ভি লেনিনকুমার: কেন্দ্রে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই নানা ধরনের বিরোধিতার চঁাদমারি হয়েছে দিল্লির জেএনইউ। লোকে প্রশ্ন করে, কেন?‌ একটাই কারণ। জেএনইউ–এর মৌলিক গণতান্ত্রিক চরিত্র। লোকে বলে, জেএনইউ বামপন্থা প্রভাবিত। বামপন্থী সংগঠনগুলোর দাপট বেশি সেখানে। সব সিদ্ধান্ত বামপন্থীরাই নেয়। কিন্তু তারা সবাই গণতান্ত্রিক অধিকারগুলোকেই ওপরে তুলে ধরে। ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা বলে। বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার কথা বলে। এই যে দেশে শিক্ষার গৈরিকীকরণের চেষ্টা চলছে, জেএনইউ–এর ছাত্রছাত্রীরা সবসময় সেই নিয়ে প্রশ্ন তোলে। উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণায় সরকারি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে। শিক্ষার মৌলিক অধিকার নিয়ে কথা বলে জেএনইউ। শিক্ষার খরচ কত হওয়া উচিত, সেই নিয়ে মতামত দেয়। এক কথায় বললে, জেএনইউ সামাজিক সমতার তত্ত্বে বিশ্বাসী। যে, সব মানুষ সমান এবং তাদের সবার সমান সুযোগ, সমান অধিকার পাওয়া উচিত। সরকার ঠিক সেটাই পছন্দ করে না। তারা চায় না লোকের উত্তরণ হোক। বরং লোককে আরও নীচে টেনে নামাতে চায়। তারা চায়, লোকে বিনা প্রতিবাদে, মাথা হেঁট করে সেটা মেনে নিক। যারা মাথা নোয়াতে চায় না, তাদের বুলডোজার দিয়ে পিষে দিতে চায় এই সরকার। কিন্তু জেএনইউ সরকারের সেই চেষ্টাও প্রতিহত করে, ব্যর্থ করে দেয় বার বার। তার থেকে যে হতাশা তৈরি হয়, সেটাই আসলে ফুটে বেরোয় জেএনইউ–এর বিরুদ্ধে সরকারের লাগাতার আক্রমণে।
এবারই যেমন জেএনইউ–তে পড়ার বিভিন্ন ধরনের খরচ এক ধাক্কায় অনেকটা করে বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা হল। অথচ জেএনইউ–তে যারা পড়ে, তাদের ৪০ শতাংশই গরিব শ্রমজীবী পরিবার থেকে আসে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে যুক্তি দিচ্ছে— প্রতি বছর তাদের কোটি কোটি টাকা ভরতুকি দিতে চলে যাচ্ছে। কিন্তু এই যুক্তি তো ধোপে টেকে না!‌ সরকার তিন হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে স্রেফ বিজ্ঞাপন দিতে! প্রধানমন্ত্রীর‌ বিদেশ সফরের পিছনে কতশো কোটি টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। সেখানে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সরকার নাকি ১০ কোটি টাকা দিতে পারছে 
না!‌ এটা কি আদৌ যুক্তিগ্রাহ্য?‌ বরং এটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, সরকার কোন বিষয়টাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। শিক্ষার থেকে একটা বিরাট মূর্তি তৈরি সরকারের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ!‌
অথচ আমরা বিশ্বাস করি, শিক্ষা একটা অধিকার। সবার সেই অধিকার পাওয়া উচিত। শিক্ষা যেন সবার সাধ্যের মধ্যে থাকে। এবং সেই শিক্ষা হতে হবে বৈজ্ঞানিক শিক্ষা। যা স্থিতাবস্থাকে প্রশ্ন করতে, চ্যালেঞ্জ করতে শেখাবে। ঠিক এই কারণেই জেএনইউ সবার থেকে আলাদা, সবার থেকে এগিয়ে। জেএনইউ প্রশ্ন করতে শেখায়। দরিদ্র পরিবার থেকে যে ছেলে, বা মেয়েটি জেএনইউ–তে পড়াশোনা করতে আসে, সে নিজের সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থান, এমনকি নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কেও প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। জাতপাত, ধর্ম, সব কিছু নিয়ে সে প্রশ্ন করে। ফলে জেএনইউ–তে কে কীরকম দেখতে, কার চেহারা কেমন, পোশাকআশাক কীরকম, সে নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। বরং সবাই পরখ করে দেখে, কে কতটা জানে। সেই জ্ঞান কীভাবে সে অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেয়। সমাজে, জনকল্যাণে সেই জ্ঞান কতদূর কাজে লাগে। সবসময় এই যাচাই করে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলে। বিজেপি স্বাভাবিক কারণেই সেটা পছন্দ করে না। যেহেতু জেএনইউ–এর এই প্রক্রিয়া ভবিষ্যতের রাজনৈতিক নেতাদের গড়ে তোলে। জেএনইউ–এর ছাত্র–ছাত্রীরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে যায়, বৃহত্তর সমাজজীবনে প্রবেশ করে, তখনও তাদের প্রশ্ন করা থামে না।
মজার কথা হচ্ছে, জেএনইউ–তে থাকতে যারা দক্ষিণপন্থী ছাত্র রাজনীতি করে, তারাও কিন্তু অন্যদের থেকে এগিয়ে থাকে। তারাও জেএনইউ–এর প্রশংসা করে। স্বীকার করে, জেএনইউ ভাল বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের দেশের অর্থমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, দুজনেই জেএনইউ–এর প্রাক্তনী। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই প্রচুর ছেলেমেয়ে আইএএস, আইপিএস পড়তে গেছে। দেশের প্রথম যে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আইএএস অফিসার, সেই মেয়েটি জেএনইউ–এর। সেনাবাহিনীতে বহু জেএনইউ প্রাক্তনী আছে। অনেক শিক্ষাবিদ আছে। এরা সবাই সমাজে, নিজেদের পেশায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারছে, তার কারণ কিন্তু জেএনইউ–এর চিন্তাধারা, যা এদের সবার মধ্যে শিকড় ছড়িয়ে বসে গেছে। সরকার যে সেই মুক্তচিন্তাকে সহ্য করতে পারবে না, সেটা নেহাতই স্বাভাবিক।
কাজেই শিক্ষাকে মহার্ঘ করে তোলার এই সরকারি অপচেষ্টার বিরোধিতা করে যাবে জেএনইউ। কর্তৃপক্ষ যদিও ভাব দেখাচ্ছে যে তারা ফি কমাবে। কিন্তু পঁাচ হাজার টাকা বাড়িয়ে দু–তিনশো টাকা কমানোটা হাস্যকর। তার পর যারা হস্টেলে থাকে, তাদের জন্যে ‘‌ড্রেস কোড’‌ চালু করা, বা রাতে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফিরে আসার নিয়ম— এটা আদতে মানুষের অবাধ গতিবিধির অধিকারকে অস্বীকার করা। ছেলে মেয়েরা সবাই সবার সঙ্গে খোলা মনে মিশবে, কথা বলবে, যখন যেখানে ইচ্ছে যাবে। তা নয়, ফরমান জারি হল, সবাইকে ১১টার মধ্যে হস্টেলে ফিরে আসতে হবে!‌ এর মানে কী!‌ সবার বয়স আঠেরো বছরের ওপরে। সবাই ভোট দেয়। ভোট দিয়ে প্রধানমন্ত্রী, সাংসদ নির্বাচন করতে পারে। অথচ নিজের ইচ্ছেমতো বাইরে যেতে পারবে না!‌ কাজেই এর বিরুদ্ধে লড়াইটা চলবে। অবাধ চলাফেরা, মেলামেশার অধিকার খর্ব করাও মৌলিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বলে মনে করে জেএনইউ।
(‌লেখক, প্রাক্তন সভাপতি, জেএনইউ ছাত্র সংসদ)‌  ‌

জনপ্রিয়

Back To Top