পিয়া রায়, বাল্টিমোর: গতকালের আজকাল পড়েছেন? বঙ্গ সম্মেলন-এ বিনামূল্যে বিতরিত আজকাল ও বাংলা পডকাস্টের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত বিশেষ সংস্করণের কয়েকটা সাক্ষাৎকার নজর কেড়েছিল। অন্বেষা মনে করেন, বিদেশের বাঙালি ছেলে-মেয়েরা অন্য ভাষা-ভাষীদের তুলনায় মাতৃভাষার প্রতি কম সচেতন। আর ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায় তো দেখলাম সরাসরি উদ্যোক্তাদের বলেই দিয়েছেন যে
সম্মেলনে হিন্দি নাচ-গান যেন না চলে। লেখা দুটো পড়েই মনে পড়ে গেল, বারো বছর আগের ডেট্রয়েট বঙ্গ
সম্মেলনের কথা। শেষ দিনে সবাই অধীর আগ্রহে বসে আছি শ্রেয়া ঘোষালের অনুষ্ঠান দেখবো বলে। পর্দা খুলতেই দেখা গেল অর্কেস্ট্রার সঙ্গে গান শুরু করছেন শ্রেয়া নন, তাঁর সঙ্গের আরেক শিল্পী - অবাঙালি। তখনকার জনপ্রিয় হিন্দি গান দিয়ে তিনি অনুষ্ঠান শুরু করলেন। প্রথম গানটার পরে যেই দ্বিতীয় গানটা সবে শুরু করেছেন, দেখলাম এক কর্মকর্তা সটান মঞ্চে উঠে গেছেন। উত্তেজিত ভাবে তিনি মাইকেই সবার উদ্দেশে বললেন যে এখানে কোনো হিন্দি গান হবে না। শিল্পী মঞ্চ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন, অনুষ্ঠান বন্ধ! ব্যাকস্টেজে শ্রেয়ার ম্যানেজারের সঙ্গে তুমুল তর্কাতর্কি উদ্যোক্তাদের। শ্রেয়া আমাকে বললেন, পিয়াদি, বাল্টিমোরের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। সেদিন কিছুক্ষন পরে মিটমাট হলো, শ্রেয়া মঞ্চে উঠে বাংলা এবং হিন্দি অনেক গান গাইলেন, সন্ধ্যাশেষে সবাই খুশি।
শ্রেয়া যে কথা বললেন, সেখানে পিছিয়ে যাচ্ছি - ২০০৪ বাল্টিমোর। তখন শ্রেয়ার বয়েস মাত্র কুড়ি। বাংলার নয়নের মণি ছোট্ট মেয়েটি সাধারণ সালোয়ার-কামিজ পরে প্রথম বঙ্গ সম্মেলনে পরপর বাংলা গান গেয়ে চলেছেন। দর্শকাসনে সবাই মন্ত্র মুগ্ধ।
তখন সবে দেবদাস সিনেমা বেরিয়েছে, সবার কন্ঠে ডোলা রে ডোলা। অনুরোধ আসছে সেই সব হিন্দি গান গাইবার। খুব বিনীত ভাবে শ্রেয়া বললেন,  এটি বঙ্গ সম্মেলন বলে তিনি বাংলা গান গাইবার জন্যেই প্রস্তুত হয়ে এসেছেন, কিন্তু সবাই অনুমতি দিলে তিনি অবশ্যই হিন্দি গান গাইবেন। বলা বাহুল্য, সগর্জনে অনুমতি এসেছিল এবং সেদিনও মাতিয়ে দিয়েছিলেন শ্রেয়া।
কৌতূহল হল, বঙ্গ সম্মেলনে বলিউড শিল্পী প্রথম কবে এসেছিলেন ?‌ বসে পড়লাম সম্মেলনের জনক বলে যাঁকে
মনে করা হয়, নিউ ইয়র্কের সেই প্রবীর রায়ের সঙ্গে। বোস্টনে ২০০১ সালে কুমার শানুকে নিয়ে এসেছিল, প্রবীরদা জানালেন। তারপর শ্রেয়া, অভিজিৎ, শান, বাবুল সুপ্রিয়, বাপ্পি লাহিড়ী সবাই এসেছেন। এঁরা সবাই বলিউড শিল্পী হলেও বাঙালি। (মান্না দেও এসেছেন - তিনি অবশ্যই বলিউড-বাংলা এই তকমার উর্ধে) । কিন্তু বাঙালি বলিউড শিল্পী তো হাতে গোনা। তাই আমরা অন্য শিল্পী খুঁজতে লাগলাম । এলেন কবিতা কৃষ্ণমূর্তি, অলকা ইয়াগনিক, কেকে, এবার শঙ্কর মহাদেবন। প্রবীরদা এবং ওঁর মতো অনেকে মন থেকে বঙ্গ সম্মেলনে হিন্দি গানের আধিক্য মেনে নিতে পারেন না, কিন্তু উদ্যোক্তা হিসেবে দর্শকদের চাপে পড়ে 
বদলাতে বাধ্য হয়েছেন। সম্মেলনে নতুন দর্শককে আকৃষ্ট করার জন্যে একটা বলিউড কনসার্ট থাকে  ভাষা নির্বিশেষে। কথা বলতে বলতে প্রবীরদার মনে পড়ে গেল এই বাল্টিমোরেই ২০১১র সম্মেলনের একটি ঘটনা। শ্রীকান্ত আচার্য বাংলা গান গাইছেন অনেকক্ষন ধরে, সবাই উপভোগ করছেন। এক মাঝবয়েসী দর্শক জোরাজুরি করতে লাগলেন হিন্দি গজল গাওয়ার জন্যে।
সুতরাং, বঙ্গ সম্মেলনের ভাষা বিশুদ্ধতা রাখার কোনো উপায় নেই। যে বছর যে শহরে হয় এই সম্মেলন, তাঁরা ঠিক করেন কাকে আনবেন।
২০১৬ সালে বঙ্গ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ারে। আয়োজক কালচারাল এসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল অর্থাৎ সিএবি নিজেরাই। থিম ঠিক হলো “ভাষাকে ভালোবেসে”। সেখানেও কমিটি ঠিক করলো সুনিধি চৌহানকে আনা হবে। জানালেন সিএবির কর্মকর্তা, বঙ্গ সম্মেলনের প্রথম থেকে আছেন যিনি, পূর্ণ ভট্টাচার্য। পূর্ণদার কথায় সেই একই প্রতিধ্বনি, বঙ্গ সম্মেলনে রেজিস্ট্রেশন বাড়ানোর জন্যে বলিউড শিল্পী ও হিন্দি নাচ-গানকে মেনে নিতেই হবে। সুনিধি চৌহান কে বেছে নেবার পর বিতর্ক হয় নি তা নয়, শেষমেশ আয়োজকরা ঠিক করেন যাঁরা সুনিধির অনুষ্ঠান দেখতে চান না, তাঁদের তিরিশ ডলার করে ফেরত দেওয়া হবে। সেরকম দর্শক খুব বেশি পাওয়া যায় নি। সুতরাং এই ট্রেন্ড আর বদলানো যাবে না, স্বীকারোক্তি পূর্ণ-দার। তবে ধরি মাছ, না ছুঁই পানি গোছের যুক্তিতে পূর্ণদা বললেন, সচরাচর যেহেতু সমাপ্তি অনুষ্ঠানের পরে বলিউড অনুষ্ঠান হয়ে থাকে, সেহেতু এটি মূল বঙ্গ সম্মেলনের বাইরে।
এরকম কিছু এবার বাল্টিমোরে নেই। শঙ্কর মহাদেবনের অনুষ্ঠান মূল বঙ্গ সম্মেলনের মধ্যে, এক্কেবারে শনিবার সন্ধ্যায়।
কারণ ব্যয়–বহুল বঙ্গ সম্মেলনের বাণিজ্যিক দিক যদি দেখতে হয়, তাহলে এছাড়া উপায় নেই, সোজাসুজি জানালেন অধ্যাপিকা এবারের আয়োজক কমিটির নন্দিতা দাশগুপ্ত। নন্দিতাদির মতে, আমরা অনেকদিন ধরে আমাদের
এখানকার সদস্যদের মতামত নিয়েছি, তারকা শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে, তাঁদের বাজার দর ও আমাদের আর্থিক সঙ্গতির  সঙ্গে সমন্বয়ে  সর্বসন্মত চয়ন শঙ্কর মহাদেবন। আর হিন্দি-বাংলা নিয়ে ছুঁৎমার্গের তো প্রশ্নই ওঠে না।  কারণ দর্শক এটাই চান। তাই মূল প্রশ্নটা হলো, যাঁদের চাহিদা পূরণের যুক্তি আয়োজকরা দিচ্ছেন, উত্তর আমেরিকার নানা জায়গা থেকে যাঁরা আসছেন, বঙ্গ সংস্কৃতির প্রতি তাঁদের দায়বদ্ধতা কতটা? আয়োজকদের কাছে প্রশ্ন, সম্মেলনের উদ্দেশ্য কি শুধুমাত্ৰ ইকোনমিক্স-এর অঙ্ক মিলিয়ে দর্শকদের চাহিদা মেটানো? উত্তর-টা সহজ নয়, তবে বিশ্বায়নের বাজারে ভাববার সময় এসেছে মনে হয়।
নাহলে হয়তো কয়েক বছর পর আলু-পোস্ত নয়, চাহিদা মেটানো হবে পাস্তার। বঙ্গ সম্মেলন বিবর্তিত হবে শুধু মাত্র বাঙালিদের সম্মেলনে। সংস্কৃতি হয়ে যাবে না ঘর কা, না ঘাটকা। 

গাইছেন অন্বেষা। ছবি:‌ অর্য্যাণী ব্যানার্জি
 

জনপ্রিয়

Back To Top