বাহারউদ্দিন: ক্যাব-বিরোধী আগুনে অসম পুড়ছে। জ্বলে উঠছে দাউ দাউ ক্ষোভ। রাস্তায় উত্তাল জনস্রোত। কার্ফু লঙ্ঘন করে এখানে-ওখানে ছড়িয়ে পড়ছে ক্ষুদ্ধ তারুণ্য। উত্তেজক পরিস্থিতি আঁচ করে অসমের চার এলাকায় গতকাল রাতে কার্ফু জারি করে প্রশাসন। তবু উত্তেজনা থামেনি।বৃহস্পতিবার গুয়াহাটিতে ফ্ল্যাগ মার্চ করে সেনা। 
শীতেও নানা শহরে গরম হাওয়া। গ্রামাঞ্চলেও অশান্তি ছড়াচ্ছে। সারা অসম ছাত্র সংস্থা প্রতিবাদের ডাক দিয়েছে। স্বেচ্ছাসেবী অখিল গগৈ-এর নেতৃত্বাধীন কৃষক মুক্তি সংগ্রাম কমিটি বলেছে, রাস্তায় বেরিয়ে আসুন প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। উজান ও নিম্ন অসমের বিভিন্ন শহরে চলছে রাস্তা অবরোধ। প্রতিবাদে শামিল কেবল অসমিয়া জনগোষ্ঠী নন, সমতলীয় উপজাতিরাও সরব। সবার আশঙ্কা, বিভাজনের অঙ্কে চালিত নাগরিকত্ব বিলের জন্য রাজ্যের ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির ওপর চরম আঘাত পড়বে। ধর্মীয় হয়রানির অভিযোগ তুলে নতুন জনস্রোত অসমে প্রবেশ করবে, বেহাত হবে মাটি, বাড়ি। অসমের ভূমিপুত্রদের বিপন্নতা কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। এ আশঙ্কা হয়তো অমূলক, হয়তো মাঝপথে থমকে যাবে প্ররোচিত ষড়যন্ত্র। কিন্তু প্রসঙ্গত বলা দরকার, ’‌৮০ দশকের অসম অন্দোলনের মুহূর্তে বিদেশি সমস্যা নিয়ে আইন সংশোধনের প্রসঙ্গ ওঠেনি। স্বাধীনতার  ৭ দশক পরে সংখ্যার জোরে কেন্দ্র সংসদের দুই কক্ষে, যেভাবে ধর্মীয় নিপীড়নের দোহাই তুলে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের ভারত প্রবেশের, ভারতে বসবাসের আইনি অনুমোদন পেশ করল, তা কেবল আভ্যন্তরীণ সঙ্কট তৈরি করবে না, বিদেশ নীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। দ্বিতীয়ত, জাতিবিদ্বেষে নতুন আবহ তৈরি করবে দেশের নানা প্রান্তে। আর বিদ্বেষী বিষবৃক্ষের উগ্র শ্বাসপ্রশ্বাসে খণ্ডিত বহুভাষিক অসমে, বিভিন্ন জনপদের মধ্যে বড় বড় ফাটল তৈরি হবে। প্রথমেই ফাটলের ফাঁদে পড়বে বৃহত্তর বাঙালি।
বলা বাহুল্য, ১৯৬৯ সাল থেকে ’‌৮৬ সাল পর্যন্ত যে ভয় আর উদ্বেগ, যে জাতিবিদ্বেষ তৈরি হয়েছিল, এখানে-ওখানে বিদেশি খেদাও আন্দোলনের বিকৃত জেরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল যে দুঃস্বপ্ন, তার সজোর প্রত্যাবর্তনের দুর্লক্ষণ আবার ভাসছে। ’‌৭০-’‌৮০ দশকের অসম আন্দোলন ছিল বহিরাগতদের বিরুদ্ধে। ভোটার তালিকার সংশোধনকে কেন্দ্র করে। হঠাৎ নাটকীয়ভাবে তা বিদেশি খেদাও আন্দোলনের চেহারা নেয় এবং প্রবল রোষের কবলে পড়েন বঙ্গভাষীরা। 
আবার ওই পরিস্থিতি কী ফিরে আসবে? যদি ফিরে আসে, তাহলে আগের মতোই তার অবধারিত শিকার হবে বাঙালি। যে বিদেশি নয়, যে উদ্বাস্তু হয়ে আসেনি, তার গায়েও বিদেশির অপবাদ লেপ্টে দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার দেশবিরোধী, জাতিবিরোধী উগ্রতা। যারা দেশপ্রেমের কথা বলে, আবার এক জাতি, এক ভাষার আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা নিয়ে গণতন্ত্রের মূল ভিতে ঘা দেয়.‌.‌.‌ তাদের প্রকাশ্য দ্বিচারিতা যে কী ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনছে, তার প্রথম বিস্ফোরণ প্রকট হয়ে উঠছে অসম আর ত্রিপুরায়। বিভাজক কখনও দেশপ্রেমিক হয় না। তার ভেতরে নিহিত অপশক্তি বাইরের চেহারায় ইন্ধন জুগিয়ে তাকেও একসময় সম্মিলিত অশুভ শক্তির সরাসরি অংশীদার বানিয়ে দেয়। এটাই ইতিহাসের চক্রবৃত্তের নির্দেশ।

পুলিশের মুখোমুখি। গুয়াহাটিতে, বৃস্পতিবার। ছবি:পিটিআই 

জনপ্রিয়

Back To Top