। তাঁর ছবিগুলো মধ্যবিত্ত ভারতের প্রতিচ্ছবি। তাঁর সঙ্গে ‘‌মঞ্জিল’‌ ছবিটি করেছি। দুঃখজনক ক্ষতি। এমন আবহে ‘‌রিমঝিম গিরে সাওন’‌ গানটির জন্য তাঁকে প্রায়ই মনে করতাম।
অমিতাভ বচ্চন

শাবানা আজমি বলেছেন- বাসু চ্যাটার্জির মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে শোকার্ত। অনবদ্য পরিচালক ছিলেন, মধ্যধারার ছবির পথিকৃৎ। আমার সৌভাগ্য যে, তাঁর সঙ্গে তিনটি দারুণ ছবি করেছি— ‘‌স্বামী’‌, ‘‌আপনে পরায়ে’‌ এবং ‘‌জিনা ইহাঁ’‌। সব ক‌টিই অসম্ভব বাস্তব চরিত্র। শান্তিতে থাকুন।

জনপ্রিয়

Back To Top