গৌতম রায়: এখনও পর্যন্ত কান পেতে পার্টির অন্দর থেকে যে খবর শোনা যাচ্ছে— বুথ স্তরে পরিকল্পনা করে নিজেদের ভোট ব্যাঙ্ক–কে বিজেপি–‌র দিকে চালনা করেছে সিপিএমের স্থানীয় ইলেকশন ম্যানেজারেরা। এঁরা অবশ্যই পার্টির লোক। নিছক সিমপ্যাথাইজার নন। এবং এটি কোনও অন্তর্ঘাত নয়। আত্মঘাত। যা ঘটেছে, মধ্য–ওপর তলায় যাঁরা নির্বাচনী সংগঠনের দেখভাল করেন, তাঁদের নিশ্চুপ অনুমোদনে। ভোটের ফল বেরোতে, টিভিতে নেতার বয়ানে তো তাই শোনা গেল। এঁরা নাকি ‘একবার শুধু বিজেপি–‌কে এনে তৃণমূলকে হটিয়ে আবার বামপন্থী হয়ে যাবেন!’ 
তা, একবার মরে আবার বেঁচে ফিরে আসা যায়? কত মানুষের কান্না ঘাম রক্তে গড়ে ওঠা এই কমিউনিস্ট পার্টি!‌ বামপন্থা, ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাঁচাতে এই আত্মঘাতের কণামাত্র হয়ে থাকলে তার প্রতিকার প্রয়োজন। ৪ তারিখে রাজ্য কমিটির বৈঠকের আগে বরাবরের মতো জেলা কমিটি বৈঠক এবার তাই আর ডাকা হয়নি। শাস্তি, শো কজ এবার তাই একেবারেই হবে না। বহুশ্রুত সেই আত্মসমালোচনা হবে না। যত দোষ ‘তৃণমূলের সন্ত্রাসের’। তৃণমূলের ভোট ম্যানেজাররা এই তলে-তলে ব্যাপারটা জানতে পেরেছিলেন। কিন্তু বিজেপি কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে কমরেডদের ভোট উপহার নিশ্চিত করেছে। এবার তাঁদের জঙ্গিদের ভরসায় চলছে পার্টি অফিস উদ্ধারের কাজ। 
এখনও বহু বোবা মেরে যাওয়া, আদর্শবাদী সিপিএম কর্মী, বামকর্মী আছেন। তাঁদের বলব, খুব সাবধানে থাকতে হবে। শেষ লোকসভা নির্বাচনে এক বিরাট সমর্থক জনগোষ্ঠী পেছন থেকে সরে গেছেন বলেই শুধু নয়, বামপন্থীরা, কমিউনিস্টরা যদি বিজেপি–‌র সঙ্গে যান, তবে তা শুধু অনৈতিক হয় না, হয় ‘‌ইমমরাল’‌‌— সাধারণ, সর্বমান্য নৈতিকতার প্রতি অবিশ্বস্ততা। যে কোনও দল বা ব্যক্তি তার মরাল হারিয়ে ফেললে তার আর বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে না। সিপিএম ও বিজেপি,  দুটি দলের জিন আলাদা। তার মধ্যে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং করে, তৃণমূলকে ক্ষমতা থেকে হঠাতে বাম–বিজেপি বকচ্ছপ প্রসব করে, নিজের ভোটব্যাঙ্ক পরিকল্পিতভাবে বিজেপি–‌র দিকে চালনা করা, একটি আদর্শবাদী কমিউনিস্ট দলকে সাম্প্রদায়িকতা দুষ্ট দক্ষিণপন্থায় বিলীন করে দেওয়ার শামিল। একেই  ইমমরালিজমের গুরুতর উদাহরণ হিসাবে দেখা হতে পারে। সে জন্যই আদর্শবাদী বাম কর্মীদের আগের থেকে অনেক বেশি সাবধান থাকতে হবে। বাম নেতা ও কর্মীদের আর একটি বিপদের জায়গা হল জনসুরক্ষা সঙ্কুচিত হওয়া। এই যে বিরাট এক বাম ভোটার পাশ থেকে সরে গেলেন, এঁরাই ছিলেন সুরক্ষার গ্যারান্টি।   
আরএসএস চালিত এই বিজেপি দলটি সাম্প্রদায়িক। দেশের মুসলমান মানুষকে এরা হীন চোখে দেখে। জ্যোতিবাবু এজন্য এই দলটিকে অসভ্য বলেছিলেন। কংগ্রেসের সঙ্গে সিপিএমের ঐতিহাসিক মিতালিগুলির শর্তই ছিল বিজেপি–‌র মতো দলকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখা। এটিই জিনের তফাত। মমতা কিন্তু এই বিশাল মোদি–‌ঝড়ে মাথা উঁচু করে থাকলেন। ভোটও বাড়ালেন। আর, যাঁদের যোদ্ধা হওয়ার কথা ছিল, তঁারা উলুখাগড়ার মতো উড়ে গেলেন! অতীতে বারবার রাষ্ট্রপতির শাসনে অত্যাচার করে কি বামেদের শেষ করে দিতে পারা গিয়েছিল? মমতাকেও শেষ করে ফেলা যাবে না। তবে, সিপিএমের পার্টি মেম্বার থেকে নেতা, সবাই তৃণমূলকে হারাতে বিজেপি–‌কে গোপনে ভোট দিয়েছেন তা বলা হচ্ছে না। তবে তাঁরা ‘দেখি না কী হয়’ ভেবে বসেছিলেন। চোরে কমিউনিস্টদের সেকুলার জিনটি চুরি করে নিয়ে গেছে!‌ আর বসে থাকলে হবে না। এই সরকারি ক্ষমতার দাসেদের বিরুদ্ধে জোরদার ইনার পার্টি স্ট্রাগল–এ নামতে হবে। তবে কারা এই লাল সেলাম ঠোকা  নির্বাচকদের ৭+%  সি পি এমের ভোটার? — অন্তরে খাঁটি বামপন্থী। বাম আমলে তেমন শাসক হয়ে ওঠেননি। এসইউসি এবং ছোটখাট নকশালপন্থী দলগুলিও দীর্ঘদিন এমন মানুষদের হৃদয়ের সমর্থন পেয়ে আসছেন। আর, বাম হয়েও যাঁরা বিজেপি–‌কে ভোট দিলেন— এঁরা কারা? ‌এঁরাই বাম আমলের সেই ক্ষমতাবান ‘‌ব্লাইন্ড সাপোর্টার’‌। বামপন্থী ঝাঁকের কইয়ে যোগ দিয়ে প্রবল মুরুব্বি। শ্বশুরবাড়িতে আগুনখেকো বিপ্লবী জামাই! সাধারণ মানুষের সব কিছুতেই কী ঘৃণা। এখন অনেক ক’‌টা বছর মুরুব্বিআনা খোয়ানোয় খুব রাগ। এত রাগ যে জাত খোয়াতেও রাজি। পোস্টাল ব্যালটের নব্বই শতাংশ ভোট বিজেপি–‌তে! যার জাত গেছে সে যখন ক্ষমতার স্বাদ পায় অপমানবোধের আক্রোশে বাকিদের জাত মারার চেষ্টা করে। ব্যর্থ হলে রোষ ঝরে পড়ে। এরও পড়বে। তাই বাম কর্মীরা সাবধান।
বামপন্থী হয়েও কারা বিজেপি–‌কে ভোট দিলেন তার ময়নাতদন্ত এখন চলবে। এর বীজ–বিষয়ে কিছু সংযোজন হল— কমিউনিস্টরা গোটা দেশে এমনকী অবিভক্ত বঙ্গেও ছোট শক্তি হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের মতো করে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। উভয় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, পূর্ববঙ্গে ও পশ্চিমবঙ্গে। ১৯৪৬ সালে তেভাগা আন্দোলন শুরু হতে হিন্দু–‌মুসলিম দাঙ্গা থেমে যায়। কলকাতায় মুসলিম লিগের মদতে কুখ্যাত ট্রাম শ্রমিক দাঙ্গা থেমে যায় শ্রমিক নেতা জ্যোতি বসু রাজাবাজার ট্রাম ডিপোর প্রাচীরের ওপর দাঁড়িয়ে ‘বন্ধুগণ—’‌  বলতেই। বিপদের কথা হল— কোনও কমিউনিস্ট যদি রাগের বশবর্তী হয়ে, এমনকী নির্যাতনের মুখেও, ভুক্তভোগী বলে যদি তাঁর এই সেকুলার জিনটির কথা ভুলে যান, তবে তো তিনি আপন ধর্মচ্যুত হয়েছেন ধরে নিতে হবে। গোপনে কাজটি সারলে হবে না। তিনি তো নিজের কাছে নিজেই অপরাধী হয়ে আছেন। আর কেউ না জানলেও তিনি তো তা জানলেন। মনস্তাপের হাত থেকে পার পাবেন না। তখন আর নিজেকে শ্রদ্ধা করবেন কী!‌ সে বড় ভয়ানক ব্যাপার।‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top