জয়নাল আবেদিন: উৎসর্গের উৎসব ইদুজ্জোহা। ইদুজ্জোহাকে কোরবানিও বলা হয়ে থাকে। আরবি কুরব শব্দ থেকে কোরবানির উৎপত্তি। যাকে বাংলা করলে দাঁড়ায় নৈকট্য। প্রতি বছর আরবি জিলহজ মাসের দশ তারিখে কোরবানি উৎসব পালিত হয়ে থাকে।
বাঙালির দুর্গোৎসবের মতোই এই ইদুজ্জোহা উৎসব। মিলনের উৎসব ইদুজ্জোহা, সম্প্রীতির উৎসব ইদুজ্জোহা। প্রিয়জনের কাছে ঘরে ফেরা এবং আল্লার কাছে কোরবানি দেওয়ার উৎসব ইদুজ্জোহা। মহা সমারোহে বিকিকিনির হাট। সেই আনন্দ উৎসবের আবশ্যিক অঙ্গ হল কোরবানি। মুসলমান সমাজে কোরবানির ঐতিহ্য পালিত হয়ে আসছে হাজার হাজার বছর ধরে। এই যে ঐতিহ্য তা প্রতিষ্ঠিত হয় হজরত ইব্রাহিমের সময় থেকে। হজরত ইব্রাহিমের আনুগত্য পরীক্ষার জন্য আল্লাহ তাঁকে প্রিয় বস্তুকে কোরবানি করার নির্দেশ দেন। স্বপ্নে পাওয়া সেই নির্দেশ পালন করতে গিয়ে হজরত ইব্রাহিম নিজের পুত্র হজরত ইসমাইলকে কোরবানি দিতে উদ্যত হন। আল্লাহর পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হন। তাঁরই নির্দেশে ইসমাইলের পরিবর্তে কোরবানি দেওয়া হয় একটি দুম্বাকে। হজরত ইব্রাহিমের এই ত্যাগের আদর্শকে স্মরণ করেই বিশ্বজুড়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা কোরবানি করে থাকেন। শুধু কোরবানির ক্ষেত্রেই নয়, হজব্রতের নানা আচারের মধ্য দিয়েও তাঁরা হজরত ইব্রাহিমকে স্মরণ করেন। কোরবানির মধ্য দিয়ে মুসলমানরা জানিয়ে দেন, আল্লাহর জন্য তারা সর্বোচ্চ ত্যাগ করতেও প্রস্তুত। তাই ইদুজ্জোহা একদিকে ত্যাগের, অন্যদিকে ঐতিহ্যের মহিমায় ভাস্বর। সেই মহিমামণ্ডিত ধর্মীয় কোরবানির উৎসব আজ।
নানান ধর্মের দেশ ভারতবর্ষ। সেই ভারতবর্ষে ধর্মের উৎসবের চেহারা তো ভিন্ন হবেই। খ্রিস্টানদের বড়দিন, বাঙালির দুর্গোৎসব, তেমনই মুসলমানদের ইদুজ্জোহা, ইদ–‌উল–‌ফিতর, মহরম। শরিয়তের ভাষায় আল্লার সন্তুষ্টি লাভের জন্য নিজের প্রিয় বস্তুটিকে ত্যাগ করার নামই কোরবানি। তাই ইদুজ্জোহার উদ্দেশ্য হল পশু জবাই। মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্য নানাবিধ পশু আল্লার উদ্দেশে ইবাদত দেওয়া। এই ইবাদত ইসলামে তিন ভাবে করা যায়। একটি শারীরিক, অন্যটি আর্থিক এবং তৃতীয়টি হল আর্থিক ও শারীরিক। যেমন নামাজ ও রোজা হল শারীরিক ইবাদত। জাকাত ও কোরবানি হল আর্থিক ইবাদত। তৃতীয়টি হল আর্থিক ও শারীরিক, যেমন হজব্রত পালন করা।
অর্থনৈতিক দিক থেকে যাঁরা ক্ষমতাশালী তাঁদের নামাজ, আর্থিক, শারীরিক, জাকাত, কোরবানি এবং হজ–‌সহ সব ইবাদত করতে হয়। অন্যদিকে দরিদ্র মানুষদের জন্যও শরিয়তে নিদান আছে। সেখানে বলা হয়েছে যাঁরা ব্যয়বহুল হজে যেতে পারবেন না তাঁরা কোরবানি দিতে পারবেন। সেইজন্যই হজরত মুহাম্মদ কোরবানি করার নির্দেশ দিয়েছেন। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, উপচার যদি শুদ্ধ না হয় তাহলে আল্লাহতায়ালা তা গ্রহণ করেন না। এখানে শরিয়তের একটা অংশ তুলে ধরা যেতে পারে। মানব সভ্যতার শুরুতে যখন কোরবানির বিধান চালু হয় তখন থেকেই এ ধারা চলে আসছে। কোরবানির সূচনা হয় হজরত আদমের দুই ছেলে হাবিল ও কাবিলের কোরবানির মাধ্যমে। তাঁদের একজনের কোরবানি আল্লাহ গ্রহণ করেছিলেন, অন্যজনের করেননি। এই কোরবানি গ্রহণ না করার পিছনে ছিল সেই কোরবানি যথেষ্ট শুদ্ধ ছিল না।
বর্তমান সমাজে কোরবানি নিয়ে চলে নানা প্রতিযোগিতা। অনেকে তাঁদের প্রভাব প্রতিপত্তি দেখানোর জন্য প্রভূত অর্থে পশু কিনে প্রতিপত্তি দেখাতে ও সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শন করতে চান। কিন্তু শুধু প্রভাব প্রতিপত্তি দেখানোর উদ্দেশ্যে কিছু লাভ করা যায় না। কোরবানির মধ্যে যদি লোভ থাকে তাহলে সেই কোরবানিতে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন না অর্থাৎ সামাজিক সম্মান বজায় রাখার জন্য কোরবানি করলে তা আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। প্রতিবেশীকে অভুক্ত, নিরন্ন রেখে কোনও কোরবানি সফলতা পায় না। এতে আল্লাহ অখুশিই হন।
মনে রাখতে হবে ইদ সবার জন্য। এখানে ধনী দরিদ্রের ফারাক নেই। খুব ভোরে সূর্যোদয়ের পর দু রাকাত কোরবানির নামাজ পড়ে তবেই কোরবানি করা যায়। নামাজ না পড়ে কখনই কোরবানি করা যায় না।
আসল কথা হল ইদুজ্জোহার যে কোরবানি ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করার জন্য নিবেদন করা হয় তা আপামর মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের কাছে হিন্দুদের দুর্গোৎসবের মতোই। এই ইদকে সামনে রেখে দেশের ও দেশের বাইরে যে যেখানে থাকেন এক অমোঘ টানে ঘরে ফিরে আসেন। যাঁর যা সামর্থ্য তেমন উপকরণ দিয়েই আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে চান। চেতনাকে শুদ্ধ করতে চান। ধনীরা গরিবের ঘরে কোরবানির মাংস পাঠান। এক মিলনের সুর বেজে ওঠে ইদুজ্জোহার দিনে।

জনপ্রিয়

Back To Top