প্রচেত গুপ্ত: আজ একজন বাপির গল্প বলব। 
বাপির ভাল নাম হল.‌.‌.‌না, থাক। ভাল নাম বলা ঠিক হবে না। ডাকনামেই বলি। আমাদের বাপি থাকে কলকাতার গায়ে ছোট্ট এক মফস্‌সল শহরে। সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। লেখাপড়া করে সেখানকার এক অনামী স্কুলে। বাপিকেও বাইরের কেউ চিনত না, তার স্কুলের নামও জানত না। সে না চিনুক, লেখাপড়ায় বাপি অতি ভাল ছেলে।  ছোটবেলা থেকে সে ক্নাসে সবার ওপরে থাকে। মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা ‘‌বাপি’‌ বলতে অজ্ঞান। হবে নাই বা কেন?‌ বাপির পরীক্ষার খাতা দেখবার মতো। ঝকঝকে, নির্ভুল। নম্বরে সে সব ছেলেমেয়েকে টপকে যায়। বাড়িতে তাকে নিয়ে আশার শেষ নেই। বাবা, মা, দিদি, ভাই তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। বাপি ‘‌বড়’‌ হবে। বাপিতে খুশি প্রতিবেশীরাও। তারাও বলাবলি করে, এই ছেলে একদিন সবার মুখ উজ্জ্বল করবে। ঠিক করবে। 
তাই করল বাপি। সবার মুখ উজ্জ্বল করল।‌ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেখা গেল, মেধাতালিকায় বাপির নাম রয়েছে। হুররে!‌ কী আনন্দ! চারদিকে রটে গেল, বাপি স্ট্যান্ড করেছে.‌.‌.‌বাপি স্ট্যান্ড করেছে.‌.‌.‌বাপি স্ট্যান্ড করেছে। ‘‌মাধ্যমিকে দশ’‌ তালিকায় জায়গা পেয়েছে সে। লক্ষ লক্ষ ছেলের মধ্যে একটুখানি মেধাতালিকায় জায়গা পাওয়া কি চাট্টিখানি কথা। সে আট,‌ দশ, বারো যত নম্বরের জন্যই হোক, বেশি তো পেয়েছে। এসেছে তো তালিকায়। মেধাতালিকা কোনও সহজ তালিকা নয়। নিমেষে অচেনা বাপিকে গোটা বাংলা চিনে ফেলল। তার অখ্যাত স্কুল বিখ্যাত হয়ে গেল এক ঝটকায়। হবেই তো সকাল থেকে টিভিতে, রেডিওতে, পোর্টাল নিউজে যে বাপির নাম বলছে। স্বর্গ থেকে যেন পুষ্পবৃষ্টি শুরু হল বাপির ওপর। যাকে বলে, হইহই–রইরই কাণ্ড। হইহই করবার মতোই ঘটনা ঘটেছে। সকাল থেকে বাড়ির সামনে সারি সারি দিয়ে বসে গেল টিভি চ্যানেলের ক্যামেরা। খবরের কাগজের ফটোগ্রাফাররা ভিড় করলেন। ফটো চাই। বাপির মিষ্টি খাওয়ার ফটো। মিষ্টি কে খাওয়াবে? কে?‌‌ মা?‌ নাকি বাবা?‌ বাবা হলেই ভাল। ছেলের জন্য প্রাণপাত করেছেন। তা কেন শুধু?‌ মাকেও চাই। মা–‌ই তো আসল। তিনিই তো আগলে রেখেছিলেন। আহা, ঠাকুমা একটু থাকবে না? এত বড় আনন্দের দিন। নাতিকে তো সেই কবে থেকে কোলেপিঠে মানুষ করেছেন। ওদিকে‌ দিদি আর ভাইকে ছাড়া বাপি যে ছবি তুলতেই চায় না। তবে কী হবে?‌ আচ্ছা, সবাই থাকুক। 
বাপির ছোট্ট বাড়িতে নামল মানুষের ঢল। সবাই বলছে, ‘‌আমি জানতাম। আমি জানতাম। আমি জানতাম। বাপি একটা ভেলকি দেখাবে, আমি সে কথা জানতাম। দেখাল তো। মেধাতালিকায় আসা তো ভেলকি।’ বাপির জন্য এল রাশি রাশি ফুলের তোড়া। রাখবার জায়গা নেই। গাদা‌ গাদা মিষ্টি। টেবিল উপচে পড়ছে। উপহারের ওপর উপহার। বাপির ঘর বোঝাই। তার সঙ্গে বাপিকে নিয়ে সেলফির ঘাড়ে সেলফি উঠছে। এরপর একে একে এলেন পাড়ার মুরুব্বিরা। এলেন মাস্টারমশাই, দিদিমণি। পিছনে লাইন দিয়ে ছাত্রছাত্রীরা। এলেন জেলার হর্তাকর্তারা। আসতে থাকল ফোনের পর ফোন। বাপির হাত ব্যথা, মুখ ব্যথা। উপায় নেই। এইটুকু তো সহ্য করতেই হবে। বাড়িতে কাপের পর কাপ চা হচ্ছে। বানানো চলছে জগ ভর্তি শরবত। হবেই তো। ছেলে ‘‌মেধাতালিকা’‌য় থাকলে এটুকু হবে না?‌ বাপি তো শুধু পাশ করেনি, রেজাল্টই ভাল করেনি শুধু, একেবারে ‘‌মেধাতালিকা’–য়‌ এসেছে। 
ভাল ছেলে বাপি কী করছে?‌  
লাজুক মুখে কখনও মিষ্টিতে কামড় দিচ্ছে, কখনও লোকের জড়িয়ে ধরা সহ্য করে মোবাইল ক্যামেরার সামনে পোজ দিচ্ছে। তবে বেশিক্ষণ থাকা হল না বাড়িতে। বাপিকে একরকম কিডন্যাপ করে নিয়ে গেল টিভি চ্যানেল। স্টুডিওতে বসিয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন। তুমি কেমন করে পড়েছো?‌ কতক্ষণ পড়েছো?‌ কী পড়েছো?‌ কার কাছে পড়েছো?‌ কী জন্য পড়েছো?‌ মেধাতালিকায় নাম দেখে তোমার কেমন লাগছে?‌ তোমার বাবা–‌মায়ের কেমন লাগছে?‌ তোমার মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের কেমন লাগছে?‌ মেধাতালিকায় থাকতে হলে কেমন করে পড়তে হয়?‌ কতটা পড়তে হয়?‌ কী জন্য পড়তে হয়? টিভিতেই শেষ নয়, খ‌বরের কাগজের জন্যও বাপিকে ‘‌মেধাতালিকা’‌র  টিপস দিতে হল। ছবির পাশে বড় অক্ষরে যাবে।  
এ তো গেল ফল প্রকাশের দিনের কথা। এরপর টানা চলল সংবর্ধনা। বাপির যেন শ্বাস ফেলবার অবকাশ নেই। স্কুলের পর স্কুল, ক্লাবের পর ক্লাব, অফিসের পর অফিস। বাপি হঁাপিয়ে উঠল। তা হোক, তাকে যে সবাই চায়। স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান থেকে, গ্রন্থাগারের শতবর্ষ, রক্তদান, ফুটবল ম্যাচ, বসে অঁাকো, একশো মিটার দৌড় কোথাও বাদ নেই। তাকে থাকতে হবে। প্রেরণা হয়ে, দৃষ্টান্ত হয়ে। মেজকাকা নিয়ে এলেন এক নোটবইওলাকে। বইয়ের নাম ‘‌মেধাতালিকায় প্রবেশের একশো সহজ উপায়’‌।‌ বেশি কিছু নয়, বই ধরে দঁাড়িয়ে দুটো কথা বলতে হবে। ফটো তুলে নেওয়া হবে। কলকাতার এক নামকরা পুজো কমিটি উজিয়ে এসে দুর্গাপুজোর বায়না করে গেল। উদ্বোধনে থাকতে হবে। এবার তাদের উদ্বোধনে থাকছে তিন ‘‌তালিকা শিল্পী’‌। দারিদ্র‌্যসীমার নীচের তালিকা, শিল্পী তালিকা এবং মেধাতালিকা। ‘‌মেধাতালিকা’‌ হয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে হবে বাপিকে।
বাপি ক্নান্ত। তারপরেও সে খুব, খুব, খুব খুশি। হবেই তো। তাকে ঘিরে এত আয়োজন, এত টানাটানি আর সে খুব খুশি হবে না? যতই মেধাবী হোক, বাপি তো এখনও ছোট ছেলে।
খবরের কাগজে দেখলাম মাধ্যমিক পরীক্ষার পুনর্মূল্যায়নের (‌স্ক্রুটিনি)‌ ফল বেরিয়েছে। যারা নিজেদের ফলে সন্তুষ্ট হয়নি, তারা ফল পরীক্ষার খাতা রিভিউ করতে দিয়েছিল। সেই পুনর্মূল্যায়নের পর দেখা যাচ্ছে, কারও কারও নম্বর বাড়ায় মেধাতালিকা থেকে পনেরো জন বেরিয়ে গেছে। 
হ্যঁা, ঠিক ধরেছেন, আমাদের বাপিও সেখানে রয়েছে। খুব অল্প কটা নম্বরের জন্য হলেও সে আগের মেধা তালিকায় আর নেই। তালিকা বড় করে এগারো, বারো, চোদ্দো বা একশো জনের পর্যন্ত করা যেতে পারে, কিন্তু সে তো এতদিনের ‘‌মেধা তালিকা’‌ হবে না। হয়তো হবে ‘‌স্বান্তনা’‌। 
এখন কী হবে?‌ বাপি কি ফুলের তোড়া ফেরত দেবে? যারা তাকে সংবর্ধনা দিয়ে‌ছিল, তারাই বা করবেটা কী?‌ মানপত্র ফিরিয়ে নিয়ে আসবে?‌ এত যে হইচই, এত যে হুল্লোড়, এত যে বড় বড় কথা, এত ফটো, এত সাক্ষাৎকার— তার কী হবে?‌ বাপির মন থেকে মুছে দেওয়া হবে?
কী হবে জানি না। কে কী করবে তাও আমার জানা নেই। প্র‌য়োজনও নেই। আমি বাপির কাছে ক্ষমা চাইছি। কারও হয়ে নয়, ক্ষমা চাইছি নিজের পক্ষ থেকেই। বাপি, তুমি ভাল ছেলে। আবারও প্রমাণ হল, পরীক্ষার মেধাতালিকায় নাম থাকা না থাকায় কিচ্ছু এসে যায় না। দেখলে তো ওই তালিকা কত মূল্যহীন, কত নির্মম। এমন বহু বহু ছেলেমেয়ে আছে, যারা ওই তালিকার ধারে কাছেও যেতে পারেনি অথচ জীবনে অনেক বড় কাজ করেছে। তুমিও পারবে। কেঁদো না বাপি, কেঁদো না।
এই লেখায় ব্যবহৃত নাম সম্পূর্ণ কাল্পনিক। যদি কারও সঙ্গে মিলে যায় তাকে আকস্মিক বলে ধরতে হবে।

জনপ্রিয়

Back To Top