অশোক অধিকারী: যিনি ঊষর মরুতে বৃষ্টি নামাতে পারেন তিনিই শিক্ষক। ইউনেস্কো একবার ‘‌শিক্ষক’‌–‌এর সংজ্ঞা কি হতে পারে তাই নিয়ে বিশ্বজুড়ে এক সমীক্ষা চালিয়েছিল। বিশ্বের প্রায় সব দেশেরই উত্তর এসে পৌঁছেছিল। সকলের মন ছুঁয়ে গিয়েছিল যে উত্তরটি, তা মেক্সিকো থেকে। যিনি এটি পাঠিয়েছিলেন, তিনি লেখেন— ‘‌যিনি ঊষর মরুতে বৃষ্টি নামাতে পারেন, তিনিই প্রকৃত শিক্ষক’‌। 
আবার একটি শিক্ষক দিবস এসে গেল। আজীবন শিক্ষক, ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি, ভারতরত্ন ড.‌ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের জন্মদিন। ৫ই সেপ্টেম্বর। যিনি বলেছিলেন, ‘‌আমার প্রথম ও প্রধান পরিচয় আমি একজন শিক্ষক। আমার জন্মদিন যদি শিক্ষক দিবস হিসাবে পালিত হয়, সেটাই হবে আমার প্রতি শ্রেষ্ঠ সম্মান প্রদর্শন’‌। সেই শুরু। ১৯৬২ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর যার সূচনা হয়েছিল, এ বছর তা ৫৭ বছরে পা দিল।
রাধাকৃষ্ণনের ১৩১ তম জন্মদিবসে মনে পড়ছে রবীন্দ্রনাথের গান, ‘‌আমার এ ধূপ না পোড়ালে গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে/‌ আমার এ দীপ না জ্বালালে দেয় না কিছুই আলো’‌। আর সে কারণেই, ‘‌‌students‌ are the soil and teachers are the seeds’‌‌। শিক্ষক ও ছাত্রের পরম্পরা রক্ষায় এ জাতীয় অনেক উদ্ধৃতি তুলে ধরা যায়। যেখানে গুরু–‌শিষ্য সম্পর্কের সারল্য সহজে ধরা পড়ে। তবুও আমরা শিক্ষকেরা সমানে বলে যাই, ‘‌আমি পড়াচ্ছি, ‘‌আমি শেখাচ্ছি’‌। আমি ‘‌জ্ঞানভাণ্ডার’‌ আর তুমি ‘‌শূন্য কলস’‌। এখানেই ঋষি অরবিন্দ আমাদের সেরা থাপ্পড়টি দেন, ‘‌Every teacher should bear in mind that nothing can be taught, but every thing can be learnt’‌‌। প্রসঙ্গত, ম্যাকমিলান প্রকাশিত ‘‌Teacher and child’‌ বইটিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শিক্ষকসমাজের কাছে এক শিশুর করুণ আর্তির কথা আছে। সে লিখছে, ‘‌নাৎসি জার্মানির বন্দিশিবিরে আমি সেই হতভাগ্য জীবন্ত শিশু। নিজের চোখে আমি যা দেখেছি, কোনও মানুষকে যেন সেই দৃশ্য দেখতে না হয়। মেধাসম্পন্ন প্রযুক্তিবিদরা বন্দিদের হত্যা করার জন্য গ্যাসচেম্বার বানিয়ে দিচ্ছেন। চিকিৎসকেরা বিষপ্রয়োগ করে শিশুদের হত্যা করছেন। নার্সরা বিষ ইঞ্জেকশন দিচ্ছেন। স্কুল কলেজ উত্তীর্ণ স্নাতকের দল নারী ও শিশুদের গুলি করে পুড়িয়ে মারছে। এতে শিক্ষার প্রতি আমার এক প্রকার সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তাই, শিক্ষকসমাজের কাছে আমার কাতর নিবেদন, আপনারা আপনাদের ছাত্রছাত্রীদের মনুষ্যপদবাচ্য করে তুলুন। আপনাদের শিক্ষা যেন শিক্ষিত দানব তৈরি না করে। যেন দক্ষ মানুষখেকো তৈরি না করে, যেন নিষ্ঠুর ‘‌আইখমান’‌–দের জন্ম না দেয়’‌। সমাজ পরিসরে শিক্ষকের মর্যাদা সেই কারণেই একেবারে ওপরের দিকে। আমরা নিশ্চিত রূপেই আজও বিস্মৃত নই, এ সি নিয়েলসনের করা সেই সমীক্ষার কথা। যেখানে সমাজের ভিন্ন ভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের সামাজিক মান্যতা ও সম্মানের নিরিখে করা তাঁর এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, সবার ওপরে রয়েছেন শিক্ষক। পরে চিকিৎসক ও অন্যান্য পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষ। এখানেই রাধাকৃষ্ণনের জন্মদিন পালনের সার্থকতা, যখন তাঁর জন্মদিন উৎসর্গীকৃত হয় সেই আচার্যকুলের উদ্দেশ্যে। ‘‌পেশা’‌ ও ‘‌ব্রত’‌ শব্দযুগলের পার্থক্য বোঝার জন্য রাধাকৃষ্ণনের জীবনচর্চা বর্তমানে একমাত্র পাথেয়, আমরা যারা শিক্ষকতায় আছি।
এ বছরটা গান্ধীজির জন্মের সার্ধশতবর্ষ। ভারত স্বাধীন হয়েছে ১৫ আগস্ট। তার কিছুদিন পর ১০ ডিসেম্বর তারিখে গান্ধীজি বললেন, ‘‌ভারতের স্বাধীনতার আলো যদি জ্বালাতে হয়, তাহলে সর্বপ্রথম প্রয়োজন শিক্ষায় বিপ্লব নিয়ে আসা।.‌.‌.‌ অজ্ঞতা আমাদের অন্ধ করে রেখেছে। আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা দিনের আলোর মতো সবকিছু দেখতে পাই না।’‌ আর রাধাকৃষ্ণন সেই শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলে ওঠেন, ‘‌‌A quest for democracy of justice, liberty, equality and fraternity’‌।
আমরা গত মাসে আমাদের স্বাধীনতার ৭৩ বছর পালন করেছি। অমর্ত্য সেন ভারতকে ‘‌ফার্স্ট বয়দের দেশ’‌ এই শিরোনামে ভূষিত করেছেন। এই দেশে, সাধারণ শিক্ষার অভাবটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থনীতিক বাধা হিসাবে দেখা যাচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। আবার একটু বেড়ে তিনি বলেছেন, সমাজে যে এত অর্থনৈতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক কুফল জন্ম নিচ্ছে তা ভারতীয় জনসাধারণের এক বিপুল অংশের শিক্ষা প্রাপ্তির প্রতি অবহেলার কুফল। তাই ফার্স্ট বয়দের দেশে, শিক্ষার বাজেট আজও ৫ শতাংশের নীচে। মিড–‌ডে মিলে বরাদ্দ বছর বছর কমছে। শিক্ষার দায়িত্ব থেকে রাষ্ট্র তার হাত গুটিয়ে নিচ্ছে। শিক্ষা নিয়ে কেন্দ্রের করা সমীক্ষায় ধরা পড়েছে, দেশের ৭৪% পরিবারের কাছে শিক্ষা বিলাসিতা ছাড়া কিছুই নয়। পড়াশোনার খরচ বেড়ে যাওয়ায় মাঝপথে তারা স্কুল ছেড়ে দিচ্ছে। ভারতে বেড়ে যাচ্ছে স্কুলছুট। খসড়া জাতীয় শিক্ষানীতিতেও একই চিন্তার প্রতিফলন। পরিষেবার ক্ষেত্রে ব্যাপক ছাঁটাই। শিক্ষায় অস্বীকৃত হচ্ছে বিজ্ঞান। দেশের সরকার বৈদিক গণিত চালুর সুপারিশ করতে চলেছেন। এছাড়া ইতিহাস বিকৃতি হামেশাই ঘটিয়ে মননচর্চার ওপর অবৈজ্ঞানিক ধ্যানধারণা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
আজকের শিক্ষক দিবস তবে কি বার্তা দেবে আমাদের!‌ শুধু কি মেধার চর্চা, তার অনুশীলন আর সাফল্যের পরাকাষ্ঠা হয়ে টিকে থাকবে আমাদের বিদ্যামন্দির। কিন্তু তাতেও তো মেধার রক্তক্ষরণ থামানো যাচ্ছে না। যখন দেখি, মেধাবী কৃত্তিকা’‌দের আত্মহননের লোভ তাদের সুন্দর জীবন থেকে সরিয়ে নেয়। যখন দেখি, শুধুমাত্র নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করতে না পেরে কলকাতার নামী কলেজের কৃতী ছাত্র হৃষিক রেললাইনে মাথা দেয়। যখন দেখি, কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক মহম্মদ রফি ভাট মাত্র ৩৩ বছর বয়সে হিজবুল জঙ্গি দলে নাম লিখিয়ে আত্মত্যাগে (‌!‌)‌ জীবন বিসর্জন দেন। এ ধরনের ঘটনা হরবখত ঘটে যাচ্ছে আমাদের চারপাশে। তখনই মনে হয়, তথাকথিত ‘‌মেধা’‌ কোনও সমাজবিচ্যুত সত্ত্বা নয়। সে সমাজসম্পৃক্ত। আর সেখানেই একটা ফাঁক তৈরি হচ্ছে আমাদের ভাব আর ভাবনার মধ্যে। 
কিন্তু শিক্ষক দিবসে শিক্ষিত হবার খবরও তো কম নেই। যখন খবরে আসে, সংসদভবন হামলার অন্যতম কারিগর আফজল গুরুর ছেলে গালিব তার রাজ্য বোর্ডের সর্বশেষ পরীক্ষায় ৮৮% নম্বর পেয়ে ডিস্টিংশন নিয়ে পাশ করেছে। যার স্বপ্ন ডাক্তার হওয়ার। যখন পড়ি, কাশ্মীরের সেই দৃষ্টিহীন মেয়ে ইনশা, পেলেট বোমা যার দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিয়েছিল, বোর্ডের পরীক্ষায় পাশ করে যে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। সোয়াট উপত্যকার মেয়ে মালালা মেয়েদের শিক্ষা প্রসারের কাজে নেমে নোবেল পায়। যখন গুরু আচরেকরের একটি টোকা শচীনের ক্রিকেট জীবনের খাতা খুলে দেয়। বদলে যায় শচীনের জীবন। যখন চন্দ্রকান্ত পণ্ডিতের বাবার হাতে হাজার টাকা তুলে দিয়ে স্যর আচরেকর বলেন, ওর ক্রিকেট খেলার খরচের টাকা আমি দেব, ওকে শুধু খেলতে দিন। তখনই রাধাকৃষ্ণন পড়া আমাদের হয়ে যায়। শিক্ষক আর ছাত্রের সম্পর্ক নিয়ে তখন আর কোনও প্রশ্ন থাকে না। 
শিক্ষক হিসেবে শিক্ষক দিবসের কষ্ট যন্ত্রণার তালিকাটিও কিন্তু দীর্ঘ। যখন দেখি, শাস্তি হিসাবে কোনও শিক্ষক আগুনে পোড়া কাগজের গোলা হাতে ধরতে দেন ছাত্রকে। বেঞ্চের পায়া ছাড়িয়ে মারতে থাকেন ছাত্রকে। গ্রীষ্মের খর রোদে ২০০ বার ওঠবস করার নিদান দেন। থামলেই আরও ১০০ বার। পড়া না পারায় দিদিমণি উপর্যুপরি লাথি চড় ঘুসি চালিয়ে আহত করেন শিশুকে। স্যরের কাছে টিউশন না পড়লে নাম্বার কম দেবার অভিযোগ ওঠে। কারণে অকারণে ‘‌কোন বাড়ির’‌ ছেলে বলে দাগিয়ে দেবার অভিযোগ ওঠে। বাবা–‌মার পেশা নিয়ে টিটকারি দেবার অভিযোগ ওঠে কোনও শিক্ষক–‌শিক্ষিকার বিরুদ্ধে। ছাত্রী–‌র সঙ্গে অনৈতিক কাজে জড়িয়ে গিয়ে, খুন হতে হয় ছাত্রীকে তার প্রিয় শিক্ষকের হাতে। এধরনের নানা অসঙ্গতি ছাত্র–‌শিক্ষক সম্পর্কে বর্তমানে কালি ছেটাচ্ছে। অবক্ষয় বাসা বেঁধেছে প্রিয় স্কুলজীবনে। মূল্যবোধ বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে। রাধাকৃষ্ণন বলেছিলেন, ‘‌শিক্ষককে নিজের প্রচেষ্টায় তাঁর সম্মান অর্জন করতে হয়’‌। চলমান কর্মের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় আমাদের জীবনমুখী হওয়ার কথাও তিনি বলতেন।
এখন ‘‌আনন্দপাঠ’‌, ‘‌খেলার ছলে পড়া’‌ বা ‘‌এসো অঙ্ক শিখি’‌— যাই চালু হোক না কেন, শিক্ষকের অন্তরের ছেলেমানুষটিকে খুঁজে বের করা সর্বাগ্রে দরকার। অভিভাবক সমাজের মধ্যেও আকাশচুম্বী আশা যাতে বাস্তবের মাটি ছোঁয় তাও দেখা দরকার। আমি যা হতে পারিনি, তোমাকে তা হতেই হবে এই বিদ্যাজ্ঞানে না পৌঁছনোই ভাল। একদিকে ব্যাগের ওজন অন্যদিকে বাড়ির চাপ, স্কুলের চাপ আর প্রাইভেট টিউটরের চাপ এই ত্রিমুখী চাপে তার শৈশব মাঠে মারা যাচ্ছে। ‘‌ডাকছে আকাশ, ডাকছে বাতাস’‌ শুধু গান হয়ে বেঁচে আছে তার শৈশবজীবনে। প্রতিযোগিতা তার আরাধ্য। পাশ ফেল তার স্কুলে আপাতত না থাকলেও বাড়িতে আছে। এক অসম বিকাশের হাত ধরে আমাদের প্রজন্ম অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে। এখনই সময়, শিক্ষক–‌ছাত্র ও অভিভাবকের মধ্যে সংলাপ শুরু করার। ‘‌Friend, Philosopher and Guide’‌ ‌শুধু কথার কথা নয়, তাকে চর্চার মধ্যে আনার শপথে অঙ্গীকার করে আমরা রাধাকৃষ্ণনের গলায় মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানাই, এই শিক্ষক দিবসে।
লেখক‌ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক‌

জনপ্রিয়

Back To Top