সাগরিকা দত্তচৌধুরি: করোনায় আক্রান্ত হয়ে রাজ্যে ফের একজনের মৃত্যু হল। মঙ্গলবার নতুন করে রাজ্যে পাঁচজন আক্রান্ত। এই নিয়ে রাজ্যে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৩, আক্রান্ত ২৭। নতুন করে রাজ্যে ১ লক্ষ ৩ হাজার ৩৯১ জনকে গৃহ–‌পর্যবেক্ষণে রাখার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য দপ্তর। রাজ্যে কোয়ারেন্টিনে এখন ১ লক্ষ ৫০ হাজার ৪৮২ জন। 
আরও ৮৭ জন হাসপাতালের আইসোলেশনে গিয়েছেন। এঁদের মধ্যে আক্রান্ত ও মৃতের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিরা ছাড়াও ভিন্‌রাজ্য থেকে আসা বহু মানুষ, শ্রমিক আছেন। এদিনের আক্রান্তদের মধ্যে কারও এখনও পর্যন্ত বিদেশ বা ভিন্‌রাজ্যের যোগ পাওয়া যায়নি। খোঁজ চলছে। করোনা–‌আক্রান্তের সংস্পর্শে এসেই তাঁদের সংক্রমণ। কোথা থেকে?‌ কীভাবে?‌ চিন্তিত স্বাস্থ্যকর্তারা। দিল্লির এক ধর্মীয় সমাবেশে এ রাজ্যের ৭৩ জন মানুষ গিয়েছিলেন। তাঁদের খোঁজ চলছে। এনআরএসের আইসোলেশনে করোনা সন্দেহে মৃত মহিলার রিপোর্ট সোমবার রাতে নেগেটিভ আসে। এই সপ্তাহেই মালদা ও বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শুরু হতে চলেছে করোনা পরীক্ষা। সেনা হাসপাতালের করোনা–‌আক্রান্ত চিকিৎসকের অবস্থা স্থিতিশীল। 
সোমবার গভীর রাতে হাওড়া জেলা হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত হয়ে সালকিয়ার এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়। ৪৮ বছরের ওই মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডে ছিলেন। ৬ মার্চ তিনি পরিবারের সদস্য–সহ ১৪ জন মিলে ডুয়ার্স বেড়াতে গিয়েছিলেন। ১৩ মার্চ ফেরেন। ২৬ মার্চ জ্বর, সর্দি, শ্বাসকষ্টের সমস্যা হওয়ায় স্থানীয় এক চিকিৎসককে দেখান। ওষুধে কাজ না হওয়ায় ২৯ মার্চ সত্যবালা আইডি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে হাওড়া জেলা হাসপাতালে আনা হয়। প্রাথমিক রিপোর্টে সংক্রমণ পাওয়া গেছে। রোগীদের অন্যত্র সরিয়ে ওই ওয়ার্ড ‘‌সিল’‌ করা হতে পারে। নিশ্চিত হতে নমুনা দ্বিতীয় বার পরীক্ষা করা হচ্ছে এসএসকেএমে। হাওড়া হাসপাতালের ঘটনায় ক্ষুব্ধ স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্তারা। রোগী ভর্তির পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কোন্‌ কোন্‌  নার্স, চিকিৎসক এবং রোগীর আত্মীয় হাসপাতালে প্রবেশ করেছেন, বেরিয়েছেন, কোন্‌ অ্যাম্বুল্যান্স ও চালক এসেছেন–‌গেছন, তা খতিয়ে দেখে দ্রুত তালিকা তৈরি হচ্ছে।
রথতলার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ৫৭ বছরের এক প্রৌঢ়ের শরীরে করোনার সংক্রমণ মিলেছে। তিনি কিছু দিন ধরেই জ্বর, শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। রথতলার ওই বাসিন্দার ২৬ মার্চ অসুস্থতা বাড়ায় তঁাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওষুধে কাজ হচ্ছিল না। তিনি ডায়াবেটিস, কিডনির অসুখে ভুগছেন। ডায়ালিসিস চলত। কোভিড–১৯ উপসর্গ থাকায় আইসোলেশনে ভর্তি করে নমুনা পাঠানো হলে এদিন রিপোর্ট পজিটিভ আসে। যে দুই চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা এত দিন দেখছিলেন, তাঁদের হোম কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে। রোগীকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল স্বাস্থ্য দপ্তর। কিন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটজনক, তাই স্থানান্তর সম্ভব নয়। তিনি ভেন্টিলেশনে রয়েছেন। আক্রান্ত ব্যক্তি রথতলার মোড়ে ফাস্টফুডের দোকান চালান। জানা গেছে, কিছু দিন আগে তাঁর শ্যালক মুম্বই থেকে ফিরে কিছু দিন ছিলেন। কামারহাটির পুরপ্রধান গোপালচন্দ্র সাহা মঙ্গলবার জানান, কী করে তিনি সংক্রামিত হলেন, পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। ওঁর সংস্পর্শে যাঁরা এসেছেন, তাঁদের সকলেরই স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা হবে। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করছে স্বাস্থ্য দপ্তর।
সল্টলেকের একটি বেসরকারি হাসপাতালে বিধাননগরের বাসিন্দা ৫১ বছরের এক করোনা–‌আক্রান্ত চিকিৎসাধীন। ২৯ মার্চ ভর্তি হন। অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল। আইসোলেশন ওয়ার্ডে রয়েছেন। তাঁর বাইরে কোথাও যাওয়ার ইতিহাস নেই। পরিবারের কারও রয়েছে কি না, খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। পেশায় তিনি ব্যবসায়ী। আক্রান্তের স্ত্রী ও কন্যা–‌সহ পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে হোম কোয়ারেন্টিন করা হয়েছে এবং কয়েকজনকে রাজারহাটের কোয়ারেন্টিন সেন্টারে পাঠানো হয়েছে। ওই হাসপাতালেই ভর্তি শেওড়াফুলির করোনা–‌আক্রান্ত প্রৌঢ়। তাঁর সঙ্কট পুরো কাটেনি।  
ঢাকুরিয়ার এক বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে মুদিয়ালির বাসিন্দা ৫২ বছরের এক ব্যক্তির। তিনি ২৯ মার্চ জ্বর, শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে ভর্তি হন। তাঁর শরীরেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মিলেছে। তাঁর উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস রয়েছে। তিনি সঙ্কটমুক্ত নন। ভেন্টিলেশনে রয়েছেন। তিনি একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার আধিকারিক। সম্প্রতি বিদেশ বা ভিন্‌রাজ্যে যাননি। তবে কিছু দিন আগে ত্রাণসামগ্রী দিতে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় যান। ফিরে আসার পরই অসুস্থ হন। 
পশ্চিম মেদিনীপুরের দাসপুরের নিজামপুর গ্রামে মুম্বই থেকে আসা ৩২ বছরের এক যুবকের করোনা পজিটিভ এসেছে। এর পরই মঙ্গলবার দুপুরে ওই যুবককে মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ থেকে বেলেঘাটা আইডি–তে স্থানান্তর করা হয়। আক্রান্ত যুবক মুম্বইয়ে সোনার কাজ করতেন। ২২ মার্চ বাড়ি ফিরে অসুস্থ হন। সাধারণ সর্দি, জ্বর ভেবে উপেক্ষা করেছিলেন। জ্বর না কমায় শুক্রবার তাঁকে মেদিনীপুর মেডিক্যালে ভর্তি করা হয়। সোমবার রাতে রিপোর্ট পজিটিভ আসে নাইসেড থেকে। পরিবারে ৭ সদস্য রয়েছেন। তাঁর বাবা সবজি বিক্রেতা। যাঁরা ওই যুবকের সংস্পর্শে এসেছেন, তাঁদের এবং পরিবারের বাকি সদস্যদের আইসোলেশনে রাখার ব্যবস্থা হচ্ছে। পরিবারের ৬ সদস্যের নমুনা নেওয়া হয়েছে। ভিনরাজ্য থেকে ফেরা এ–‌রকম ৪০০ জনের খোঁজ রাখছে স্বাস্থ্য দপ্তর।  
বরানগরের বৃদ্ধের অবস্থাও সঙ্কটজনক। তাঁর বাড়ি ‘‌সিল’‌ করা হয়েছে। তাঁর সংস্পর্শে আসা ২১ জন কোয়ারেন্টিনে। আক্রান্ত বৃদ্ধ বাইপাসের বেসরকারি হাসপাতালে ভেন্টিলেশনে। এখানেই চিকিৎসাধীন বড়বাজারের ব্যবসায়ী ৭৭ বছরের আরেক করোনা–‌আক্রান্ত। বরানগরের বৃদ্ধের ভাইয়ের রিপোর্ট নেগেটিভ। তিনি পঞ্চসায়রের এক বেসরকারি হাসপাতালে। তাঁকে সিঙ্গল কেবিনে পাঠানো হয়। এখানেই ভর্তি নয়াবাদের বৃদ্ধ। তিনি অতি–‌সঙ্কটজনক। ভেন্টিলেশনের মাত্রা বাড়ানো হয়েছে।

জনপ্রিয়

Back To Top