প্রভাত গোস্বামী: রিকশায় সান্ধ্যভ্রমণে যাইতেছিলাম। দূর হইতে গগনবিদারী শব্দ ভাসিয়া আসিতেছে। যতই সমীপবর্তী হইতেছি ততই কর্ণপটহ বিদীর্ণ হইবার উপক্রম হইতেছে। এতক্ষণ শব্দই শুনিতেছিলাম। এখন শব্দগুলি অর্থবহ হইয়া মস্তিষ্কে স্থিতিলাভ করিতে লাগিল। গত পরশু কলিকাতায় বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা হইয়াছে তদুপলক্ষে এই দলীয় সভা। এই ধরনের সভার পশ্চাতে কোনও মতলব খুঁজিতে হইলে, খুঁজুন। আমার রবীন্দ্রনাথকে মনে পড়িল।
‘‌‘‌আমাদের দেশে আমরা বলিয়া থাকি, মহামানবদের নাম প্রাতঃস্মরণীয়। তাহা কৃতজ্ঞতার ঋণ শুধিবার জন্য নহে— ভক্তিভাজনকে দিবসান্তে যে ব্যক্তি ভক্তিভাবে স্মরণ করে, তাহার মঙ্গল হয়। মহাপুরুষদের তাহাতে ‌উৎসাহ বৃদ্ধি পায় না, যে ভক্তি করে, সে ভালো হয়।’‌’‌
বিদ্যাসাগরকে বাঙালিরা যে খুব ভক্তি করে, প্রাতে স্মরণ করে এমন কথা আগেও শুনিনি, এখনও শুনি না। মাইক্রোফোন সমীপ ব্যক্তি ব্যক্তিবর্গকে দেখিয়া তাহারা যে দুই হস্তে ভক্তির ডালি লইয়া দণ্ডায়মান, তাহা মনে হইল না। ইহার আগেও একবার বিদ্যাসাগরের মূর্তি অজ্ঞাত কালাপাহাড়দের হস্তে বিনষ্ট হইয়াছিল। তখনও সারা বাংলায় একই দিনে একই সময়ে একই সুরে এমন প্রতিবাদশব্দ শুনি নাই। অকস্মাৎ    একটি অতি তীক্ষ্ণ কণ্ঠ কর্ণে প্রবেশ করিল। ‘‌‘‌বিদ্যাসাগরের অপমান মানে বাঙালির মাথায় পদাঘাত।’‌’‌ বাঙালির মাথায় পদাঘাত করিবার জন্য অলক্ষ্যে কে কোথায় দাঁড়াইয়া আছে, তাহার পদযুগলের দক্ষিণ পদটি উদ্যত না বামপদ, তাহা ভাবিতেই মস্তিষ্কে রবীন্দ্রনাথ উদিত হইলেন। রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠ মস্তিষ্কে সরব হইল। বলিলেন, হে বৃদ্ধ!‌ জানো কি?‌ বিদ্যাসাগর বাঁচিয়া থাকিতেই তাঁহাকে হত্যার গভীর চক্রান্ত হইয়াছিল। বলিলাম, গুরুদেব— ইহা পড়িয়াছি। এখন পদাঘাতোদ্যত পদটি আমি অনুসন্ধান করিতেছিলাম। বাঙালির মাথায় পদাঘাত করিবার সাহস কার?‌ সে কে?‌
গুরুদেব কহিলেন, ‘‌‘‌ভক্তি যাঁহাদিগকে হৃদয়ে সজীব করিয়া না রাখে, বাহিরে তাঁহাদের পাথরের মূর্তি গড়িয়া রাখিলে কি লাভ?‌’‌’‌
অবশ্য বাঙালি চরিত্রে শহিদ বেদিতে অথবা কবরে স্থান লাভ করিবার মোহ এবং তদ্দ্বারা অমরত্ব লাভের বাসনা একটু বেশি পরিমাণেই আছে। একসময় যত্রতত্র শত শত শহিদ বেদি ও মূর্তি স্থাপনের উৎসাহসমুদ্রে প্রবল তরঙ্গ উত্থিত হইয়াছিল। ইদানীং সে মোহ বিলীয়মান।
আমরা, বাঙালিরা কতখানি মোহগ্রস্ত, কতখানি বিচারবুদ্ধিহীন, কতখানি উত্তেজনাপ্রবণ, হুজুগপ্রিয়, যতই দিন যাইতেছে ততই তাহা স্পষ্ট হইতে স্পষ্টতর হইয়া উঠিতেছে দলের মাধ্যমে। কবি কহিলেন, বৃদ্ধ, শ্রবণ কর, ‘‌‘‌দলের একটা উৎসাহ আছে। তাহা সংক্রমক— তাহা মূঢ়ভাবে পরস্পরের মধ্যে সঞ্চারিত হয়, তাহা অনেকটা অলীক।
‘‌গোলে হরিবোল’‌ ব্যাপারে হরিবোল যতটা থাকে গোলের মাত্রা তাহা অপেক্ষা অনেক বেশী হইয়া পড়ে। দলের আন্দোলনে অনেক সময় তুচ্ছ উপলক্ষে ভক্তির ঝড় উঠিতে পারে, তাহা সাময়িক প্রবণতা। যতই হোক না কেন, ঝড় জিনিসটা কখনই স্থায়ী নহে। সংসারে এমন কত বার কতশত দলের দেবতার অকস্মাৎ সৃষ্টি হইয়াছে, এবং জয়ঢাক বাজিতে বাজিতে অতলস্পর্শ বিস্মৃতির মধ্যে তাহাদের বিসর্জন হইয়াছে। পাথরের মূর্তি গড়িয়া জবরদস্তি করিয়া কাহাকেও মনে রাখা যায় না। দলগত উত্তেজনা যুদ্ধবিগ্রহে প্রমোদ উৎসবে বেশী কার্যকরী হয় কেন না, ক্ষণিকতাই তাহার প্রকৃতি।’‌’‌
তাই একসময় আমরা দেখিয়াছি, যুবক–যুবতীর দল প্রবল উত্তেজনায় রক্তবর্ণ নিশান হস্তে পথে পথে ধ্বনি দিয়া ফিরিত, ‘‌চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’‌, ‘‌ভুলতে পারি বাবার নাম, ভুলবনাকো ভিয়েতনাম’‌। ক্ষণিকতাই ছিল ইহাদিগের মূঢ়তার বল। তখনও কি আমরা সচকিতে পথিপার্শ্বে দণ্ডায়মান হই নাই?‌ আমার মনে প্রশ্ন উঠিল, প্রকৃত গুণী সম্পর্কে আমাদের কর্তব্য কী?‌ রবীন্দ্রনাথের লেখনী হইতে উত্তর পাইলাম, ‘‌‘‌ধ্রুপদ শুনিলে যাহার গায়ে জ্বর আসে সেও তানসেনের প্রতিমা গড়িবার জন্য চাঁদা দিয়া ঐহিক পারত্রিক কোনো ফললাভ করে একথা মনে করিতে পারি না।’’‌
এখন আমাদের বাঙালি সমাজে যথার্থ ব্যক্তির উপর দেবপূজার ভার নাই। ভার পড়িয়াছে দলের উপর। দলের জন্য, দলের দ্বারা, দলীয় সভায় উপস্থিত হইয়া যে কৃত্রিম পূজা তাহার মধ্যে গভীর শূন্যতা ছাড়া আর কি আছে?‌ রবীন্দ্রনাথের বিচারে ‘‌‘‌বাঙালির বুদ্ধি সহজেই অত্যন্ত সূক্ষ্ম। তাহার দ্বারা চুল চেরা যায় কিন্তু বড় বড় গ্রন্থি ছেদন করা যায় না। তাহা সুনিপুণ, কিন্তু সবল নহে।’‌’‌
কাজেই সভায় সমিতিতে আমরা যে বিদ্যাসাগর তর্পণ–‌স্বরূপ সামান্য উত্তাপ অনুভব করি, তাহা নিতান্তই ক্ষণিকতা–‌আবৃত, শূন্যগর্ভ, তাহার মধ্যে কোনও প্রতিজ্ঞা নাই, দৃঢ়তা নাই। তাহা পালন ও সুপালন সমার্থক। বাঙালি চরিত্রের বর্ণনায় গুরুদেব বলেন, ‘‌‘‌আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না, আড়ম্বর করি, কাজ করি না, যাহা বিশ্বাস করি তাহা পালন করি না,— ভূরি–পরিমাণ বাক্য রচনা করিতে পারি তিলমাত্র আত্মত্যাগ করিতে পারি না। আমরা অহঙ্কার দেখাইয়া পরিতৃপ্ত থাকি, যোগ্যতা লাভের চেষ্টা করি না, আমরা সকল কাজেই পরের প্রত্যাশা করি অথচ পরের ত্রুটি লইয়া আকাশ বিদীর্ণ করিতে থাকি;‌ পরের অনুকরণে আমাদের গর্ব, পরের অনুগ্রহে আমাদের সম্মান, পরের চক্ষে ধূলি নিক্ষেপ করিয়া আমাদের পলিটিক্স এবং নিজের বাকচাতুর্য্যে নিজের প্রতি ভক্তিবিহ্বল হইয়া উঠাই আমাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য। এই দুর্বল, ক্ষুদ্র, হৃদয়হীন, কর্মহীন, দাম্ভিক, তার্কিক জাতির প্রতি বিদ্যাসাগরের এক সুগভীর ধিক্কার ছিল।’‌’‌
হে বিদ্যাসাগর, ভাগ্যিস জীবৎকালে তুমি বাঙালিত্ব প্রাপ্ত হও নাই!‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top