সিদ্ধার্থ জোয়ারদার 

মুখভার লন্ডনবাসীর। অতিমারীর প্রথম ধাক্কা সামলে গোটা বিশ্ব যখন একটু একটু করে স্বাভাবিক জীবন–‌ছন্দে ফিরতে চাইছে, লন্ডনের ক্রিশ্চান জনগণ যখন বড়দিনের উৎসবে নিজেদের শামিল করার মানসিক  প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই বাড়ির বাইরের জমায়েত ও চলাফেরা নিয়ে সরকারি কড়াকড়ি ঘোষণা করা হল এই বছরের বাকি দিনগুলোর জন্য। কঠোর বিধিনিষেধ আরোপিত হল লন্ডন শহরে। খোদ লন্ডনে এবারকার ক্রিসমাস উৎসব হবে জৌলুসহীন।  দেশের বাকি অংশে নিয়মের কড়াকড়ি না থাকলেও, সামগ্রিক আনন্দ যে নিরানন্দে পর্যবসিত হয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।   
এই চিত্রনাট্যের ‘‌ভিলেন’‌-নবরূপে প্রতীয়মান করোনাভাইরাস। ব্রিটেনে খোঁজ পাওয়া নভেল করোনার এই ‘‌তুতো’‌ ভাইরাসকে বলা হচ্ছে একটি নতুন ‘‌ভ্যারিয়েন্ট’‌। নাম ‘ভি ইউ আই-২০২০১২/০১’ (‘ভ্যারিয়েন্ট আন্ডার ইনভেস্টিগেশন–‌ ফার্স্ট ওয়ান অফ ডিসেম্বর ২০২০’-র সংক্ষিপ্ত রূপ), কেউ কেউ আবার এটিকে একটি নতুন বংশধারা বা ‘‌লিনিয়েজ’‌ হিসেবে অবহিত করেছেন। কারণ, এই ভাইরাসের চরিত্রগুলো আজ অবধি জানা ভাইরাসগুলোর থেকে অনেকটাই আলাদা। নাম দেওয়া হয়েছে– ‘বি. ১.১.৭’।
ঘন ঘন জিন পরিবর্তন করে এই ভ্যারিয়েন্ট এতটাই অন্যরকম (পড়ুন মারাত্মক) হয়ে উঠেছে যে, এর দৌলতে সংক্রমণ বেড়েছে ৭০ শতাংশ। পাশাপাশি একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়িয়ে পড়ার দক্ষতা বেড়েছে প্রভূত। আশঙ্কার কথা, করোনাভাইরাস যে প্রত্যঙ্গ (অর্থাৎ স্পাইক প্রোটিন)–‌কে কাজে লাগিয়ে কোষের গ্রাহককে জাপটে ধরে কোষে ঢুকে পড়ে, সেখানে ঘটেছে ৮টি মৌলিক পরিবর্তন।  এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে, দুটি জায়গায়। স্পাইক প্রোটিনের ৫০১ নম্বর ও ৬৮১ নম্বর স্থানে অবস্থিত অ্যাসপারজিন ও প্রোলিন নামক দুটি  অ্যামাইনো অ্যাসিড-এর জায়গায় দেখা যাচ্ছে  যথাক্রমে টাইরোসিন ও হিস্টিডিনকে। প্রথমটি রিসেপ্টর বাইন্ডিং ডোমেনের অংশ এবং দ্বিতীয়টি কোষের ফুরিন উৎসেচকের কার্যক্ষেত্র হওয়ায় ভাইরাসের কোষে প্রবেশের প্রেক্ষিতে এই পরিবর্তন ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এ হেন নতুন ভাইরাসটি কোষ থেকে কোষে তথা এক মানুষ থেকে অন্য মানুষে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে যে মুনশিয়ানা দেখাবে, তা সহজেই অনুমেয়। অর্থাৎ সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি অবশ্যম্ভাবী। যাবতীয় আশঙ্কার উৎস এখানেই।
সিঁদুরে মেঘ দেখছে ইউরোপের বেশ কয়েকটা দেশ। এদের মধ্যে ইতালি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস অন্যতম। কারণ, এই দেশগুলোতেও এই ভ্যারিয়েন্ট ভাইরাসের অস্তিত্ব মিলেছে। অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বিশ্বের অন্য প্রান্তে অবস্থিত দেশেও ইতিউতি উঁকি মারছে এই ভ্যারিয়েন্ট। নতুন এই ভাইরাসের আকৃতি ও প্রকৃতি নিয়ে ইতিমধ্যেই বিজ্ঞানীমহল চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু করে দিয়েছেন। জানা যাচ্ছে, ভাইরাসের আরএনএ-র ১৭টি অংশে ঘটেছে পরিবর্তন। ১৪টিতে ঘটেছে ‘‌সাবস্টিটিউশন মিউটেশন’‌ আর তিনটিতে ‘‌ডিলিসন মিউটেশন’‌। এর জেরে স্পাইক প্রোটিনের ৮টি এবং অন্যান্য গঠনগত ও কার্যবাহী প্রোটিনে ঘটেছে ৯টি মৌলিক পরিবর্তন। 
স্পাইক প্রোটিনের ৫০১ নম্বর অ্যামাইনো আসিড-এ অ্যাসপারজিন এর বদলে টাইরোসিন–‌এর উপস্থিতি দেখা গেছিল। তাকে আলাদা করে চিহ্নিত করা গেছিল প্রথম ব্রাজিলে, এই বছর এপ্রিল মাসে। পরে এই মিউটেটেড ভাইরাসের খোঁজ মেলে দক্ষিণ আফ্রিকাতেও। দেখা যায়, সংক্রমণে পটু এই ভাইরাস চরিত্রগত দিক থেকে যথেষ্টই আলাদা। তাই একে নতুন ভ্যারিয়েন্ট বলা হচ্ছিল। কিন্তু ইংল্যান্ডের দক্ষিণ–‌পূর্বে অবস্থিত ‘‌কেন্ট’‌ নামক ‘‌কান্ট্রি’‌-র এক আক্রান্তের শরীরে সেপ্টেম্বর মাসে দেখা গেল এক ভয়ানক ভ্যারিয়েন্ট ভাইরাস— যার আরএনএ–‌তে ঘটে গেছে ১৭টি মিউটেশন।  উদ্বেগের সঙ্গে বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করলেন, বিগত মাসগুলোতে ঘটে চলল সংক্রমণের ঝড়। সে দেশের স্বাস্থ্য দপ্তর মনে করল এখুনি ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যাবে। যার জেরে কোপ পড়েছে লন্ডনের উৎসবে। 
আমরা এখন জানি, সম্প্রতি শুরু হয়েছে করোনা টিকাদান পর্ব। তাই এবার মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, এই নতুন সৃষ্ট ভ্যারিয়েন্ট ভাইরাসকে কি সদ্য তৈরি হওয়া ভ্যাকসিনগুলো প্রতিহত করতে পারবে? ভ্যাকসিনগুলো যেহেতু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্পাইক প্রোটিনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তৈরি হয়েছে, এই সংশয় তাই অত্যন্ত সঙ্গত। কিন্তু এর উত্তরে জানাই, এখুনি এই নিয়ে চিন্তিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। আসলে, স্পাইক প্রোটিন বারোশোর বেশি অ্যামাইনো অ্যাসিড নিয়ে তৈরি। সাধারণত, ৮-১০টি অ্যামাইনো অ্যাসিড অ্যান্টিবডি তৈরির জন্য একক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যাকে পরিভাষায় বলে ‘‌এপিটোপ’‌ অর্থাৎ স্পাইক প্রোটিনের অজস্র এপিটোপের বিরুদ্ধে অজস্র ধরনের (পড়ুন ‘‌স্পেসিফিসিটি’‌ যুক্ত) অ্যান্টিবডি তৈরি হবে। তাই এক কথায় জিন-মিউটেশনের জন্য নিদেনপক্ষে ৭/৮টি অ্যামাইনো অ্যাসিডের পরিবর্তন সার্বিকভাবে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতায় কোনও প্রভাব ফেলবে না।  তবে চরম মিউটেশনের ফলে স্পাইক প্রোটিনের একটা বড় অংশ পরিবর্তিত হলে, তার প্রভাব যে একেবারে পড়বে না, তা বলা যায় না। সেক্ষেত্রে ভ্যাকসিনের উপাদানে বদল আনতে হবে। অবশ্য সেটা এক বছরের কম সময়ের মধ্যে নয়।
প্রসঙ্গত বলি, ‘‌কোভ্যাকসিন’–‌এর মতো টিকার ক্ষেত্রে যেখানে সমগ্র ভাইরাসের দেহ-প্রোটিনকে অ্যান্টিবডি তৈরির কাজে লাগানো হচ্ছে, তাতে মিউটেশন-জনিত এই সমস্যা একেবারেই নেই। 
এখন প্রশ্ন হল, ভোল পাল্টে করোনাভাইরাস হঠাৎ এমন মারাত্মক হয়ে উঠল কেন? উত্তরে  জানাই, এটা একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা। ভাইরাস টিকে থাকার উপায় হিসেবে নিরন্তর তার ভোল পাল্টাতে থাকে। সেটা সহজ হয়, যখন কোনও দুর্বল প্রতিদ্বন্দ্বীর সম্মুখীন হয়। দেখা গেছে, মানুষের ইমিউন সিস্টেমের সঙ্গে লড়াইয়ে ভাইরাস কোনও সময়ে হয় পরাজিত, কখনও বিজেতা। বিজয়ী হলে সহজেই কাবু করে ফেলে শরীরকে। অন্যদিকে, হার স্বীকার করে বিদায় নেয় শরীর থেকে। কিন্তু সংক্রমিত মানুষটির যদি ইমিউনিটির দৌর্বল্য থাকে (পরিভাষায় ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি), ভাইরাস সুযোগ পায় অনেকদিন পর্যন্ত আক্রান্তের দেহে থেকে যাওয়ার এবং সেখানে তার বহুরূপ অপত্য সৃষ্টির। এমনটাই ঘটেছে এই নভেল করানো ভাইরাসের ক্ষেত্রে, মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। নভেল করোনা তৈরি করেছে জিন-পরিবর্তিত প্রতিরূপ, পরিভাষায় ভ্যারিয়েন্ট। করোনা ভাইরাসের একই অঙ্গে বহুরূপ তাই ভাইরাস বিশেষজ্ঞদের কাছে অপ্রত্যাশিত ঘটনা, তা মোটেই নয়।
বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে উঠে আসছে ভ্যাকসিন দিয়ে কত দ্রুত আমরা এই সাঙ্ঘাতিক ভাইরাসকে কাবু করব, সেই চর্চা। অতিমারী ঠেকাতে আমাদের আশু ‘‌স্ট্র‌্যাটেজি’‌ কী হবে— এটা নিয়ে চলছে বিজ্ঞানীমহলে জোর আলোচনা। তবে ভ্যাকসিন-সুরক্ষা যতদিন না আমজনতার নাগালের মধ্যে আসছে, ততদিন অন্তত ধৈর্যসহ সবাইকে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতেই হবে, এটা বলাই যায়। 
লেখক পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী ও মৎস্যবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক‌

জনপ্রিয়

Back To Top