সফিয়ার রহমান: শিক্ষা মানে কী?‌ শুধু খেতাব বা ডিগ্রি লাভ, আর তারপর একটা সম্মানজনক চাকরি পাওয়ার পর নিশ্চিন্ত জীবন?‌ এই মোক্ষ লাভের জন্য যে শিক্ষা, তা আসলে শিক্ষা নয়, পুঁথি গেলা। আমরা পুঁথি গিলছি, শিখছি না। পুঁথি গেলাচ্ছি, শেখাচ্ছি না। আবার যা শিখছি বা শেখাচ্ছি, তাও কি ঠিক—‌ প্রশ্ন মাথাচাড়া দেয়। বহু ভুল শিক্ষা আমাদের ভুল পথে পরিচালিত করে। আমি তখন ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। সেই সময় আমাদের লিখন শৈলীতে চিঠি লেখা শেখানো হত। ব্যাকরণ বইয়ের শেষের দিকে বড় করে চ্যাপ্টারের নাম লেখা আছে ‘‌পত্র লিখন’‌। ব্যক্তিগত পত্র লিখনের ক্ষেত্রে দু‌টি রীতিতে পত্র লিখন শেখানো হয়েছে সেখানে—‌ হিন্দু রীতি ও মুসলিম রীতি। হিন্দু রীতিতে হয়তো সম্বোধন করা হয়েছে ‘‌পূজনীয় বাবা’‌ আর মুসলিম রীতিতে ‘‌পাক জনাবেষু আব্বা’‌। আবার দাদার কাছে লিখলে হিন্দু রীতিতে ‘‌প্রিয় দাদা’‌ আর মুসলিম রীতিতে ‘‌প্রিয় ভাইজান’‌ লেখা হত ওই সব বাজার চলতি ব্যাকরণ বইগুলিতে। আমাদের বাড়িতে অগ্রজ ভ্রাতাকে ভাইজান বা ভাইয়া বলার রেওয়াজ কোনও দিন ছিল না। দাদাই বলতাম। ওই পত্র লিখন শিখতে গিয়ে আমি বিভ্রান্ত হয়েছিলাম। বিদ্যালয়ের বাংলা শিক্ষককে ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘‌স্যর এরকম আলাদা নিয়ম কেন?‌’‌ 
‘‌আরে এটাই নিয়ম!‌’‌ বলে আমাকে চুপ করিয়ে দিয়েছিলেন। পরে বুঝেছি, তথাকথিত পুঁথিসর্বস্ব শিক্ষিত লেখক বইগুলো লিখেছেন, আর তথাকথিত শিক্ষিত ডিগ্রিধারী শিক্ষক তা শিরোধার্য করে আমাদের গলাধঃকরণ করাচ্ছেন। একথা আজ অকপটে স্বীকার করছি, ওই ধরনের লেখক ও শিক্ষক বাস্তবে থাকলেও অপুষ্ট শিক্ষকের সংখ্যাই বেশি। পুঁথিসর্বস্ব ডিগ্রি ছাড়া আর কিছু না থাকায় সেই ট্র‌্যাডিশন সমানে চলছে। আর মননশীলতা ভয়ানকভাবে খাবি খাচ্ছে।
আর একটু বড় হলাম। একাদশ বা দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ি। ‘‌অশোকনগর সায়েন্স ক্লাব’‌–‌এর সঙ্গে যুক্ত হলাম। সায়েন্স ক্লাবের সিনিয়র দাদারা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তন্ত্র–‌মন্ত্র জাতীয় নানাবিধ কুসংস্কারবিরোধী খেলা দেখাত। অলৌকিক বলে যে কিছু নেই, সবই যে ভাঁওতা, তা প্রমাণ করা হত বৈজ্ঞানিক ও বাস্তব পদ্ধতির মধ্য দিয়ে। কিছু খেলা আমিও শিখে নিয়েছিলাম। তথাকথিত বিজ্ঞানমনস্ক দাদারা আমাকে সহযোগিতা করেছেন সেদিন। আমিই দেখাব অলৌকিক তন্ত্র–‌মন্ত্র বিরোধী খেলা। ঘোষক ঘোষণা করলেন নাম। সফল ভাবে খেলা দেখানো শেষ। ঘোষকের থেকে মাইক ছিনিয়ে নিয়ে স্বঘোষিত বিজ্ঞান ও যুক্তিমনস্ক এক দাদা আমার কাঁধে হাত দিয়ে পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘‌অশোকনগর বয়েজ সেকেন্ডারি স্কুলের একাদশ শ্রেণির মুসলিম ছাত্র’‌ হিসেবে। এখন বুঝি, বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের সঙ্গে নিমকহারামি করে কী সাঙ্ঘাতিক পরিচয় দিয়েছিল আমার তথাকথিত যুক্তিমনস্ক দাদা। যাদের অপুষ্ট বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদ সামান্য ধর্মীয় বিভাজন ঘোচাতে পারে না। সবটাই লোক দেখানো। এই দেখনদারি বিজ্ঞানমনস্কতা সমাজকে সত্যিকারের কোনও বার্তা দিতে পারে না। দেখনদারি ধর্মনিরপেক্ষ ও দেশপ্রেমীদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। হৃদয়ে সাম্প্রদায়িকতা লালন করে প্রকৃত নিরপেক্ষ হওয়া কখনই সম্ভব নয়। আজকের ভারতবর্ষের সিংহভাগ মানুষ, যাঁরা বাইরে সেক্যুলারের আইডেন্টিটি কার্ড ঝুলিয়ে রাখছেন, তাঁরা হৃদয়ে বহন করে চলেছেন বিদ্বেষ–‌বিষ। সেই কারণে যারা সরাসরি ধর্ম–‌বিদ্বেষের বীজ ছড়াচ্ছেন তাঁদের সঙ্গে তথাকথিত এই সেক্যুলারদের কোনও পার্থক্য থাকছে না। মন থেকে সাম্প্রদায়িকতা, পরধর্ম অসহিষ্ণুতা উৎপাটন করতে না পারলে দেশ এই চরম সঙ্কট থেকে মুক্তি পাবে না। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন বার বার এই হৃদয় লালিত সাম্প্রদায়িকতার কথা বলেছেন। কবি শঙ্খ ঘোষেরও একই মত। কিন্তু তাঁরাও একদিন থেমে যাবেন। কারণ সত্য প্রকাশ করে প্রতি মুহূর্তে তাঁদের তটস্থ থাকতে হচ্ছে। যেভাবে এই সব সম্মাননীয় মানুষদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করা হয় তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। যে ভাষা ও ব্যঙ্গচিত্র সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয় তা ভব্যতার সব সীমাই ছাড়িয়ে যায়। অমর্ত্য সেন, শঙ্খ ঘোষদের পাশে দাঁড়ানোর লোক যে নেই তা নয়, কিন্তু সংখ্যাটা এত নগণ্য যে তাঁদের স্বর বহু সংখ্যক অসহিষ্ণু হিংস্র স্বরের ওপরে উঠতে পারছে না। তা ‌ছাড়া, ‘‌দেশদ্রোহী’‌ তকমা দিয়ে হেনস্থা করা আজ আর অপরাধ বলে গণ্য হয় না। ফলে প্রতিবাদী স্বরগুলোও নিরাপত্তার স্বার্থে নির্বাক থাকছে।
আবার ফিরে আসি আমার শৈশবের পত্র লিখন শিক্ষার কথায়।‌ হিন্দু রীতি আর মুসলিম রীতিতে। একই ভাবে আমার সমগ্র ভারত দু‌টি রীতি তথা মেরুতে বিভাজিত। এর মাঝামাঝি সত্য–‌মিথ্যা, ন্যায়–‌অন্যায় দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ভয় সেখানেই। আমরা আসল শত্রুকে শনাক্ত করতে ভুলে যাচ্ছি। লুঠেরা শাসক–‌শোষক সেটাই চায়। ধর্ম আর সম্প্রদায় নিয়ে গোটা দেশ মেতে থাকলে দেশটা অনায়াসে লুণ্ঠনক্ষেত্র বানাতে পারবে অযোগ্য শাসক ও তার বিশ্বস্ত আমলা–মন্ত্রীরা।‌

জনপ্রিয়

Back To Top