দেবেশ রায়: ভোটে কে জিতবে আর কে হারবে— এটা আন্দাজ করা কোনও বিজ্ঞান নয়। কারণ, এই আন্দাজ তৈরি হয় কতকগুলি গড় ধরে–‌ধরে। আবার কতকগুলি কাল্পনিক ঢেউ ধরে–‌ধরে। এ দুটো উপাদানই সমষ্টিগত হিসেব। 
অথচ একটা ব্যালট পেপারের মালিক শুধু একজন ব্যক্তি। একজন মাত্র ব্যক্তি। এই ব্যক্তির সিদ্ধান্ত তার একার এবং একেবারেই একার। কেন সে একজনকে ভোট দিচ্ছে, কেন সে আর–‌একজনকে ভোট দিচ্ছে না— এটা তার একান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কোনও গড় সিদ্ধান্তের প্রতিনিধি হিসেবে সে ওইটুকু একটা পর্দার আড়ালে গিয়ে এক মিনিটেরও কম সময় দাঁড়ায় না। 
পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস–‌বামফ্রন্ট জোট না হওয়ায় বিজেপি–‌তৃণমূল বিরোধী জোট ভাগ হয়ে যাবে আর বিজেপির লাভ হবে— এই হিসেব কালনেমির লঙ্কা ভাগের মতো। একেবারে উল্টো ঘটনা ঘটতে পারে। পশ্চিমবঙ্গ জাতপাতের ভিত্তিতে রাজনীতিচেতন নয়। কংগ্রেস–‌বাম জোট হলে বিজেপি–‌তৃণমূল ভোট হয়তো তারা কিছু পেতে পারত। কিন্তু জোট না–‌হলে বাম–‌কংগ্রেস জোটকে ভোট দেওয়া তো আসলে বিজেপিকে ও নরেন্দ্র মোদিকে ভোট দেওয়া।
বিজেপি–‌তৃণমূল ভাই–‌ভাই— এই রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সিপিআই(‌এম)‌ ছাড়া কেউ বিশ্বাস করে?‌ যদি করত, তা হলে পঞ্চায়েত থেকে কলেজ নির্বাচন পর্যন্ত নানা রকম  ভোটে তার লক্ষণ ধরা পড়ত। পড়েনি। কংগ্রেসের সঙ্গে জোট নিয়েও তো আরএসপি আর ফরোয়ার্ড ব্লকের আপত্তি আছে। 
একটা কথা সার কথা। গত কয়েক বছর ধরে চেষ্টা করেও বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে কোথাও কোনও বুদ্ধিজীবী, লেখক, কোনও শিল্পী, কোনও স্বীকৃত সমাজকর্মী, কোনও খেলোয়াড়কে নিজের দলে টানতে পেরেছে?‌ এমনকী সমাজের দৈনন্দিন জীবনের যে অদৃশ্য তলপেটে দুর্বৃত্তদের লেনদেন ঘটে, সেখানেও বিজেপি কোনও ক্ষমতার পরিচয় দিতে পারেনি। তাদের একের পর এক কর্মসূচি বাতিল করতে হয়েছে। এ–‌কথা এই চৈত্র মাসের দিনের আলোর মতো স্পষ্ট যে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সামাজিক শক্তি হিসেবেই গ্রাহ্য হতে পারেনি। আগে সমাজে পাত পাওয়ার পর তো রাজনীতি। 
তা হলে— একজন পশ্চিমবঙ্গের ভোটার বিজেপিকে হারানো যদি তাঁর প্রাথমিক রাজনৈতিক কর্তব্য মনে করেন, তবে তিনি হয় কংগ্রেস, নয় বামফ্রন্ট এমন বাছাইয়ের মধ্যে যাবে কেন?‌ তিনি কোনও দিনও তৃণমূলকে ভোট না দিলেও, এবার দেবেন— বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে তাঁর ভোটটাকে কার্যকর করতে। বাম–‌কংগ্রেস জোট হলে হয়তো তিনি তাঁদের প্রতীকী ভোট দিতেন, হাজার আশঙ্কা সত্ত্বেও। বাম–‌কংগ্রেস জোট না–‌হওয়ায় তৃণমূলকে ভোট দেওয়া তাঁর ফ্যাসিবাদ–‌বিরোধী কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। বাম–‌কংগ্রেস জোট না–‌হওয়ায় তৃণমূলের ভোট বাড়তে পারে। যে–‌সংখ্যাবিজ্ঞানের নানা সূত্র দিয়ে নির্বাচনবিজ্ঞান তৈরি হয়, তার একটি সূত্র একে বলে ঔচিত্যের নীতি, থিয়োরি অব প্রবিটি। এবারের ভোটে এই নীতি বহু ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যাবে। 
এই সূত্রেই প্রশ্ন উঠেছে— নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে রাগ বা ক্রোধ কি তেমন ফেটে পড়ছে যে তার পরাজয় নিশ্চিত?‌ আসলে, ভোটটাকে একশো মিটার দৌড় মনে করা হলে এ‌সব কথা ওঠে। কে আগে জয়ের ফিতেতে বুক ঠেকিয়েছে। আমরা কি বুঝতে পারছি না, নরেন্দ্র মোদি স্টার্টই নিতে পারেনি। গত দু–‌তিন বছরের মধ্যে একটা উপনির্বাচন বা একটা বিধানসভা জিততে পারেননি, যে–‌আর্যাবর্তে তার ৬০টি আসনের ৫০ শতাংশ ভোট যাদব ও মুসলিমদের। এর সঙ্গে দলিত ভোটারদের যোগ করলে ভোটের শতাংশ ৭০–‌৭৫–‌এর দুর্ভেদ্যতায় গিয়ে ঠেকবে। রাজস্থানের বিধানসভা ভোটের শেষ পর্যায়ে নরেন্দ্র মোদিকে অন্তত দুটি জনসভা বাতিল করতে হয়েছিল— যথেষ্ট লোক না–‌হওয়ার ভয়ে। এমন ঘটনা ভারতের ভোটের ইতিহাসে কখনও ঘটেনি যে, আর্যাবর্তের বামুন, ক্ষত্রিয়, থেকে যাদব–‌মুসলিম–‌দলিত এই প্রত্যেকটি জনগোষ্ঠীর বেশ বড় অংশ ইতিমধ্যেই নরেন্দ্র মোদিকে আউট করে দিয়েছে। 
মোদির পায়ের তলায় মাটি নেই। ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top