সৌগত চক্রবর্তী‌: • এর আগে আপনাদের একসঙ্গে অভিনয় ‘‌জাতিস্মর’‌ আর ‘‌রাজকাহিনি’ তে।
যিশু:‌ হ্যঁা, ‘‌জাতিস্মর’-‌এ আবিরের ছিল গেস্ট অ্যাপিয়ারেন্স, আর ‘‌রাজকাহিনী’‌ তে আমার গেস্ট অ্যাপিয়ারেন্স।
• তারপর আবার একসঙ্গে অভিনয় করতে এত দেরি হল কেন?‌
যিশু:‌ সেটা তো ডিরেক্টররা বলতে পারবেন। তবে এবার প্রযোজক ভেবেছেন। মৈনাকও (‌ভৌমিক)‌ একটা সুন্দর স্ক্রিপ্ট লিখেছে। এটা খুবই আনলাইক একটা স্ক্রিপ্ট, মৈনাক তো সাধারণত রোমান্টিক স্ক্রিপ্টি লেখে। ও যে এরকম একটা থ্রিলার লিখবে এটা আমরা কেউই ভাবতে পারিনি। এই স্ক্রিপ্টটা আমার বা আবির—দুজনেরই ভাল লেবেছে।
আবির:‌ এখানে একটা কথা বলে নেওয়া জরুরি, শুধু আমি আর যিশু একসঙ্গে অভিনয় করব বলেই একটা ছবি করে নিলাম, এই ভাবনাটার আমরা বিরোধী। এটা তখনি করা উচিত যখন দুজনেরই এক্সাইটিং লাগবে স্ক্রিপ্টটা এবং ছবিটাও তাকে সাপোর্ট করবে। অনসম্বল‌‌ স্ক্রিপ্ট করলেই তো ছবি ভাল হয়ে না। স্ক্রিপ্টটাই কিন্তু আসল। এর পর সেই ছবিটা ওয়ার্ক করল কি করল না, সেটা অন্য ব্যাপার। মৈনাক কিন্তু আগে গল্পটা ভেবেছে। আমরা যে দুটো চরিত্র করছি, সেই দুটো চরিত্রের মধ্যেই অনেকটা গ্রে এরিয়া আছে। মৈনাক যখন চরিত্র নির্বাচনের কথা ভাবছিল তখন শ্রীকান্তদাই প্রথম বলেন, এই দুই চরিত্রে কি যিশু আর আবিরকে নেওয়া যেতে পারে?‌ সেইভাবেই আমার বা যিশুর এই ছবিতে আসা।
• ছবির চরিত্র দুটো কেমন?‌
আবির:‌ আসলে আমরা ট্রেলারে যেটুকু দেখছি তার বাইরে তো কিছু বলা যাবে না। আমি কিন্ত একবারও বলছি না এমন গল্প এর আগে হয়নি। আমার চরিত্রের নাম অর্ক। সে একজন স্কুল টিচার। যদি বাইরে থেকে তাকে দেখা যায়, তাহলে খুবই স্বাভাবিক, শান্তশিষ্ট, মধ্যবিত্ত বাড়ির একটা ছেলে। কিন্তু তার আর একটা দিক আছে। সে যেই কাজগুলো করছে সেগুলোকে আমরা নর্ম্যাল বলে ভাবতে পারি না। তার পেছনে যে কারণই থাকুক, দর্শকের মনে হবে একটা সাইকিক ব্যাপার আছেই।
যিশু:‌ আমার চরিত্রের নাম ধনঞ্জয়। জীবনের প্রায় সবকিছুই হারিয়ে ফেলেছে। সে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে কিন্তু তারও সবটাই যে স্বাভাবিক তা নয়। সব মিলিয়ে আমার চরিত্রটা ইন্টারেস্টিং বলেই মনে হয়। আমাদের স্ক্রিপ্টটা ভাল মনে হয়েছে তাই করেছি। এবার দর্শক তার বিচার করবেন।
• আপনারা যেহেতু একসঙ্গে অভিনয় করছেন। তাই জিজ্ঞেস করছি যিশু আপনার কাছে আবিরের অভিনয়ের কোন দিকটা বেশি ভাল লাগে। বা আবিরের কোন গুনটা যিশুর ভাললাগে।
যিশু:‌ আমি বা আবির তো কনটেন্ট বেসড ছবি করি। একটু রিয়্যালিস্টিক বেসড ছবি। এখন আবিরের যে ফ্যান ফলোয়িং দেখছি আমরা তাতে এটা পরিস্কার, যে আবির সেটা তার অভিনয় দিয়ে অর্জন করেছে। আমার এমনিতে ওর অভিনয়টা খুব ন্যাচারাল বলে মনে হয়। একজন অভিনেতার অভিনয়টা দেখতে দেখতে যদি মনে হয় সে অভিনয়টা করছে তাহলে অবশ্যই তার অভিনয়ের মধ্যে কিছু খুঁত আছে। আবির আমার কাছে ফ্যানটাস্টিক যে হি ডাজ নট শো দ্যাট হি ইজ অ্যাকটিং। ও ছবিগুলোতে অভিনয় করেছে সেগুলোয় মনে হয়েছে ও খুব ম্যাচিওরড। ওকে দেখে কখনওই মনে হয়নি ও অভিনয় করছে। বরং ওকে দেখে একটা চরিত্র বলেই মনে হয়ছে।
আবির:‌ যিশু আমার আগেই ইন্ডাস্ট্রিতে এসে গেছে। এই লম্বা সময়টা ধরে কাজ করার পেছনে অনেকগুলো কারণ থাকে। যখন প্রথম কাজ শুরু করেছে তখন মূলত যে ছবিগুলোতে ওকে দেখেছি সেখান থেকে ও সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেল। একজন অভিনেতার মধ্য এই গুনটা থাকা বিশেষ জরুরি। ওর কমিক টাইমিং অসাধারণ। ইট ইজ অ্যাকচুয়ালি ভেরি ডিফিকাল্ট। আর একটা কথা বলি, যিশু তো একজন সুদর্শন হিরো। তাই ওর কিছু লিমিটেশনসও আছে। চরিত্র অভিনেতা কমেডি করতে গিয়ে যা যা করতে পারেন তা হিরোর পক্ষে করা চলবে না। এই বাধাটাকে ওর অভিনয় দিয়ে অনেকটাই সরিয়ে ফেলেছে যিশু। আবার ‘‌রাজকাহিনী’‌ বা ‘‌জুলফিকার’‌ ছবিতে ও নিজের ইমেজ যেভাবে ভেঙেছে তা তো কল্পনা করা যায় না। আবার ‘‌এক যে ছিল রাজা’‌য় ৬০ শতাংশ দৃশ্যে যিশু কেবল একটা কৌপিন পরে অভিনয় করেছে। ঠিক এরকম একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার ‘‌বিদায় ব্যোমকেশ’‌ ছবিতে যখন আমার চেহারার প্লাসপয়েন্ট গুলো ছেড়ে দিয়ে আমাকে একজন ৮০ বছরের পুরনো বৃদ্ধের চরিত্রে অভিনয় করতে হয়েছিল।
• যিশু আপনার আগেই ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছেন। আবার আপনিও একটা দিকে এগিয়ে আছেন। আপনি যিশুর আগেই ‘‌ব্যোমকেশ’ চরিত্রে অভিনয় করে ফেলেছেন।
আবির‌:‌ আমি যখন ব্যোমকেশ করি তখন একটা চাপ ছিল। কারণ তার আগের ব্যোমকেশ মানেই সত্যজিৎ রায় আর উত্তমকুমার। তবে আমি তখন সে কথাটা ভাবিনি। আসলে বয়সটা কম ছিল বলে এই ব্যাপারটা আমার মাথাতেই ঢোকেনি। ঢুকলে আর ছবিটাতে অভিনয়ই করতে পারব না। তবে এটা ঠিক, আমার ব্যোমকেশ করার মধ্যে দিয়ে দর্শকের মনে ব্যোমকেশের একটা ‘‌স্কেচ’ আঁকা হয়ে গিয়েছিল। ব্যোমকেশ মানেই তার পোশাক এরকম, লুক এরকম ইত্যাদি। আর এটাই চাপ ছিল যিশুর। কারণ ওকে তো ব্যোমকেশ করতে গেলে নতুন কিছু দর্শককে দিতে হবে। ব্যোমকেশ চরিত্রে অভিনয় মানেই তো তখন যিশুর ক্ষেত্রে আমার জুতো পায়ে দেওয়া কিন্তু সেই জুতোটাকে তো পায়ের মাপে সেট করে নিতে হবে। এটাই যীশু সাকসেসফুলি করেছে।
যিশু:‌ আমি যখন ব্যোমকেশ করি তখন আমার প্রথম বাধাটা এসেছিল আমার বাড়ি থেকেই। ততদিনে আবিরের তিনটে ব্যোমকেশ ছবি রিলিজ করে গেছে এবং দর্শকের মনে তখন আবির মানেই ব্যোমকেশ। আমার স্ত্রী নীলাঞ্জনা আবিরের ব্যোমকেশের অসম্ভব ভক্ত। নীলাঞ্জনা আমার ব্যোমকেশ করার খবর পেয়ে বলেছিল, সবই ঠিক আছে, তবে আবির কিন্তু সুপারহিট ব্যোমকেশ। বাড়ি থেকেই যখন এই কথাটা ভেসে আসে তখন ভাবতেই হয় তুমি কার জুতোয় পা দিতে যাচ্ছ। সেই জায়গায় আপনাকে অন্তত জুতোটা চেঞ্জ করতে হবে। এটা আমার কাছে একটা রেসপন্সিবিলিটি ছিল যে আমাকে আবিরের থেকে অন্যরকম কিছু করতেই হবে। আবির তো তখন এই দায়িত্বটা আমার ঘাড়ে ফেলে দিয়ে ফেলুদায় ঢুকে গেছে।
• এখন তো আর আপনারা দুই ব্যোমকেশ নন। আর একজন এসে গেছেন তৃতীয় ব্যোমকেশ হিসেবে। তিনি পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। আপনারা ওঁকে কীভাবে স্বাগত জানাবেন?‌
যিশু:‌ পরমব্রত একজন দক্ষ অভিনেতা এ বিষয়ে কোনও দ্বিমত নেই। ও ডেফিনটলি জানে আবির কীভাবে ব্যোমকেশ করেছিল বা যীশু কীভাবে ব্যোমকেশ করেছিল। আমি জানি ও একটা সঠিক ভাবনা-‌চিন্তা করে ফেলেছে যে কীভাবে ও ব্যোমকেশটা করবে। এবং আমি জানি পরমব্রত সাকসেসফুল হবেই।
আবির:‌ আমার মনে হয় এখনই এ বিষয়ে মন্তব্য না করে লেটস ওয়েট অ্যান্ড সী। আসলে আমার যেহেতু অনেকগুলো ব্যোমকেশ করা হয়ে গেছে তাই আমি আর খুব একটা কমেন্ট করতে চাইছি না এ নিয়ে।
• যিশু, আপনার বাবা উজ্জ্বল সেনগুপ্ত থিয়েটার ও যাত্রার বিখ্যাত অভিনেতা। পাশাপাশি আপনিও যাত্রায় অভিনয় করেছেন। পেশাদার নাটকেও অভিনয় করেছেন। এখন কি আর থিয়েটার করতে দেখা যাবে আপনাকে?‌
যিশু:‌ এখনও পর্যন্ত এই ব্যাপারটা নিয়ে কোনও ভাবনা-‌চিন্তা করিনি। আর থিয়েটার করতে যে সময়টা লাগে সেটা এখন আমার পক্ষে বের করা সম্ভব নয়। থিয়েটার করলে কিন্তু প্রতি মূহূর্তে একজন অভিনেতা কিছু শিখতে পারে। সেটা এরকম ছেলেখেলা করে করা যায় না। অবশ্য এটাও ঠিক সিনেমাটাও ছেলেখেলা করার বিষয় নয়। আমি তো টেলিভিশন, টেলিফিল্ম, ওয়েব সিরিজ, যাত্রা বা ফিল্ম সবই করে ফেলেছি। আমার কাছে সেরা আর্টফর্ম হল যাত্রা। ১০ হাজার লোক আপনার অভিনয় দেখে ভাল বললেই তবে আপনি ভাল, এই জিনিসটা বোধ হয় আর কোনও আর্টফর্মে নেই। দর্শকের চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায় আপনি আসলে ভাল অভিনয় করেছেন কি না। তবে যাত্রা তো প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার জায়গায় চলে এসেছে। এবং তার জন্যে দায়ী আমরা ফিল্ম ও টেলিভিশনের লোকেরাই। আসলে আমাদের যা আর্থিক ডিমান্ড তা মিটিয়ে অন্য শিল্পীদের টাকা দেওয়া প্রায় অসম্ভব। যে সব গ্রামাঞ্চলে যাত্রা চলে সেখানকার সব অঞ্চলই তো এই টাকাটা তুলতে পারে না। তবে ডেফিনিটলি আমার কাছে টাফেস্ট আর্ট ফর্ম হল যাত্রা।
• আবির আপনার বাবাও একজন পরিচিত থিয়েটার ব্যক্তিত্ব। আপনার মাও তাই। গত বছর ‘‌ছু মন্তর’‌ বলে লোককৃষ্টির একটা নাটকে আপনার অভিনয়ের কথা ছিল। কিন্তু দেখা গেল একটা ভিডিওতে আপনাকে একটুখানি দেখা গেল। দর্শক কিন্তু খুবই হতাশ হয়েছেন।
আবির:‌ (‌হেসে)‌ হতাশ হয়ত একটু হয়েছেন। তবে ‘‌ছু মন্তর’‌ বলে নাটকটা যখন শুনেছিলাম আমার খুব ভাল লেগেছিল। আসল কারণটা হল বাড়িতে আমাকে তো নিয়মিত গালাগাল খেতেই হয় নাটকের পরিবারের লোক হয়েও স্টেজে কোনওদিন অভিনয় করিনি বলে। এটা যখন হয়েছিল লাস্ট ইয়ারে তখন এই নাটকের যিনি পরিচালক প্রসূনকাকু, আসলে ছোটবেলায় উনি ছিলেন কাকু, এখন বড় হোয়ার পর তিনি দাদাস্থানীয়। তিনিই আমাকে বলেন একটা কিছু তুই কর। আমি কিছুতেই রাজি হচ্ছিলাম না। তারপর বাবাই এই আইডিয়াটা দেয়। এই অংশটা আমরা একটা ছোট্ট ভিডিও ক্লিপে দেখতে পাই। একটা বড় অ্যাওয়ার্ড ফাংশানে আমি পুরস্কার নিচ্ছি। আমাকে প্রসূনদা বলল, তুই তো এটা করিস বাস্তবে। তাই তুইই করে দে। তাই করেছিলাম। তবে যদি কোনওদিন নাটক করি তবে ‘‌লোককৃষ্টি’‌তেই সেটা শুরু করব। তবে এখনও থিয়েটারের কোনও প্ল্যানিং নেই। স্টেজ অভিনেতা হিসেবে নিজেকে এখনও দেখতে পাচ্ছি না। তবে ওই যে আছে না, কখন কী ঘটে যায় কিচ্ছু বলা যায় না!‌
• সমসাময়িক যে বাংলা গ্রুপ থিয়েটার—কৌশিক সেনের নাটক, ব্রাত্য বসুর নাটক বা সুমন মুখোপাধ্যায়ের নাটক—দেখার সুযোগ হয়?‌
যিশু:‌ আমি আজ পর্যন্ত কোনও নাটকই দেখিনি।
আবির:‌ আমার সুযোগ থাকলেও দেখা হয় না। তবে বাড়িতে আলোচনার ফলে এখনকার নাটক নিয়ে একটা আইডিয়া আছে। কৌশিকদা তো প্রায় প্রতি শোয়ের আগেই আমাকে একটা করে রিমাইন্ডার দিয়ে যায়। বলে, তুই আসবি না আমি জানি। তবু বলে রাখলাম। তবে আমার থিয়াটারের প্রতি সম্পূর্ণ ভাবে আস্থা আছে, শ্রদ্ধা আছে।
• আগামীদিনে আপনাদের কী কী ছবি আসছে?‌
(‌‌যিশু চুপ। আবির যীশুকে বললেন ‘‌বল’‌?‌ বললেন, ‌‘‌যিশুর অনেক বেশি ব্যস্ত। আগে ওই বলুক। আমার তো ছোট্ট লিস্ট।’ হেসে উঠলেন আবির। যীশু আবিরের পিঠে আদরের ঘুষি মারতে মারতে বললেন‌)
যিশু:‌ এই মূহূর্তে মহেশ ভাটের ‘‌সড়ক ২’‌। এই মাস থেকেই শুটিং শুরু হবে। আর একটা তেলুগু ছবি করছি। আর একটা তেলুগু ছবির কথা চলছে, আর একটা হিন্দি ছবির কথা চলছে।
আবির:‌ আমার একটা ছবির শুটিং শুরু হবে। জিৎ-‌দার সঙ্গে। যদিও অফিশিয়ালি এখনও কোনও অ্যানাউন্সমেন্ট হয়নি। পাভেলের পরিচালনায়। আর একটা ছবির চিত্রনাট্য লেখার কাজ চলছে। এছাড়াও ব্যোমকেশ ছবিরও চিত্রনাট্য লেখা চলছে। এছাড়াও বেশ কিছু চিত্রনাট্য পড়ার কাজ চলছে।
• যিশুতো বাংলা ছবির পাশাপাশি হিন্দু আর তেলুগু ছবিতে কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু আবিরকে হিন্দি ছবিতে দেখা যাচ্ছে না কেন?‌
আবির:‌ হিন্দি ছবিতে অভিনয়ের আগ্রহ বরাবরই আছে। কিন্তু যাঁরা কাজ করাবেন তাঁদের কি আগ্রহ আছে?‌ তাঁদের ইচ্ছা হওয়াটা তো সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের অবশ্য দোষ দিচ্ছি না (‌হাসি)‌।

‌‌ছবি:‌ বিপ্লব মৈত্র‌
 

জনপ্রিয়

Back To Top