সুচিক্কণ দাস: পরিবেশবাদীদের তীব্র বিরোধিতা উপেক্ষা করে উত্তরপূর্ব অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে কয়লা তোলার অনুমতি পেয়েছে প্রধানমন্ত্রী মোদির ঘনিষ্ঠ, গুজরাটের আদানি গোষ্ঠী। সেই কারমাইকেল খনি প্রকল্পের কয়লা জাহাজে চাপিয়ে আনা হবে ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী এলাকা গোড্ডায়। কয়লা পুড়িয়ে, সেখানকার বাতােস বিষ ছড়িয়ে তৈরি হবে তাপ বিদ্যুৎ। স্পেশাল ইকনমিক জোন, অর্থাৎ সেজ এলাকার সব রকম সুবিধে পাবে সেই প্রকল্প। তবে দূষণ সইতে হলেও বিদ্যুৎ পাবে না গোড্ডা। উৎপাদিত বিদ্যুতের সবটাই রপ্তানি হবে বাংলাদেশে। ২০১৫ সালে মোদির বাংলাদেশ সফরের সময় সেই রপ্তানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মোদির সফরসঙ্গী ছিলেন আদানি গোষ্ঠীর প্রধান গৌতম আদানি। 
অথচ চীন, আমেরিকা এবং ইউরোপের দেশগুলি পরিবেশ দূষণ এড়াতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার কমাচ্ছে। যেখানে চালু রয়েছে, সেখানে নানা নিয়ন্ত্রণ বিধি। গুরুত্ব বাড়ছে বায়ুশক্তি থেকে বিদ্যুৎ ও সৌর বিদ্যুতের। কিন্তু এশিয়ার বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে কয়লার গুরুত্ব বেড়েই চলেছে। গুজরাটের আদানি গোষ্ঠীর সম্পত্তির পরিমাণ ১৪০০ কোটি ডলার। খনি, বিদ্যুৎ, বন্দর, মালবাহী জাহাজ শিল্পে এই গোষ্ঠীর বিপুল বিনিয়োগ। এছাড়া কৃষিপণ্য, জমিবাড়ি এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও। বন্দর, খনি ও জাহাজ চালু রাখতে দরকার বিপুল পরিমাণ কয়লা। সেকারণে দেশে তো বটেই, বিশ্বের নানা প্রান্তে কয়লা খনিতে বিনিয়োগ করে রেখেছে এই সংস্থা। গৌতম আদানির মতে, কয়লার সমালোচনা করা উচিত নয়। কারণ এদেশে প্রচুর কয়লা। ভারতের কাছে সস্তায় জ্বালানির যেহেতু কোনও বিকল্প নেই, বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা মেটাতে বিকল্প নেই। 
অস্ট্রেলিয়ায় কয়লা অঢেল। সেই কয়লা রপ্তানি করে বিদেশি মুদ্রা আয় করে কয়লা খনিগুলি। সেদেশের বৃহত্তম রাজ্য কুইনসল্যান্ডের গ্যালিলি বেসিনে রয়েছে কয়লার আদিম ও বিপুল স্তর। দূষণের কারণে ওই কয়লা তোলায় আপত্তি ছিল স্থানীয়দের। বিরোধিতা করে আন্দোলনে নামেন সেদেশের পরিবেশবাদীরাও। আপত্তি ছিল দেশের রাজনৈতিক মহলের একাংশেরও। তখন মাঠে নামে আদানি গোষ্ঠী। রীতিমতো সভা করে স্থানীয়দের বোঝানো হয়, খনি চালু হলে তাঁদের চাকরি হবে। অর্থকরী সম্ভাবনা বোঝাতেই বোধহয় দেদার টাকাও ছড়ায় আদানিরা। বাস্কেটবলের কোর্ট তৈরির জন্য চঁাদা থেকে নানা সামাজিক অনুষ্ঠানেও দরাজহস্ত। সেসব অনুষ্ঠানে আদানিদের হয়ে সওয়াল করতে নামেন প্রাক্তন রাজনৈতিক নেতা–কর্মী ও প্রভাবশালীরা। ক্রমশ হাওয়া ঘুরতে শুরু করে।
এর মধ্যে ভোট এসে পড়ে অস্ট্রেলিয়ায়। দেখা যায়, পরিবেশ রক্ষায় কড়া ব্যবস্থা চান অধিকাংশ ভোটার। অন্যদিকে রক্ষণশীল শিবিরের রাজনীতিকরা দাবি তোলেন, গ্যালিলি বেসিনের কয়লা তোলা না হলে দেশের আয় কমবে। হবে না কর্মসংস্থান। জাতীয় বিজ্ঞান সংস্থার পরামর্শ উপেক্ষা করেই অস্ট্রেলিয়ার ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল দল জানিয়ে দেয়, তারা গ্যালিলি বেসিনের কয়লা তোলার পক্ষে। মে মাসের ভোটে জেতে তারাই। এর পরই গতি পায় কারমাইকেল প্রকল্প।
আদানিদের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ ঠিল, তাদের ইজারা নেওয়া অস্ট্রেলিয়ার অ্যাবট বন্দরের জলে বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নিয়মিত। এতে ক্ষতি হচ্ছে সমুদ্রের তলায় গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের প্রাকৃতিক প্রবাল প্রাচীরের। চাপে পড়ে আদানিরা কথা দেয়, তারা বিষয়টিতে নজর দেবে। এরপরেই কারমাইকেল প্রকল্পে ছাড়পত্র দেয় অস্ট্রেলিয়া সরকার।
কিন্তু গ্যালিলি বেসিনের বিপুল ওই কয়লার স্তরের পাশেই রয়েছে প্রাকৃতিক জলের ভাণ্ডার। আশঙ্কা, কয়লা তুলতে গেলে ক্ষতি হবে জলভাণ্ডারের। শুকিয়ে যেতে পারে একটি ঝরনাও। স্থানীয়দের কাছে পবিত্র সেই ঝরনা সংরক্ষণের জোরালো দাবি উঠলেও তা খারিজ হয়ে গেছে। তাহলে দূষণ?  শিকাগো বিশ্বিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ অনন্ত সুব্রহ্মণ্যম বলেন, যদি শুধু বায়ুদূষণের সামাজিক খরচ হিসাব করা যায়, তাহলে সবচেয়ে দূষণ হয় কয়লায়। যদি সেই খরচকে টাকায় রূপান্তরিত করা হয় তাহলে কয়লা প্রকল্প তৈরির আর্থিক যুক্তিই থাকবে না। ঘটনা হল, এসব সত্ত্বেও ছাড়পত্র পেয়েছে কুইনসল্যান্ডের কারমাইকেল খনি প্রকল্প। কাজ শুরু হবে শিগগরিই।
কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সবথেকে এগিয়ে আমেরিকা ও চীন। তাদের তাপ বিদ্যুত কেন্দ্রে রয়েছে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করার আধুনিকতম ব্যবস্থা। কিন্তু ভারতের কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলিতে সেরকম কোনও নিয়ন্ত্রণ বিধি নেই। সেগুলো স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। জানিয়েছে জুরিখের এনভায়রনমেন্টাল ইনস্টিটিউট। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ায়। ত্বরান্বিত করে বিশ্ব উষ্ণায়ন। বাতাসে যোগ করে ভাসমান কণা, সালফার ডাই অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড ও পারদ। এতে ক্ষতি বেশি হয় জনস্বাস্থ্যের। দেখাই যাচ্ছে এসব রিপোর্টকে থোড়াই কেয়ার করে আদানি গোষ্ঠী। তাদের কয়লা সাম্রাজ্য ভারত থেকে অস্ট্রেলিয়া। তার  পিছনে রয়েছে দুই দেশের শাসকদেরই প্রবল সমর্থন। ‌‌‌
কাজেই কুইন্সল্যান্ডের কয়লা আসবে ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী এলাকা গোড্ডায়। তৈরি হচ্ছে আদানিদের বিরাট তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প। তার জন্য সরকারের অনুমতি নিয়েই দখল করা হয়েছে উর্বর কৃষিজমি। পুলিস দঁাড় করিয়ে রেখে বুলডোজার দিয়ে সব গুঁড়িয়ে শুরু হয়েছে নির্মাণকাজ। উপড়ে ফেলা হয়েছে নারকেল গাছের সারি। নির্মূল করা হয়েছে ধানজমি, আমবাগান। মোবাইল–ভিডিওয় দেখা গেছে, আধিকারিকদের পায়ে পড়ে জমিরক্ষার আর্জি জানাচ্ছেন মহিলারা। সে আবেদনে কান দেয়নি কেউ। উল্টে যে পাঁচজন জমি দিতে রাজি হননি তাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে।
গোড্ডাই দেশের একমাত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল যেখানে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সেজ হওয়ায় আদানি গোষ্ঠীকে আমদানি করা কয়লা ও যন্ত্রপাতির ওপর দিতে হবে না কোনও লেভি। বিদ্যুতের দাম নির্ধারণেও নিশ্চযই মিলবে সুবিধা। এই কারখানার জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সংস্থার থেকে আদানি গোষ্ঠী পেয়েছে ৭০ কোটি ডলার ঋণ। আরও ৭০ কোটি ঋণ দেবে এমন একটি রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সংস্থা, যারা শুধু গ্রামীণ বিদ্যুতায়ণের জন্য। স্পষ্টতই আইন ভেঙে মঞ্জুর করা হবে ঋণ। যাঁদের জমি গেল, যাঁদের বাসস্থানের বাতাসে বিষ মিশবে, তাঁদের কপালে কিন্তু বিদ্যুৎ জুটবে না। তাঁদের প্রাপ্য শুধু দূষণ।‌

আদানিকে আটকাও। কুইন্সল্যান্ডে প্রতিবাদরত তরুণীর কর্ণভূষণ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কর্ণপাত করেনি অস্ট্রেলিয়ার সরকার।

জনপ্রিয়

Back To Top